নেতাজির অসাম্প্রদায়িকতা|340785|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
নেতাজির অসাম্প্রদায়িকতা
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নেতাজির অসাম্প্রদায়িকতা

আমাদের শৈশব-কৈশোরে প্রতিবছর তেইশে জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান। খুব ভোরে উঠে স্কুলে যেতে হতো। সেখানে জড়ো হতাম ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তারপর বিশাল লাইন করে আমাদের গেম টিচার সন্তোষ স্যারের নেতৃত্বে শুরু হতো পদযাত্রা। প্রায় একঘণ্টা ধরে। অতি ভাগ্যবতী জনৈক ছাত্রী নেতাজির একটি বাঁধানো ছবি দুই হাতে তার বুকে আগলে নিয়ে মিছিলের পুরোভাগে থাকত। তাকে কেবল এ দিনটিতেই নয়, সারা বছর ধরেই ঈর্ষা করতাম।

মিছিলে একটাই স্লোগান, ‘নেতাজি! ফিরে এসো!’ সে-বয়সে নেতাজি সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানতাম না। তিনি কোথায় গেছেন, ফিরে আসবেনই বা কেন, সেসবও বুঝতাম না। আমাদের কাজ ছিল মিছিলে শামিল হওয়া, স্লোগানে প্রতিধ্বনি তোলা আর মিছিল শেষ হলে স্কুল থেকে দেওয়া ইয়া বড় আস্ত একটি কমলালেবু নিয়ে বাড়ি ফেরা। নেতাজির চেয়ে ওই কমলালেবুটিই সে সময় বেশি গুরুত্ব পেত, বলতে দ্বিধা নেই।

সকালের পর দুপুর। তখন আমাদের পাড়ায়, প্রতি পাড়ায় যেমন, ঠিক সোয়া বারোটার সময় বেজে উঠত শাঁখ। পরিবেশিত হতো জাতীয় সংগীত। ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠানটি পরিবেশিত হতো। দুপুর সোয়া বারোটা কেন? ১৮৯৭-এর ২৩-এ জানুয়ারি ওইসময়েই নেতাজি জন্মেছিলেন, সেজন্য। বয়স যত বেড়েছে, নেতাজি সম্পর্কে ততই বেশি করে জেনেছি। মহান দেশপ্রেমিক সশস্ত্র সংগ্রামী নেতারূপে তাকে ভালোবেসেছি এবং বারবার শ্রদ্ধাবনত হয়েছি সব ধর্মের মানুষের প্রতি তার সমদর্শী ও উদার মনোভাবে।

নেতাজির অনন্যতা কোথায়? ব্রিটিশ ঐতিহাসিক হিউ টয় থেকে নেতাজি সম্পর্কে সাম্প্রতিক মারাঠি গবেষক বিশ্বাস পাতিল সবাই বলেছেন, নেতাজির স্বপ্নময়তা, যার বাস্তব প্রয়োগ তিনি ঘটাতে পেরেছিলেন অনেকটাই। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে নেতারা আত্মনিয়োগ করেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে জওয়াহেরলাল, বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায়, রাজেন্দ্রপ্রসাদ কেউই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহের পর যে ভারতবাসীর হাতে অস্ত্র থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, সেই ভারতবর্ষের কেউ অস্ত্র হাতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন, এটা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু নেতাজি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যুদ্ধ বিনা ভিক্ষা করে কখনো দেশকে স্বাধীন করা যাবে না।

নেতাজির আগেও অনেক দেশপ্রেমিকের এমন উপলব্ধি হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেস যে তার আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি নিয়ে সফল হতে পারবে না, তাতে নির্দ্বিধ হয়ে মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত তো কংগ্রেসের অমরাবতী অধিবেশনে বলেই ফেললেন, এসব বাৎসরিক সর্বভারতীয় তিনদিনের সভা ও রাজনৈতিক সমাবেশ হচ্ছে ‘Three day’s mockery’’, অর্থাৎ তিনদিনের তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। কংগ্রেসের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল নরমপন্থি ও চরমপন্থি দল। এরই ফলে মুম্বাইতে বিদ্রোহী হলেন তিন চাপেকর ভাই দামোদর, বালকৃষ্ণ ও বাসুদেব। ১৮৯৭-এর ২২ জুন তারা ব্রিটিশ প্লেগ কমিশনার রান্ডকে হত্যা করার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ভারতে সর্বপ্রথম সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা হয়।

সেই থেকে শুরু। তারপর একে একে দেখতে পাব, ১৯০৮-এ ক্ষুদিরামের পিস্তল গর্জে ওঠা, ১৯১৫-তে বুড়িবালামের যুদ্ধে বিপ্লবী বীর বাঘা যতীনের মৃত্যুবরণ, একের পর এক ম্যাজিস্ট্রেট-হত্যা, মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ১৯৩০-এর ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ, এরকম একের পর এক ঘটে যাওয়া সশস্ত্রতা। বিপ্লবীরা জানতেন, একজন-দুজন ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তিকে হত্যার মাধ্যমে এইভাবে স্বাধীনতা আসবে না। সশস্ত্র অভ্যুত্থানের, রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধেও যে অস্ত্র ধরা যায়, সেটা প্রমাণ করাই উদ্দেশ্য ছিল তাদের। এবং এ-কাজে বীণা ঘোষ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারদের মতো নারীরাও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন।

নেতাজি এই সশস্ত্র সংগ্রামকেই বৃহত্তর আকার দিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের মাধ্যমে। বিদেশের মাটিতে স্বাধীন ভারত সরকার স্থাপন করে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার মতো দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। কাজটি এককথায় মনে হবে অলীক ও অবিশ্বাস্য। কিন্তু ইতিহাসে বাঙালি এমনই এক জাতি, যে-জাতি অবিশ্বাস্য বহু ঘটনা ঘটিয়েছে বারবার। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ত্রুটি নির্দেশ করেছেন বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। রুশ বিপ্লবের উদ্গাতা লেনিনের ‘April Thesis’’-এর সংশোধনী আনেন বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায়। বাংলা মুলুক থেকে সুদূর ব্রাজিলে গিয়ে সেনাবাহিনীতে কর্নেল হন সুরেশ বিশ্বাস। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অলৌকিক ক্ষমতা ও দক্ষতায় জন্ম হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু নেতাজিকে অপার শ্রদ্ধা করতেন। তার সুবিখ্যাত আত্মজীবনীতে অকুণ্ঠচিত্তে নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সেই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে নেতাজি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা এইরকম: ‘মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন ইংরেজের আতঙ্ক। স্বদেশি আন্দোলন তখন মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে। আমার মনে হতো, মাদারীপুরে সুভাষ বোসের দলই শক্তিশালী ছিল। পনেরো-ষোলো বছরের ছেলেদের স্বদেশিরা দলে ভেড়াত। আমাকে রোজ সভায় বসে থাকতে দেখে আমার ওপর কিছু যুবকের নজর পড়ল। ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হলো। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নেই। স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম। এই সভায় যোগদান করতে মাঝে মাঝে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর যাওয়া-আসা করতাম। আর স্বদেশি আন্দোলনের লোকদের সঙ্গেই মেলামেশা করতাম।’

এভাবে নেতাজি নিজের স্বদেশি চিন্তা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন ভারতবর্ষজুড়ে। তাই নেতাজি কখনো ফুরিয়ে যাবেন না। তার আদর্শ আমাদের এখনো অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা দিয়ে যায়।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক