হার্ডলাইনে সরকার|341468|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
হার্ডলাইনে সরকার
উম্মুল ওয়ারা সুইটি, ঢাকা এবং ফখরুল ইসলাম ও আবদুল্লা মাসুদ, সিলেট

হার্ডলাইনে সরকার

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ ইস্যুতে সরকার ও আন্দোলনকারীরা অনড় অবস্থানে। ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে উপাচার্যের পদত্যাগ নয়’ এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার সর্বশেষ রাত সাড়ে ৯টায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনশনসহ অন্যান্য কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে সকালে আন্দোলনকারীদের অর্থসহায়তা দেওয়ার অভিযোগ এনে শাবিপ্রবির ৫ সাবেক শিক্ষার্থীকে ঢাকায় আটক করে সিলেট নিয়ে যাওয়া হয়। রাতেই জালালাবাদ থানায় পাঁচজনসহ অজ্ঞাত দেড়শ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে নগরীর আম্বরখানার বাসিন্দা সুজাত আহমেদ লায়েক। পরে ঢাকা থেকে আটক পাঁচজনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলন বন্ধ করতে শিক্ষার্থীদের ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে তাদের আন্দোলন থেকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে। ভিসির অনুসারী শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কাজ করছেন। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে আন্দোলনকারীদের টাকার জোগান বন্ধ, ক্যাম্পাসে ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দেওয়া স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাহার, ক্যাম্পাসের খাবার দোকান বন্ধ করাসহ আরও বেশ কিছু প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য তৎপরতা চলছে। তবে তারা বলেছেন, উপাচার্যের পদত্যাগ ছাড়া আন্দোলনের সমাপ্তি তারা করবেন না।

সরকার পক্ষ ও শাবিপ্রবির সংশ্লিষ্ট প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ‘উপাচার্যকে বহাল রেখেই সরকার এই সমস্যার সমাধান চায়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের পক্ষে আনতেও তৎপরতা চালানো হচ্ছে। আবার এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বিষয় রয়েছে কি না, সেটিও দেখা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি গত সোমবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং তাদের চিকিৎসাসহ সব ধরনের বিষয় দেখা হচ্ছে। আর এই আন্দোলন শুধুই শিক্ষার্থীদের নয় বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রথমে ঢাকায় এসে কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে কেন সরে এলেন? শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অবশ্যই এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে।

প্রধানমন্ত্রী চাইলেই সমস্যার সমাধান করতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট-২ আসনের (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) সাংসদ  ও গণফোরামের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম মেম্বার মোকাব্বির খান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী তাদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। এখানে কোনো ধরনের রাজনীতি নেই। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে এগিয়ে আসেন সব সমস্যা সমাধানে। তিনি চাইলেই এই সমস্যা সমাধান করতে পারেন।’ গতকাল দুপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে মোকাব্বির খান এসব কথা বলেন। শাবিপ্রবির সমস্যা সমাধানে এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি শাবিপ্রবিতে আসেন। সেখানে তিনি আধা ঘণ্টা অবস্থান করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেন এবং গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে শিক্ষার্থীদের কথা বলিয়ে দেন।

এদিকে শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক ও বিভিন্ন মহল মনে করছে, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

গত কয়েক দিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শাবিপ্রবির শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারপক্ষের আলোচনায়ও কোনো সমাধান আসেনি; বরং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটা শুধুই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়। এর সঙ্গে অন্য কেউ, অর্থাৎ তৃতীয়পক্ষ জড়িত রয়েছে। এই আন্দোলনের মদদদাতা অন্য পক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে এই আন্দোলনে শক্তি-সাহস জোগানো হচ্ছে। ফলে সরকার শিক্ষার্থীদের দাবিকে প্রাধান্য না দিয়ে কিংবা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় না গিয়ে আন্দোলন বন্ধ করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল শাবিপ্রবি ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠন এবং শিক্ষকরা এই দাবির পক্ষে কর্মসূচি পালন করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে, দ্রুত সংকট সমাধানের; বিশেষ করে এই তীব্র শীতের মধ্যে অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে শিক্ষামন্ত্রী বা সরকারপক্ষকে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

সরকারপক্ষের নানামুখী উদ্যোগের বিষয় তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা বলেন, গত সোমবার মধ্যরাতে উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎসংযোগ পুনঃস্থাপিত হয়েছে। উপাচার্যের বাসভবনে খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে শাবিপ্রবির ৫ জন সাবেক শিক্ষার্থীকে ঢাকা থেকে আটক করে সিলেটে আনা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভিসির কাছ থেকে সুবিধাভোগীরা শুরু থেকেই আন্দোলন পণ্ড করতে নানা কৌশলে চাপ দিতে থাকে। দিনে দিনে এই চাপ বেড়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে পুলিশি ও রাজনৈতিক চাপ।’ শিক্ষার্থীরা জানান, তারা চাপে নত না হয়ে উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

এদিকে আমরণ অনশনের কারণে গুরুতর অসুস্থ শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে আন্দোলনকারীরা অনশন প্রত্যাহার করে কঠোর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীরা নতুন করে শপথ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের সহপাঠীদের আমরা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারি না। তাদের বাঁচাতে হবে, তাই তাদের অনশন ভাঙতে আমরা অনুরোধ জানাব। তবে আমাদের আন্দোলন থামবে না।’

আন্দোলনকারীদের অন্যতম মুখপাত্র মোহাইমিনুল বাশার বলেন, ‘উপাচার্যকে রক্ষায় যারা কাজ করছে, তারা নানা টালবাহানায় কালক্ষেপণ করছে। চাপ প্রয়োগ করছে। অন্যদিকে প্রায় দেড়শ ঘণ্টার টানা অনশনে ২৩ শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই আমরা সহযোদ্ধারা তাদের অনুরোধ করে অনশন ভাঙানোর উদ্যোগ নিয়েছি। তবে অনশন ভাঙলেও আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’

আন্দোলনকারীদের দেওয়া স্বাস্থ্যসেবা গত সোমবার রাতে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন শুরুর পর ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ এই স্বাস্থ্যসেবার আয়োজন করেছিল। যেসব শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ হচ্ছিলেন তাদের হাসপাতালে প্রেরণ এবং অন্যদের সেখানেই স্যালাইন প্রদানসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হতো। কিন্তু সোমবার রাতে ওই মেডিকেল টিম ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে শাবিপ্রবি প্রশাসনের নির্দেশে তারা ক্যাম্পাস ছেড়েছে। তবে মেডিকেল টিমের সমন্বয়ক, ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. নাজমুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কারও কথায় নয়, করোনা সংক্রমণের কারণে ক্যাম্পাস থেকে মেডিকেল টিম গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলনরত অনেকের করোনা উপসর্গ রয়েছে, কিন্তু তারা করোনা পরীক্ষায় রাজি হননি। ওখানে কাজ করে মেডিকেল টিমের একজন চিকিৎসকও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে শাবিপ্রবির প্রক্টর আলমগীর কবির বলেন, শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল টিমের পক্ষ থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী হলের ডাইনিংগুলো আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীরা নিজেরা রান্নার আয়োজন করে এবং ক্যাম্পাসের টং দোকানগুলো থেকে খাবার সংগ্রহ করছিলেন। গতকাল এসব টং দোকান বন্ধ করে দিয়েছে শাবিপ্রবি প্রশাসন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দোকানি জানিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে, আন্দোলন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আর দোকান খোলা যাবে না। তবে শাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার ইশফাকুল হোসেন জানান, খাবারের দোকান বন্ধে প্রশাসনের কোনো নির্দেশনার কথা তার জানা নেই।

আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্যোগ : আন্দোলনের শুরুতেই সরকার দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণ ও সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্দেশনায় কাজ শুরু করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। তিনি সিলেট আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতাকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেন। উপাচার্যের সঙ্গেও কথা বলেন। তার মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী দুই দফা ভিডিওকলে কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের অনশন ভেঙে ঢাকায় গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানান। কিন্তু আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রীকে সিলেটে আসার অনুরোধ জানান। এরপর আলোচনার আর অগ্রগতি হয়নি। সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারাও সুর অনেকটা পাল্টে ফেলেন। উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বিবৃতি দিয়ে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘এই আন্দোলন অন্য কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আন্দোলনকারী জানিয়েছেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ দলীয় একজন সাবেক ও একজন বর্তমান কাউন্সিলর তাদের আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার চাপ দিয়েছেন। আন্দোলনের পরিণতি ভালো হবে না বলেও শাসিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের চাপ দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন আবার শুরু হোক, আমরা সেটা চাই।’

শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য কাজ করা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানের মতো। তারা অনশন, আন্দোলন করে কষ্ট করুক, সেটা আমরা মেনে নিতে পারছি না। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি সমাধানের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি দফায় দফায় কথা বলেছেন, অনশন ভাঙতে বলেছেন। যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’ নাদেল বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের কোনো চাপ নয়, তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দরজা খোলা রয়েছে।’

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনে অর্থ সহায়তার অভিযোগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সাবেক ৫ শিক্ষার্থীকে ঢাকায় আটক করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল সন্ধ্যায় এসএমপি কমিশনার নিশারুল আরিফ এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ঢাকায় আটক ৫ জনকে সিলেটে আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এই ৫ জন হলেন টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার দারিপাকা গ্রামের মতিয়ার রহমান খানের ছেলে হাবিবুর রহমান খান (২৬), বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার লক্ষ্মীকোলা গ্রামের মুইন উদ্দিনের ছেলে রেজা নুর মুইন (৩১), খুলনার ছাত্তার বিশ্বাস রোডের সোনাডাঙ্গার মিজানুর রহমানের ছেলে এএফএম নাজমুল সাকিব (৩২), ঢাকার মিরপুরের মাজার রোডের জব্বার হাউজিং বি-ব্লকের ১৭/৩ বাসার এ কে এম মোশাররফের ছেলে এ কে এম মারুফ হোসেন (২৭) ও কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার নিয়ামতপুর গ্রামের সাদিকুল ইসলামের ছেলে ফয়সাল আহমেদ (২৭)। এর মধ্যে হাবিবুর শাবির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ থেকে ২০১২ সালে পাস করেছেন। একই বছর আর্কিটেকচার বিভাগ থেকে পাস করেছেন রেজা নূর মঈন দীপ ও নাজমুল সাকিব দ্বীপ।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন শুরু হয় ১৩ জানুয়ারি। বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে অসদাচারণের অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করে কয়েকশ ছাত্রী। তাদের অভিযোগ ছিল হলে নি¤œমানের খাবারসহ বিভিন্ন সমস্যা থাকলেও প্রাধ্যক্ষ এসব নিরসন না করে উল্টো ছাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এই দাবিতে ওই হলের ছাত্রীদের আন্দোলনে পরে যুক্ত হন অন্য শিক্ষার্থীরাও। গত ১৫ জানুয়ারি আন্দোলনকারীদের ওপর শাবি ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতাকর্মী হামলা করে বলে অভিযোগ ওঠে। ১৬ জানুয়ারি বিকেলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে উপাচার্যকে মুক্ত করে পুলিশ। এতে শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এরপর পুলিশ অজ্ঞাতনামা ৩০০ জনকে আসামি করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় শাবিপ্রবি কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তার পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন। ১৭ জানুয়ারি থেকেই নিজ বাসভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। ১৯ জানুয়ারি বেলা আড়াইটা থেকে উপাচার্যের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরণ অনশনে বসেন ২৪ শিক্ষার্থী। গত ২৩ জানুয়ারি অনশনে যুক্ত হন আরও ৪ শিক্ষার্থী। উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে চলমান আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ায় শাবি প্রশাসন, উপাচার্যের অনুসারী শিক্ষক-কর্মকর্তা ও পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগ শুরু করে। গত সোমবার রাতে পুলিশ তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের টাকা লেনদেনের কয়েকটি মোবাইল একাউন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট) চিহ্নিত করে তা বন্ধ করে দেয়। টাকা যোগান ও  আন্দোলনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে ঢাকায় আটক করা হয় শাবিপ্রবির কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীকে। এছাড়া আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা কয়েকজনকে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্যও পুলিশ চাপ শুরু করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের অনুরোধে পুলিশ সেখানে দায়িত্ব পালন করছে। আন্দোলনকারীদের চাপ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

এদিকে গতকাল রাত ৯টায় উপাচার্যের বাসভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন অনশনরত তিন শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আবেদীন, জাহেদুল ইসলাম ও সাবরিনা মমতা। তারা বলেন, উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চার বছর তালেবানি কালচারে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক পাঁচ শিক্ষার্থীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান তারা।

অনশন ভাঙাতে শাবিপ্রবিতে জাফর ইকবাল : শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙাতে শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল গতকাল রাত ৩টার দিকে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে পৌঁছান বলে জানিয়েছেন আন্দোলনের মুখপাত্র মীর রানা। তিনি বলেন, ‘স্যারের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তিনি ক্যাম্পাসে এসে নিজের অবস্থান ঘোষণা করবেন।’

ড. জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত সহকারী জয়নাল গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘ঢাকা থেকে স্যার রওনা দিয়েছেন। স্ত্রী ইয়াসমিন হকও সঙ্গে আছেন। তারা ছাত্রদের অনশন ভাঙানোর চেষ্টা করবেন।’

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং ইয়াসমিন হক দুজনই শাবিপ্রবির সাবেক অধ্যাপক।

ঢাবিতে ছাত্রদলের প্রতীকী অনশন : ঢাবি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ ও শিক্ষার্থীদের নামে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতীকী অনশন করেছে ছাত্রদল। গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে সংগঠনে তিন শতাধিক নেতাকর্মী এ কর্মসূচি শুরু করেন। বেলা ৩টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলার কথা থাকলেও পুলিশের বাধায় দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন ছাত্রদল সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মওদূত হাওলাদার বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি স্বাস্থ্যবিধির কারণে আমরা তাদের কর্মসূচি শেষ করতে অনুরোধ করি। তারা সেটি মেনে কর্মসূচি সমাপ্ত করে চলে গেছেন।’

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলা ছাত্রদল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে প্রতীকী অনশন করেছে। গতকাল সকাল ৯টা থেকে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে এ কর্মসূচি পালিত হয়। অনশনে রাজবাড়ী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম রোমান, সদস্য সচিব শাহিনুর রহমান শাহীন প্রমুখ বক্তব্য দেন।