আইভী মডেলেই আস্থা|340693|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
আইভী মডেলেই আস্থা
পাভেল হায়দার চৌধুরী

আইভী মডেলেই আস্থা

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা, ক্ষমতাসীন দলের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে বিভিন্ন মহলে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা ও সমালোচনা চলছিল। সে বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন ছিল ব্যতিক্রম। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয় দলের নেতাকর্মীদের যেমন আত্মবিশ্বাসী করেছে তেমনি ভরসাও জোগাচ্ছে। তারা বলছেন, আইভীর মতো প্রার্থীর হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দিলে নারায়ণগঞ্জের মতো নির্বাচন দিয়েও টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় বসতে পারবে আওয়ামী লীগ। সে ক্ষেত্রে দলীয় ঐক্যও অটুট থাকতে হবে বলে মনে করছেন দলটির তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় নেতারা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত কয়েক বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাদের হাতে নৌকা তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকেই দলের জন্য ‘বারডেন’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণে দলে বিদ্রোহী পক্ষও সৃষ্টি হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনাও দলের বিদ্রোহী অংশের জন্য সৃষ্টি হয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, নারায়ণগঞ্জে জনপ্রিয় প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে বলেই নির্বাচনেও বিজয়ী হয়েছে নৌকা। তাই জনপ্রিয়তার কারণে ভোটে জিতবে এমন প্রার্থীদের খুঁজে বের করতে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী নেতাদের পরামর্শ দিচ্ছেন দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা। তারা বলেছেন, নির্বাচনে গ্রহণযোগ্য-পরীক্ষিত প্রার্থীই জনগণ চায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে নির্বাচনে নানা অসন্তোষ দেখা দেয়। বিদ্রোহী প্রার্থী যেমন দাঁড়িয়ে যায়, আবার দলীয় প্রার্থী হেরে যায় এটা চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলেন, ইউপি নির্বাচনের মনোনয়ন দেনদরবার ছাড়া দেওয়া গেলে এত পরাজয়ের ঘটনা ঘটত না। আইভীর মতো প্রার্থী খুঁজে বের করতে পারলে দলের ভেতরে বিদ্রোহীও থাকত না। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ‘ঝুঁকি’ অনায়াসেই নেওয়া যেত।

চলমান ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে বেশিরভাগ ইউপিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। দ্বিতীয় ধাপে জয়ের হার কমে আসে। সেই ধারা চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পঞ্চম ধাপে এসে আওয়ামী লীগের তুলনায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই বেশি বিজয়ী হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। অনেক ইউপিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জামানতও হারিয়েছেন। এছাড়া এবার রেকর্ড তিন শতাধিক ইউপিতে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন।

এমন ফলাফলের পেছনের কারণ সম্পর্কে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মনোনয়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় কেন্দ্রে আমাদের পাঠানো নামগুলোর কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয় না। চেষ্টা-তদবিরেও নামের তালিকায় ঠাঁই না পাওয়া একজনকে মনোনয়ন দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিদ্রোহী হয়ে প্রার্থী দাঁড়ান দলীয় লোকই। আবার নৌকাকেও হারিয়ে দেন দলীয় নেতাই।’ গোলাম ফারুক বলছেন, প্রথম ধাপের নির্বাচন থেকে তৃতীয় ধাপের নির্বাচন পর্যন্ত তৃণমূলের নেতারা এমন অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে মেনে নিলেও চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে অনেক তৃণমূল নেতা তা মেনে নেননি বলে বিদ্রোহীদের জয় বেড়েছে, নৌকা পরাজিত হয়েছে। সে কারণে তিনি মনে করেন, মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রে সব নেতাকে নির্মোহ হতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইভীর হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। সারা দেশে আইভীর মতো প্রার্থী অসংখ্য আছে। নানা কারণে সামনে আসতে পারেন না তারা। ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক হাইব্রিড নেতা দলে জায়গা করে নিয়েছেন। ফলে আইভীর মতো প্রার্থীদের দূরেই থাকতে হয়।’

গোলাম ফারুক বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আইভীর মতো প্রার্থীদের ওপর আস্থা রাখলে ক্ষমতা ধরে রাখতে বেগ পেতে হবে না।’

২০১১ সালে প্রতীকবিহীন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে ভোট করেন নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য শামীম ওসমান। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘বিদ্রোহী’ প্রাথী হয়ে ওই নির্বাচনে শামীম ওসমানকে ১ লাখ ৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে নৌকা প্রতীক নিয়ে ৭৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন তিনি। সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারির ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে নৌকা প্রতীক নিয়ে ৬৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে জেতেন আইভী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নানা ঘাত-প্রতিঘাত, হুমকিধমকি উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের সমর্থনে মেয়র পদে তিনবার জয়ী হয়েছেন আইভী।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে আইভীর মতো প্রার্থী দিলে আওয়ামী লীগ চতুর্থ মেয়াদেও ক্ষমতায় আসবে, কোনো স্তরের নির্বাচনেই নৌকা প্রতীক হারবে না।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের আরও অন্তত ছয়টি জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক একই কথা বলেছেন, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের কাছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের আরও পরামর্শ হলো যেকোনো স্তরের নির্বাচনে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, দক্ষতা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করা জরুরি। এতে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রবণতাও কমে যাবে। পক্ষপাতদুষ্ট মনোনয়নের কারণে বিদ্রোহও দমন করা যায় না।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা পরাজিত হওয়া ও বিদ্রোহী প্রার্থী দমন করতে না পারার অন্যতম কারণ প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়ন বোর্ডের ভুল সিদ্ধান্ত। ঢাকার খুব কাছের জেলা নারায়ণগঞ্জ হওয়ায় এবং আলোচিত জেলা বলে সেখানে আইভীকে বেছে নিতে সহজ হয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। কারও পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। যদি পরামর্শ নিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হতো, আইভীর মতো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া দলীয় সভাপতির জন্য অসম্ভব হয়ে উঠত।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই করা হয় এখন। তার দাবি, এই গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের আলোকে মনোনয়ন দিয়ে দেওয়া হয়। বেশিরভাগ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে মাঠের চিত্র তুলে ধরে হয় না।

আনোয়ার হোসেন বলেন, দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের নেতৃত্বে সারা দেশ সফর করে তাদের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী মনোনয়ন দেওয়া হলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম হবে। ফলে জনপ্রিয় প্রার্থী পাওয়া যাবে।

আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য নৌকার বিজয় নিশ্চিত করে সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রমাণ করলেন সততার সঙ্গে কাজ করলে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দিলে এবং সহিষ্ণু রাজনৈতিক আচরণ করলে আওয়ামী লীগকে কেউ হারাতে পারবে না।’ এই পরীক্ষিত পথ থেকে বিচ্যুত হলে নৌকা পেয়েও যে নির্বাচনে জেতা যায় না সাম্প্রতিক ইউপি নির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। লেনিন বলেন, ‘ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইভীর নজির অনুসরণ করলে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ পপুলার ভোটে জয়লাভ করবে। আর প্রার্থী মনোনয়নে ভুল করলে, বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে এবং সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক আচরণ না করলে পপুলার ভোটে জয়লাভ করা যাবে না।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আইভী যে পথ দেখালেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা তা অনুসরণ করবেন।’

গাজীপুর শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন আমাদের সবার জন্য উদাহরণ। সংসদ সদস্যদের জিততে হলে কী করতে হবে সেটা যেমন শিখিয়ে দিয়েছেন, তেমনি মনোনয়ন কী ধরনের প্রার্থীকে দেওয়া উচিত সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।’ তিনি বলেন, ‘পপুলার ভোট ও পপুলার প্রার্থী নির্বাচনে একে অপরের পরিপূরক।’

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামনের সংসদ নির্বাচনে দলকে জেতানোর অন্যতম কৌশল হবে দলের ঐক্য ফিরিয়ে আনা। টানা ক্ষমতায় থাকায় তৃণমূলের রাজনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনে জিততে প্রার্থী ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।’

দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে তৃণমূলে চরম অনৈক্য বিরাজমান। আগামী নির্বাচনের আগে দলের শৃঙ্খলা ও ঐক্য ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি প্রার্থী বাছাই হবে ভিন্ন কৌশলে। জেলা-উপজেলা সফরে নেমে কেন্দ্রীয় নেতারা একটি নির্মোহ জরিপ চালাবেন। সেই জরিপ আমলে নিয়ে নৌকার টিকিট পাওয়ার যোগ্যদের বেছে নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এছাড়া চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় আমরা নোটডাউন করে রাখছি।’