প্রশ্ন ফাঁস করেই ৫০ কোটি টাকার মালিক নোমান!|341461|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
প্রশ্ন ফাঁস করেই ৫০ কোটি টাকার মালিক নোমান!
সরোয়ার আলম

প্রশ্ন ফাঁস করেই ৫০ কোটি টাকার মালিক নোমান!

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার নোমান সিদ্দিকীর একাধিক গাড়ি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ছাড়া নোমান তার চারটি ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থসহ অন্তত ৫০ কোটি টাকার মালিক বলে ওই কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন।

ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অডিটর পদে নিয়োগের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় গত শুক্রবার নোমান সিদ্দিকীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তাদের মধ্যে আছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরীন রুপাও। পুলিশ আদালতের মাধ্যমে তাদের দুদিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চক্রটি প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের অধীন ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অডিটর পদে নিয়োগ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গেও জড়িত। তাদের মাধ্যমে যারা চাকরি পেয়েছিলেন তাদের তালিকা তৈরি করছে পুলিশ। আর পুরো বিষয়টি মনিটরিং করছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একসময় নোমান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। আর সেই সুবাদে র‌্যাবেও কাজ করেছেন কিছুদিন। স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে। আট বছর ধরেই বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তিনি জড়িত। তার দলে আছেন নামিদামি স্কুলের শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ অন্তত এক ডজন রাঘব বেয়াল। এর মধ্যে কয়েকজনকে নজরদারিতে আনা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, নোমান সিদ্দিকী ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়েই তার নিকটাত্মীয়-স্বজনদেরও চাকরি দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে নোমান সিদ্দিকী পুলিশকে জানিয়েছেন, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএতে) শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধন পাওয়া ওমর ফারুকের সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় ছিল উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরীন রুপার। সম্প্রতি ফারুকের মাধ্যমে রুপার সঙ্গে পরিচয় হয় নোমান সিদ্দিকীর। সেই সূত্র ধরে আরও কিছু চাকরিপ্রার্থীকে সংগ্রহ করেন রুপা। ওই সব ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া হয় ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে। ১৮ জনের কাছ থেকে নেওয়া টাকা বিকাশ ও রকেটে লেনদেনের বিষয়টি নজরে আসে গোয়েন্দাদের। এরপর তারা নজরদারি শুরু করলে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি বেরিয়ে আসে। অভিযুক্ত ওমর ফারুক বর্তমানে পলাতক।

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নোমানের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলগিয়া এলাকায়। গ্রামে অন্তত ৩০ লাখ টাকা খরচ করে একটি ভবন তৈরি করেছেন নোমান। জমি কিনেছেন অন্তত ৫ বিঘা। গুলশান, উত্তরা, মিরপুরে চারটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। পূর্বাচলে আছে ৫ কাঠার প্লট। চারটি ব্যাংকে ১০ কোটি থেকে ১২ কোটি টাকা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তার নামে বিকাশ ও রকেটেও পাওয়া গেছে কয়েক লাখ টাকা। পাশাপাশি আছে দুুটি দামি প্রাইভেট কার। তার দুই সন্তান লেখাপড়া করে ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে। সব মিলিয়ে তিনি অন্তত ৫০ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। আর এগুলো করেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অর্জিত অর্থের মাধ্যমে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান জোনের উপপুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় মাস্টারমাইন্ড নোমান সিদ্দিকী। সেনাবাহিনীর সাবেক এই ওয়ারেন্ট অফিসার একসময় র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৪ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর প্রশ্ন ফাঁসে জড়িয়ে পড়েন। সেখান থেকে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা উপার্জন করেছেন।

মশিউর রহমান আরও বলেন, সম্প্রতি নোমান তার চক্রে আরও একাধিক সদস্যকে যুক্ত করেন। এর মধ্যে এনটিআরসিএতে নিবন্ধিত ওই শিক্ষক ওমর ফারুকও রয়েছেন। ৮ বছর ধরে নোমান একাধিক ব্যক্তিকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। তা ছাড়া তিনি গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত শুক্রবার কাফরুলের সেনপাড়া পর্বতার ৪৯৮/৪ ভবনের এ/২ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে নোমান সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার বাসা ও দেহ তল্লাশি করে ৪টি মোবাইল সেট ও একটি ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে অডিটর নিয়োগ পরীক্ষার পার্ট-১-এর এমসিকিউ প্রশ্নপত্রের ফটোকপি পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ওই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আট চাকরিপ্রার্থীর নামের তালিকা উদ্ধার করা হয়। ওই প্রার্থীরা হচ্ছেন ফারদিন ইসলাম, লুৎফর রহমান, আমিনুল ইসলাম, সেলিম মাতবর, আহাদ খান, পারুল বালা, আকলিমা খাতুন ও মোরশেদ। একই সময় গ্রেপ্তারকৃত মাহমুদুল হাসান আজাদের দেহ তল্লাশি করে মফিজুর রহমান, পল্লব কুমার, হাসিবুল হাসান, সুরুজ আহম্মেদ নামে আরও চারজনের প্রবেশপত্র ও হাতে লেখা উত্তরপত্র উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে নাইমুর রহমান তানজীর ও শহিদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করলে তাদের কাছ থেকেও ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তরপত্র ও বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক বিকাশ ও রকেটের নম্বরে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে বিজি প্রেসের কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। নোমান সিদ্দিকীর বাসায় অভিযান শেষে পুলিশ বিজি প্রেস স্কুলে অভিযান চালায়। সেখান থেকেই ভাইস চেয়ারম্যান রুপাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মেসেঞ্জার থেকে হিরণ খান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে তাদের মধ্যে বিশদ আলোচনা হয়। এমনকি ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কিছু উত্তরও পাওয়া যায়।