বিধিনিষেধে ভয় ব্যবসায়ীদের|340876|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
বিধিনিষেধে ভয় ব্যবসায়ীদের
শেখ শাফায়াত হোসেন

বিধিনিষেধে ভয় ব্যবসায়ীদের

প্রতিদিনই বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যা ও মৃত্যুর ঘটনা। এর মধ্যে ওমিক্রনের ধাক্কা সামলাতে সরকার স্কুল-কলেজ দুই সপ্তাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার জন্য নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সার্বিক চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ভয় আছে ব্যবসায়ী মহলে।

তা ছাড়া সংক্রমণ এড়াতে অনেকেই হাট-বাজারসহ সব ধরনের জনসমাবেশ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন। এতে করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ভিত্তি রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়ানোর যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তাও মুখ থুবড়ে পড়তে পারেএমন আশঙ্কা করছেন পোশাক কারখানার মালিকরা। এ কারণে তারা দেশে আর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ না করার পক্ষে। তাদের দাবি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকল পোশাক কারখানা খোলা রাখতে হবে। এ খাতের কর্মীদের টিকাদান কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে হবে।

২০২০ সালের মার্চে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর পর সরকার টানা ৬৬ দিন জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছুতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। দ্বিতীয় ঢেউয়ে এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দফায় দফায় চলাচলে বিধিনিষেধ ছিল। এই সময়ে অনেক অফিস খোলা থাকলেও বিপণিবিতানগুলো বন্ধ ছিল।

করোনার কারণে পোশাক খাতের ৩০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ বিলম্বিত হয়। বর্তমানে এই খাতটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রপ্তানি আয় ২৮.৪১ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪৬৯ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছেন। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রমনের দ্রুত বিস্তার অর্থনীতির জন্য নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের বায়ারদের ক্রয়াদেশে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে। তবে কোনো দেশ এখনো পণ্য নেওয়া বন্ধ করেনি। আমরা আর বিধিনিষেধ চাই না। বিধিনিষেধ দিলে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের হুমকিতে পড়ে। তেমন কোনো পদক্ষেপ নিলে করোনার প্রথম ঢেউয়ে আমরা যে পরিমাণ ক্ষতির মধ্যে পড়েছি তা পুনরুদ্ধার আরও পিছিয়ে যাবে।’

শাশা ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘বর্তমানে বাইরের দেশগুলোতে অনলাইন শপিং তুলনামূলক আগের থেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই আমাদের দেশ থেকে পোশাক রপ্তানি বন্ধের কোনো আশঙ্কা নেই। তা ছাড়া আমরা কারখানাগুলো সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালনার উপযুক্ত করে নিজেদের গড়ে তুলেছি।’

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৬১৪ জন। শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ০২ শতাংশ।

এর মধ্যে গত শুক্রবার দুই সপ্তাহের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ১০০ জনের বেশি লোকের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বিপণিবিতানসহ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই উদ্যোক্তাদের মধ্যেও ভয় আছে।

আগেরবার করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পোশাক খাতসহ সব ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সরকার স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণের জন্য প্রথম দফায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নেয়। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় প্রণোদনার ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। তা ছাড়া ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে প্রায় দুই বছর ছাড় দেওয়া হলেও চলতি ২০২২ সাল থেকে সেই ছাড় তুলে নেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতিতে আবার ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হলে তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে জানান এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধে আরও ছাড় দরকার। তা ছাড়া কোনোভাবেই আর ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যাবে না। তাতে উদ্যোক্তাদের পক্ষে আর উঠে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।’

জাহাজী লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজল আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা নিয়ে তারাও উদ্বিগ্ন। নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তাদের প্রতিষ্ঠানের মতো উদীয়মান প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে। এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানই করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘করোনা নিয়ে নতুন শঙ্কার মধ্যে প্রণোদনা ঋণ ছাড়ের প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। যতটা পারা যায় অনলাইনে নথিপত্র জমা দিয়ে ঋণের আবেদন নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট উদ্যোগগুলোতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা সহজে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে, ছোটদের পক্ষে ততটা সহজে এই বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না।’

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চাই না আর দোকানপাট বন্ধ থাকুক। গতবার এ খাতের ব্যবসায়ীদের যে পরিমাণ ধকল পোহাতে হয়েছে, তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া আমরা দোকান মালিকরা মাস্ক পরিধান করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচাকেনা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ফলে সংক্রমণ বাড়লেও দোকান খোলা রাখা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।’