ত্রিমুখী চাপে ডিসিরা|340535|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
ত্রিমুখী চাপে ডিসিরা
আশরাফুল হক

ত্রিমুখী চাপে ডিসিরা

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন ছিল ভিন্ন ধাঁচের। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী এ সম্মেলনে জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য একটা কঠোর বার্তা দেন। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা এমনকি সচিবরা পর্যন্ত ডিসিদের ‘শাসনের’ মধ্যে রেখেছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় স্বতঃস্ফূর্ততাও বেশি ছিল। অ্যালোকেশন অব বিজনেসের বাইরে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারবহির্ভূত বিভিন্ন জনহয়রানি নিয়েও কথা বলেছেন মন্ত্রীরা। সরকারের অবস্থান টের পেয়ে কর্মকর্তারাও সাড়া দিয়েছেন গুরুত্বের সঙ্গে।

সরকার গত দুই বছর ধরে অতিমাত্রায় আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে। ত্রাণ বা উন্নয়ন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু আমলারা। এ নিয়ে তোলপাড় সংসদ বা রাজনৈতিক অঙ্গন। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে ডিসিদের চাপে রেখে জনসম্পৃক্ততার বার্তা দিল সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এমনটাই মনে করছেন।

ডিসি সম্মেলন হচ্ছে প্রশাসনে কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। তাদের সঙ্গে এ সম্মেলনে অংশীজন থাকেন বিভাগীয় কমিশনাররা। সম্মেলনে পর্যায়ক্রমে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা থাকেন। কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় এ সমাবেশে সরকার জনসম্পৃক্ততার বার্তা দিয়েছে বলে মনে করেন খোদ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, সম্মেলনে ডিসিরা যে লিখিত প্রস্তাব পাঠান সেসব নিয়ে তাৎক্ষণিক আলোচনা হয় না বললেই চলে। পরে সেসব প্রস্তাবের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এবার যা হলো, মন্ত্রীরা এসে যেসব প্রস্তাব তাদের পছন্দের ছিল না, সেগুলো সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন। এছাড়া অনেক মন্ত্রী অনুযোগ করেছেন যথানিয়মে কাজ হয় না, রাজনীতিবিদরা দাম পায় না-সহ আরও নানা বিষয়ে।

সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের কারণ কী হতে পারে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সামনে নির্র্বাচন। পুরো প্রশাসনই নির্বাচনমুখী। এ সময় সরকার জনমুখী হতেই পারে। গত দুই বছর আমলারাই ছিল চালকের আসনে। আশ্রয়ণ প্রকল্প ডিসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের কেন এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলো না তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এছাড়া গত দুই বছর করোনাভাইরাস মহামারীর সময় জেলায় জেলায় ত্রাণ বিতরণ কাজ সমন্বয় করেছেন সচিবরা। সরকারের বদনাম ছিল অতিরিক্ত আমলানির্ভর হওয়ার। সংসদে তুমুল আলোচনা হয়েছে। সংসদের বাইরেও এ নিয়ে কম কথা বলেনি রাজনৈতিক দলগুলো। সুতরাং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের নীতিনির্ধারকরা একটু কঠোর হতেই পারেন।

বিষয়টি অন্যভাবেও দেখা যায় বলে প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তা মনে করেন। তাদের মতে, ডিসিদের সব প্রস্তাব তো পাস হবে না। একজন ডিসি স্থানীয় বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তাব পাঠান। কেন্দ্রীয়ভাবে যখন সেসব প্রস্তাব খুঁটিয়ে দেখা হয়, তখন অনেক প্রস্তাবই বাদ যেতে পারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার তিন দিনের ডিসি সম্মেলন শেষ হয়েছে। এ সম্মেলনে ডিসিদের ২৬৩টি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এক দিন আগে করা সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আহমেদের একটি মন্তব্যের প্রভাব পড়েছে ডিসি সম্মেলনে। গত ১৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘বোমা ফাটানো’ বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এ সংসদ সদস্য বলেছেন, দেশে এমন আমলাতন্ত্র চলছে যে সচিবালয়ের পিয়ন পর্যন্ত সংসদ সদ্যদের মূল্যায়ন করেন না। দাম দেন না। দলীয় সংসদ সদস্য আমলাতান্ত্রিক কার্যকলাপকে ইস্যু করায় সরকার অস্বস্তিতে পড়েছে। নাজিম উদ্দিন আহমেদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসন থেকে নির্বাচিত। তার মন্তব্যের পরে আমলাতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে শেষ দিনে বেশ সোচ্চার ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। স্থানীয় প্রশাসন ‘সহযোগিতা’ ও ‘সম্মান’ করেন না  জনপ্রতিনিধিদের এমন অভিযোগের ব্যাপারে ডিসিদের আরও ‘সচেতন’ হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, তাদের স্থানীয় প্রশাসন বা অন্য সরকারি অফিস সে ধরনের সম্মান দেয় না। তারা যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, কিছু কমিটমেন্ট আছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় না। এসব বিষয় নিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ হয় না, এটা দুঃখজনক। জনপ্রতিনিধিদের এ অভিযোগের বিষয়ে আরও সচেতন হতে ডিসিদের বলা হয়েছে।’

প্রবাসীদের পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তির কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি প্রবাসীরা সঠিক সময়ে সেবা পান না। পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন নেওয়াসহ নানা সেবা নিতে হয়রানির শিকার হন। এসব হয়রানি দূর করে প্রবাসীদের সেবা সহজ করতে ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প তদারকিতে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসিরা। অধিবেশনেই তা নাকচ করে দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। এ ধরনের কমিটি ছাড়াই আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তদারকি চালিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাবেক এ আমলা বলেন, ‘ডিসিরা চেয়েছিল প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন জেলা পর্যায়ে কমিটি করা হয়। আমরা বলেছি কমিটি করার প্রয়োজন নেই। এলাকার ভেতরে কাজ দেখার অধিকার ডিসিদের আছে। আমিও ডিসি ছিলাম। আমি মনে করি এটা প্রয়োজন নেই।’

বড় প্রকল্পগুলো সাধারণত এক জেলায় সীমিত থাকে না। তাই এ ধরনের কমিটি থাকার সুযোগ দেখেন না প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান।

জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিসিরা জেলা পর্যায়ে অর্ধশতাধিক কমিটির প্রধান। তারা তাদের কাজের চাপে ‘চ্যাপ্টা’ অবস্থায় থাকেন। এ অবস্থায় নতুন কমিটি প্রধান হলে তারা কতটুকু সময় দিতে পারবেন তা সহজেই অনুমেয়। তারা এমন সব কমিটির প্রধান যেগুলো নিয়ে অন্য দপ্তরের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তোলেন। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির তারা সভাপতি। কিন্তু পুলিশের কথা হচ্ছে, এ কমিটির প্রধান হওয়া উচিত পুলিশ সুপারের (এসপি)। এ কারণে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক হলে তাতে এসপি উপস্থিত থাকেন না। তারা জুনিয়র কোনো কর্মকর্তাকে ওই বৈঠকে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।

তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) কার্যালয় করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর একটা নির্বাহী আদেশ আছে। আইএমইডিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিভাগীয় পর্যায়ে আইএমইডির কার্যালয় স্থাপনের ফাইলটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টি উল্লেখ করে ডিসি সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমএ মান্নান। তিনি বলেছেন, ‘সেটা এখনো এগিয়ে চলছে। সময়মতো নিশ্চয়ই এটা হবে।’

জানা গেছে, প্রশাসন ক্যাডারসংশ্লিষ্ট বিষয় যতটা গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা হয় অন্য ক্যাডারের বিষয় ততটাই উপেক্ষিত থাকে। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প শুরুর অন্যতম জটিলতা হলো ভূমি অধিগ্রহণ। সময়মতো এ কাজ না করার কারণে উন্নয়নকাজ পিছিয়ে পড়ে। এতে সরকারের খরচ বাড়ে। ভূমি অধিগ্রহণের কাজও করেন ডিসিরা। এবারের সম্মেলনে এ বিষয়টিও উঠেছে বলে জানিয়েছেন একজন ডিসি।

সম্মেলনের আগে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাঠামো নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সম্মেলনে ডিসিদের পক্ষে একটি প্রস্তাব ছিল বহুতল ভবন করার জন্য। সম্মেলনে সরাসরি তা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা, বাংলাদেশে মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন, ভূমিহীন থাকবে না। বহুতল ভবন করলে এতে দীর্ঘ সময় লাগবে। মুজিববর্ষে গৃহহীন না থাকার যে পরিকল্পনা তা বাস্তবায়িত হবে না। এ প্রকল্পের জমি বন্দোবস্তের মেয়াদ ৯৯ বছরের বদলে ৩০ বছর করার প্রস্তাবও নাকচ করেছে সরকার।

এবারের ডিসি সম্মেলন অন্যবারের চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ডিসি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মন্ত্রীরা সাধারণত নিজেদের মন্ত্রণালয়ের বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু এবারে একাধিক মন্ত্রী নিজের মন্ত্রণালয়ের বাইরে গিয়ে কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে কথা বলেছেন। ভূমিসংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের অফিস বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন আছে, সেটার অ্যালোকেশন অব বিজনেস পরিবর্তন করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এলে কাজে গতি আসবে বলে মনে করেন বর্ষীয়ান এ মন্ত্রী।

ওই ডিসি আরও জানিয়েছেন, সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন কেন এটা হয় বা কারা এটা করে। তিনি প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব তাকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন গত বছর ১৪ জুন সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা অতিধনী ক্ষুদ্রগোষ্ঠী ও সামরিক-বেসামরিক আমলাগোষ্ঠী। জীবন ও জীবিকা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কিন্তু দেশে আমলাগোষ্ঠী ও দুর্নীতিবাজদের পাকচক্রে প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রয়াস অনেকখানিই নিষ্ফল হয়েছে।

রাশেদ খান মেনন এবারের ডিসি সম্মেলনকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিসিরা মাঠে কাজ করে। বঙ্গবন্ধু ডিসিদের জনপ্রতিনিধিদের অধীনে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করেছেন। জিয়াউর রহমানের সময়ে এসে তা উল্টে যায়। সেই থেকে শুরু। যাই হোক, অনেক দিন পর এসে যদি পরিস্থিতি পাল্টায় সেটা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক।’