অনশনের দ্বিতীয় দিন ৬ শিক্ষার্থী হাসপাতালে|340498|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
উত্তাল শাবিপ্রবি
অনশনের দ্বিতীয় দিন ৬ শিক্ষার্থী হাসপাতালে
আবদুল্লা আল মাসুদ, শাবিপ্রবি

অনশনের দ্বিতীয় দিন ৬ শিক্ষার্থী হাসপাতালে

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে অনশনে বসা ২০ শিক্ষার্থীর অধিকাংশই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমরণ অনশন কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার অসুস্থ হয়ে পড়া ছয় শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া অনশনস্থলেই অসুস্থ অবস্থায় আরও বেশ কয়েকজনকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকেও তাদের কোনো চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সহায়তা দিতে সিলেটে অবস্থানরত চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

এদিকে গতকাল কোষাধ্যক্ষের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি প্রতিনিধিদল অনশনস্থলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গেলেও উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায় অনশনরতরা। এ ছাড়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তাদের নিজ নিজ বিভাগের অনেক শিক্ষক মোবাইল ফোনে কল করে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৪ জন গত বুধবার দুপুর থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অনশন শুরু করে। তীব্র শীত আর অনাহারে রাতভর রাস্তায় থাকায় গতকাল সকাল থেকে তাদের শরীর খারাপ হতে থাকে। গতকাল দুপুর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একে একে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ পাঁচজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং একজনকে রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া অনশনকারী এক শিক্ষার্থী তার বাবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে অনশনস্থল ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে। অনশনে বসা বাকি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫ জনকে অনশনস্থলে স্যালাইন লাগিয়ে রাখা হয়েছে।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম। এ ছাড়া শিক্ষক প্রতিনিধিরা দুই দফায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। তবে শিক্ষার্থীরা আলোচনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়।

পরে গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, ‘আমাদের এ আন্দোলন শুধু উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে। এ আন্দোলনে সরকারবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং নেওয়া হবেও না। আমাদের এ আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে অহিংস। আমাদের এ আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অনেক কুচক্রী মহল গুজব ও মিথ্যা রটনা ছড়াচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অনশনরত অনেক শিক্ষার্থীর শরীর দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ঠা-া ও অনাহারে আমাদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কারোরই উঠে বসে থাকার ক্ষমতা নেই। তাদের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তারা যার জন্য অনশন করেছে সে আমাদের কিছু বলছে না। তার কাছে এতগুলো প্রাণের চেয়ে তার চেয়ার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার থেকেও কোনো সহযোগিতা মেলেনি।’

তবে সন্ধ্যার পর সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নাজমুল হাসান শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে আন্দোলনস্থলে যান। তিনি তার সঙ্গে সাত সদস্যের একটি মেডিকেল টিম নিয়ে সেখানে যান।

এ সময় নাজমুল হাসান বলেন, ‘যত ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রয়োজন আমরা সরবরাহ করব। যারা অসুস্থ হবে তাদের আমরা ওসমানী মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে পাঠাব।’

গতকাল বিকেল ৫টার দিকে সিলেট মহানগর বিএনপির নেতারাও অনশনস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।

শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমরা জানি, আমাদের ওপর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ রয়েছে, আমাদেরও অনেক দুঃখ রয়েছে।’

উল্লেখ্য, গত রবিবার বেগম সিরাজুন্নেসা হলের প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ। এরপর ওই হলের প্রভোস্ট অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও পুলিশি হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা।

শাবিপ্রবি ভিসিকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জাবি শিক্ষক সমিতির : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্রীদের নিয়ে শাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাবি শিক্ষক সমিতি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক লায়েক সাজ্জাদ এন্দেল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. মোতাহার হোসেন সই করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ছাত্রীদের নিয়ে শাবি উপাচার্যের বক্তব্য অত্যন্ত অবমাননাকর ও অসম্মানজনক। আমরা আশা করছি, উপাচার্য প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করে তার অশোভন বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেবেন।’

শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সমাধানের আহ্বান পরিকল্পনামন্ত্রীর : শাবিপ্রবির চলমান সংকট আলোচনার মাধ্যমে নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেছেন, ‘ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। আগুনে ঘি ঢালা যাবে না। শিক্ষার্থীদের এ বয়সে একটু উত্তেজনা থাকতেই পারে, তাদের সময় দিতে হবে, বুঝিয়ে সমাধান করতে হবে।’ গতকাল সিলেটে একটি মাদ্রাসার উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।  

পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা দুঃখজনক। শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান। আমরা তাদের মঙ্গল চাই। তাদের আমরা ছেড়ে যেতে পারি না। সুতরাং তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক এবং জাবি প্রতিনিধি