ভিক্ষুক পুনর্বাসনের টাকা যায় কোথায়|341464|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
ভিক্ষুক পুনর্বাসনের টাকা যায় কোথায়
আশরাফুল হক

ভিক্ষুক পুনর্বাসনের টাকা যায় কোথায়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি মালদ্বীপ সফর শেষে দেশে ফিরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মদকে ডেকে পাঠান। ডাক পেয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সব বিষয়ের আপডেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাজির হন। প্রধানমন্ত্রী সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর কাছে শুধু ভিক্ষুকমুক্ত ঢাকার খবর জানতে চান। ভিক্ষুক বেড়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করে মন্ত্রীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে মন্ত্রী ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির স্টিয়ারিং কমিটির সভা ডাকার নির্দেশ দেন। সমাজকল্যাণ সচিব মাহফুজা আখতারের সভাপতিত্বে গত ৪ জানুয়ারি সভা অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মদও উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিষয়টি সভায় উল্লেখ করে ভিক্ষুকমুক্ত ও তাদের পুনর্বাসন করার জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। বৈঠকে ভিক্ষুকমুক্ত ঢাকা করার জন্য ১০ থেকে ১৫ দিনের ক্রাশ প্রোগ্রাম করার সিদ্ধান্ত হয়। নানা কর্মসূচি নেওয়ার পরও ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ না হওয়ার জন্য বৈঠকে অসহায়ত্ব প্রকাশ করা হয়।

এ বিষয়ে জানার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমকি ফোনেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান খসরুর সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে ঢাকাসহ সারা দেশে ভিক্ষুক বেড়েছে। ভিক্ষা পেশা যেন কেউ গ্রহণ না করে সেজন্য আমরা নানা কর্মসূচি নিয়েছি। ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে তাদের পুনর্বাসন করা হবে। এছাড়া ডিসিদের কাছেও পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে এ কাজে ব্যয় করার জন্য।’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের কাছে ২ কোটি করে টাকা দেওয়া আছে। তারা তাদের জেলা ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য এ টাকা ব্যয় করবেন। এ টাকা ব্যয় হয় ঠিকই কিন্তু ভিক্ষুকমুক্ত হয় না। তাহলে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের টাকা কোথায় যায়? এ টাকা কোথায় যায়, নতুন প্রকল্প না করে আগে তার সন্ধান করা উচিত। এ বছরও সরকার ১ কোটি টাকার বাজেট বাড়িয়েছে। স্টিয়ারিং কমিটির সভায় ভিক্ষুকদের জরিপ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ ২০১১ সালে ভিক্ষুকদের জরিপ করা হয়েছে। সেই জরিপ অনুয়ায়ী তথ্য সংগ্রহ করা হয় ১০ হাজার ভিক্ষুকের। এদের মধ্যে বিভিন্ন জেলায় পুনর্বাসনের জন্য নির্বাচিত করা হয় ২ হাজার ভিক্ষুককে। তাদের কেন পুনর্বাসন করা হলো না তা খুঁজে বের করা দরকার।

২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য টার্গেট নিয়েছিল সরকার। এজন্য নানা ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর নানা কর্মসূচি তো রয়েছেই। নিরাপত্তা বেষ্টনীর বেশিরভাগ কর্মসূচিই প্রান্তিক পর্যায়ের অসহায় মানুষের সহায়তায় বাড়তি নজর দেওয়ার কর্মসূচি। তাদের সহায়তা দেওয়ার অংশ হিসেবে এই খাতে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে চলতি বছর। এত টাকা ব্যয় করার পরও রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে পারছে না সরকার। ভিক্ষুকের সংখ্যা তো কমছেই না বরং বাড়ছে দিন দিন। ভিক্ষাবৃত্তি ঘিরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের সিন্ডিকেট।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় ধানম-ি ৬এ নম্বর রোডে লেকপ্রান্তে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা ঘোষণার একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে। সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধকরণ পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করা হবে।’ সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই সাইনবোর্ডের নিচে বসেই ভিক্ষা করছেন এক প্রতিবন্ধী নারী। তার পাশেই রয়েছেন আরও কয়েকজন ভিক্ষুক। তারা সবাই থালাবাটি হাতে ভিক্ষা করছেন।

প্রতিবন্ধী ওই ভিক্ষুকের নাম নাজমা। তিনি থাকেন কামরাঙ্গীরচরে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কামরাঙ্গীরচর থেকে রিকশায় করে তিনি ভিক্ষা করতে ধানম-ি আসেন। রিকশা ভাড়ার পেছনে তার মাসে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়।

ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দারিদ্র্য, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ-বালাই, ভিক্ষাবৃত্তিতে অর্থোপার্জন এসব কারণে বড় শহরগুলোতে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বিভিন্ন শহরের প্রধান প্রধান সড়ক, ফুটপাত, ট্রাফিক সিগন্যাল, বিপণিবিতান ও বাজার, অফিস চত্বর, মসজিদ ও জনবহুল স্থানে বিভিন্ন বয়সী পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের ভিক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও শিশু একটি বড় অংশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করার জন্য সরকার ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান নীতিমালা-২০১৮’ প্রণয়ন করেছে। বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি করেছে। এ ছাড়া পৌরসভা কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, সিটি করপোরেশন অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, বিভাগীয় ও জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি তো রয়েছেই।

গত ৪ জানুয়ারি স্টিয়ারিং কমিটির যে বৈঠক হয় তার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায় যে, সভাপতির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ সচিব মাহফুজা আখতার বলেছেন ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য সরকার সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ভাতা প্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাসহ নানা কার্যক্রম গ্রহণ করলেও এখনো ভিক্ষাবৃত্তি চালু রয়েছে, যা অনাকাক্সিক্ষত। ভিক্ষুকের সংখ্যা ঢাকা শহরে তুলনামূলক বেশি বিবেচনায় ১০ থেকে ১৫ দিনের বিশেষ কার্যক্রম নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিচালনা, প্রচার, পর্যবেক্ষণ করে পুনর্বাসন করা হবে। জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে থাকা অর্থের যথাযথ ব্যবস্থা করে জেলাগুলোকে ভিক্ষুকমুক্ত করা হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বৈঠকে জানান, ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা দরকার। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেসি সহায়তাও প্রয়োজন।

ওই সভায় ঢাকার ডিসি উপস্থিত ছিলেন। তিনি সভায় জানান, ঢাকা শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য ১০ থেকে ১৫ দিনের ক্রাশ প্রোগ্রাম দরকার।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ঢাকা মহানগরীর বিমানবন্দর প্রবেশের চৌরাস্তা, বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি, হোটেল রেডিসন এলাকা, ভিআইপি রোড, বেইলি রোড, হোটেল সোনারগাঁও, হোটেল রূপসী বাংলা এলাকা এবং কূটনৈতিক জোনসহ মহানগরী ঢাকা ভিক্ষুকমুক্ত ও ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার এবং ঢাকার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। 

বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, ভিক্ষুকদের ধরে এনে সাময়িক ব্যবস্থাপনায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রাখা হবে। স্থান সংকুলান না হলে আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ী ভিত্তিতে টিনশেডের ডরমিটরি নির্মাণ করা হবে। পরে তাদের নিজ গ্রামে ফেরত পাঠানো হবে এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় তাদের বাসস্থান করে দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ঋণ দেওয়া হবে। ভিক্ষুক নিয়ে জরিপ করার একটি প্রস্তাব সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরকে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য ১৫ দিনের কর্মসূচি নেওয়া হবে। কবে থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।