লতার শ্রেষ্ঠে, প্রবাদে, কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার সংগ্রাম|343651|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১৬:৩৮
লতার শ্রেষ্ঠে, প্রবাদে, কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার সংগ্রাম
নাজমুল হাসান

লতার শ্রেষ্ঠে, প্রবাদে, কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার সংগ্রাম

দ্বিখণ্ডিত হয়ে সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেছে ভারত। নওশাদের সুরে ‘আনমল ঘাড়ি’ (১৯৪৬) চলচ্চিত্রে ‘আওয়াজ দে কাঁহা হে’, ‘জওয়া হ্যায় মহব্বত’ কিংবা ‘মেরে বাচপান কে সাথ মুঝে ভুল না জানা’র তুল্য সাড়া জাগানো গানের শিল্পী, রূপসী অভিনেত্রী নূর জেহান চলে গেলেন পাকিস্তানে। উমা দেবী মারা গেছেন। আমরবাঈ কর্ণাটকী, জোহরাবাঈ আমবালা, দেভিকা রানী, কানন দেবীর তুল্য থিয়েটারি ঢঙের গায়িকারা তখন অস্তাচলের পথিক। মুব্বাইয়ের চলচ্চিত্রের গানে চলছে এক নতুন যুগের আবাহন। আসছেন রাজকুমারী, সুরাইয়া, শামশাদ বেগম, গীতা দত্তের তুল্য প্রতিভামণ্ডিত, সুকণ্ঠী শিল্পীরা। লতা মঙ্গেশকরের আবির্ভাবও একালেই। শুধু আবির্ভাব বললে খানিকটা কম বলা হয়, সেই সঙ্গে আরম্ভ একটা লম্বা যাত্রার: আরো সম্মান জানিয়ে ব্যক্ত করলে সংগ্রামের। সেই সংগ্রামের একদিকে যেমন রয়েছে আরব সাগরের চলচ্চিত্র পাড়ায় নিজেকে একজন সুদক্ষ শিল্পীরূপে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়: তেমনি অন্যপ্রান্তে চিকিৎসার অভাবে অকালপ্রয়াত পিতার ভগ্ন সংসারে মা, ভাই-বোনদের মুখে অন্ন জোগানোর অনিবার্য তাড়না।

প্রায়ই মুম্বাইয়ের স্টুডিওপাড়া থেকে হেঁটে স্টেশনে ফিরতে হতো উনিশ-কুড়ির তরুণী লতা মঙ্গেশকরকে। এ পয়সাটুকু বাঁচিয়ে বাজার থেকে কিনতেন সবজি: এমন শিল্পীর শ্রেষ্ঠে, প্রবাদে, কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া এক সংগ্রামই বটে। পিতা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের উস্তাদ ও অভিনেতা, থিয়েটারের গ্রুপও ছিল তার। স্ত্রী সুধামতি ও প্রথমা কন্যা লতার তুল্য আরো চার প্রতিভাময় সন্তান মীনা, আশা, ঊষা ও হূদয়নাথকে নিয়ে তার সংসার। বাড়িতে গান শিখতে আসতেন অনেক সংগীতনবিশ। দীননাথ একদিন অবাক হয়ে দেখলেন তার এক ছাত্রের সুরের অসংগতি সুধরিয়ে দিচ্ছেন পাঁচ বছরের কন্যা লতা। প্রতিভার প্রথম স্ফূরণটা প্রকাশ পেয়েছিল তখনই। তবে মুম্বাইয়ের গানের জগতে প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘপথ। লতা মঙ্গেশকরের প্রিয় শিল্পী ছিলেন কুন্দল লাল সায়গাল। রেডিওতে তার কণ্ঠগীত শুনতে বড্ড ভালোবাসতেন তিনি: স্বপ্ন দেখতেন বড় শিল্পী হয়ে সায়গাল সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে ডুয়েট গাইবেন একদিন। তবে বিয়োগাত্মক ঘটনা এই যে নিজের পয়সায় কেনা প্রথম রেডিওটি চালু করেই সায়গাল সাহেবের মৃত্যু সংবাদ শ্রবণের সাক্ষী হতে হয়েছিল তাকে। শোকাপ্লুত লতা রেডিওটি দোকানে ফেরত দিয়ে এসেছিলেন তাৎক্ষণিক।

প্রাথমিক পর্যায়ে এক সুরকার তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তার কণ্ঠস্বরকে ‘পাতলা’ ও ‘প্লেব্যাকের অনুপযুক্ত’ অভিহিত করে। তবে অবশ্যই লতা মঙ্গেশকর দমে যাননি এমন প্রত্যাখ্যানে। বরং নিজেকে আরো একাগ্রভাবে নিবেদন করেছিলেন সংগীত সাধনায়। ‘মহল’ (১৯৪৯) সিনেমায় ক্ষেমচাঁদ প্রকাশের সুরে মধুবালার জন্য গাওয়া ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি তার জীবনে প্রথম সাফল্য নিয়ে এসেছিল, যে গানটি রেকর্ডে তাকে প্রায় ২০ বার কণ্ঠ দিতে হয়েছিল। তারপর সে বছরই মুক্তি পেয়েছিল রাজ কাপুর-নার্গিস জুটির বিখ্যাত সিনেমা ‘বারসাত’। এখানে লতা মঙ্গেশকর শঙ্কর-জয়কিষানের সুরে গেয়েছিলেন ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’ কিংবা ‘জিয়া বেকরার হ্যায়’ এর তুল্য তুমুল জনপ্রিয় গানগুলো। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সাত দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে লতা মঙ্গেশকর গান গেয়েছেন প্রায় ৩৬টি ভাষায়, পেয়েছেন শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পীর তকমা। এ দীর্ঘ অভিযাত্রায়, তার সংগীতজীবনের দুটি প্রান্ত অব্যাহত রয়েছে: সংগীতের প্রতি পরম নিষ্ঠা এবং সুললিত, তুলনারহিত কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠস্বরের জন্য অনেকেই তাকে অভিহিত করেছেন কণ্ঠানুশীলনের পৌরাণিক প্রতিমারূপে। লতা মঙ্গেশকরের সংগীতজীবনের কেন্দ্ররূপে রয়েছে মূলত মুম্বাইয়ের সিনেমাপাড়া- বলিউড। তার উত্থান ও প্রতিষ্ঠা; দুটোই চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠদান করে। যে পরিমণ্ডলে সাত দশকজুড়ে তিনি এক দাপুটে শিল্পী। দীর্ঘ শিল্পী জীবনে কাজ করেছেন ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ, অনিল বিশ্বাস, নওশাদ, মদন মোহন, শচীন দেবর্মণ থেকে শুরু করে আল্লারাখা রহমানের তুল্য সুরকারদের সঙ্গে। যেমন রাজ কাপুরের সিনেমায় তার নায়িকাদের জন্য কণ্ঠ দিয়েছেন অনিবার্য শিল্পীরূপে, তেমনি কণ্ঠ দিয়েছেন তার নাতনি কারিশমা কাপুরের জন্যও। এ সুদীর্ঘ অভিযাত্রা থেকে তার সংগীত প্রতিভার কালিক ব্যাপ্তির সমান্তরালে এক অনিবার্যতাও আমরা আবিষ্কার করতে পারি। এ অনিবার্যতাই তাকে ৭০ বছর ধরে নিজ আসন থেকে টলাতে সক্ষম হয়নি।

যুগের পর যুগ অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু লতা মঙ্গেশকর প্রতিষ্ঠিত রয়ে গেছেন তার নিজের অতুল্যতায়। আর নিজেকে এ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে তার ব্যক্তিজীবনের ত্যাগকেও স্বীকার করতে হয় গুরুত্বসহযোগে। সংগীতের সাধনা অব্যাহত রাখতে গিয়েই সমাজের আর পাঁচজন সাধারণ নারীর তুল্য স্বামী, সংসার, সন্তানের স্বপ্নে নিজেকে বিলিয়ে দেননি তিনি। বরং সব নারীসুলভ ছাপোষপনা, জাগতিক অভিপ্রায় পরিত্যাগ করে সংগীত সাধনাকেই জীবনের অনিবার্য ও একমাত্র সত্যরূপে স্বীকার করে নিয়েছেন। ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থার যে প্রাচীন, পিতৃতান্ত্রিক পরিকাঠামো, তার অবিবাহিত ও একক জীবনযাপনকে সেক্ষেত্রে এক ভিন্নতর সংগ্রামরূপেই বিবেচনা করা চলে। জীবনে কী পেয়েছেন তিনি কিংবা কিই রয়ে গেছে তার অধরা? এমনতর নানা প্রশ্নের সম্মুখীন লতা মঙ্গেশকরকে হতে হয়েছে বহুবার। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বারবারই তিনি দিয়েছেন এক ও অভিন্ন উত্তর- ‘না পাওয়ার কোনো যন্ত্রণা বা আক্ষেপ আমার নেই।’ তবু একটা গোপন দুঃখ বহুযুগ ধরে প্রতিপালন করে চলেছেন হৃদয়ে: যে পিতার জন্য তার এত বড় শিল্পীরূপে প্রতিষ্ঠা, সেই পিতা দীননাথ মঙ্গেশকর তার সাফল্য, অর্জন, প্রতিষ্ঠা প্রত্যক্ষ করে যেতে পারেননি। সম্ভবত এই দুঃখ স্বল্পাংশে হলেও লাঘব করার অভিপ্রায়েই লতা মঙ্গেশকর তার সারা জীবনের উপার্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন চিকিৎসার অভাবে অকালপ্রয়াত পিতার নামে হাসপাতাল। যেখানে দুস্থ, সহায়হীন, পীড়িত মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে পরম আন্তরিকতায়, বিনে পয়সায়।

প্রবাদপ্রতিম শিল্পী লতা মঙ্গেশকর পরলোক গমন করলেন। তাকে মূল্যায়নের কোনো সাধ্য, পাণ্ডিত্য বা গুণপনা আমাদের স্বভাবতই অনুপস্থিত। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: পিএইচ.ডি গবেষক ও প্রাবন্ধিক