গণমাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ|347480|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
গণমাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ
মীর মাসরুর জামান

গণমাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ

ভাষা শুধু মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, ভাষা মানুষের পরিচয়। ভাষা অস্তিত্ব প্রকাশ করার উপায়। কবি আহসান হাবীব ভাষার কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন

‘আশৈশব অস্তিত্বের প্রহরী আমার। ...

কথারা যখন/ জননীর কণ্ঠ থেকে মালা হ’য়ে ঝরে/ ঝরে ফুল/ কথার বকুল/ আমাকে জড়ায়/ তখন কেবল/ জানি আমি কথারাই জননী এবং জন্মভূমি।’

ব্যক্তিগত-সামাজিক পরিসরের বাইরে মানুষ গণমাধ্যমের সাহায্যে তার ভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেয়; নিজেও ভাষার বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। এভাবে ভাষার রূপ পরিবর্তনের ঘটনাটিও ঘটে। আবার আঞ্চলিকতার গন্ডি থেকে মুক্ত করে ভাষাকে অনেকটা সর্বজনীন করে তুলতে এর প্রমিত রূপ নির্মাণ এবং প্রসারে কাজ করে গণমাধ্যম। কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমরা দেখেছি, মুদ্রণমাধ্যমে লিখিত আর সম্প্রচার মাধ্যমে ভাষার বাচিক রূপের চর্চা হয়। কিন্তু এই যুগে ইন্টারনেটের কল্যাণে ডিজিটাল পরিসরে আমরা মাল্টিমিডিয়া আধেয়র অবিশ^াস্য দ্রুত বিস্তার দেখছি। এখানে লিখিত আর বাচিক ভাষা মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। আর অনলাইনে ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষ এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন অধিকার চর্চার সুযোগ পেয়েছে। মূলধারার সংবাদপত্র কিংবা রেডিও-টেলিভিশনে যে রকম সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেলায় তা নেই বললেই চলে। যদিও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালানো অনলাইন সংবাদপত্র কিংবা রেডিও-টেলিভিশনে এক ধরনের শৃঙ্খলা মেনে চলার চেষ্টা থাকে।

গণমাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহারের বিষয়টি এবার একটু পেছন ফিরে দেখে নিই। ভাষার প্রসার ও বিকাশে গণমাধ্যম যে বড় ভূমিকা রাখে, তা সবার জানা। যেমন আগেই বলা হয়েছে, ভাষার প্রমিত রূপের মূল বাহনটিই তো গণমাধ্যম। এই লেখায়, গণমাধ্যমে ভাষার ব্যবহার বিষয়ে ইদানীং যে সমস্যাগুলোর কথা বেশি আলোচনায় আসে, মূলত সেই দিকটিতেই আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশে সংবাদপত্র প্রকাশের ইতিহাস অল্পদিনের নয়। এর মধ্যে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মতো করে ভাষারীতি প্রণয়নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য একটি ভাষারীতি তৈরি হয়নি। বাংলা একাডেমি ব্যাকরণ অভিধান, বানান অভিধান এবং উচ্চারণ অভিধান প্রণয়ন ও প্রকাশ করলেও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব সমানভাবে অনুসরণ করছে না। একেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একেক ধরনের বানান ও ভাষারীতি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। ফলে গণমাধ্যম থেকে মানুষ যখন ভাষা শেখে তখন এসব ভিন্নতার কারণে বানান, বাক্যগঠন এবং উচ্চারণের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বিভ্রান্তিতে পড়ে। এতে মানুষের লিখিত ও বাচিক ভাষা ব্যবহারে এক ধরনের জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি হয়।

গণমাধ্যমে বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ নিয়ে বেশ কিছু লেখালেখি হলেও এসবের ভিত্তিতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো সামগ্রিক অর্থে খুব গোছানো অবস্থান নিতে পারছে বলে কার্যত দেখা যায় না। বাংলা একাডেমি কবি-সাংবাদিক অরুণাভ সরকারের লেখা সংবাদপত্রে ভাষার অপপ্রয়োগ নিয়ে বই প্রকাশ করেছে। এ রকম আরও কিছু নিবন্ধ এবং বই-পত্র আমরা দেখি কিন্তু এগুলোর প্রভাব বা প্রয়োগের তেমন দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। ফলে ভাষা-বানান-বাক্যগঠনের প্রচুর দূষণ আমরা গণমাধ্যমে দেখি। এজন্য ঢালাওভাবে নিয়ন্ত্রণহীন অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করা হলেও মূলধারার মুদ্রণ কিংবা সম্প্রচার মাধ্যমও দূষণ থেকে মুক্ত নয়।

আবার সব ধরনের পাঠক-দর্শক-শ্রোতার কথা বিবেচনা করে দৈনিক সংবাদপত্র ও রেডিও-টেলিভিশনের সংবাদের ভাষা সহজ, সরাসরি এবং সুস্পষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও অনেকের মধ্যে কঠিন, জটিল এবং রূপকাশ্রয়ী ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে সাধারণ পাঠক অনেক সময় মূল বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। অনেকে পরিভাষা ব্যবহার করেন। কোনো লেখকের বুঝতে না পারার কারণে হোক কিংবা সম্পাদনার ঘাটতির কারণেই হোক, এ বিষয়গুলো ঘটে চলে।

অনেক সময় প্রতিবেদনে পরিভাষা ব্যবহার করেন সাংবাদিকরা। কোনো রকম ব্যাখ্যা ছাড়া ব্যবহার করা পরিভাষার অর্থও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন না। পরিসংখ্যানের অতি ব্যবহার ভাষার পাঠযোগ্যতায় বিঘœ ঘটায়। রেডিও-টেলিভিশনে এই বিষয়গুলোর সঙ্গে উচ্চারণ বিভ্রাট যুক্ত হয়। ফলে তথ্য বুঝতে দর্শক-শ্রোতার সমস্যা হয়। অনেক সময় অর্থ বিকৃত হয় এবং পরিবেশনা আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে।

এফএম রেডিওসহ নাটক, বিজ্ঞাপন এবং সিনেমায় উচ্চারণের বিকৃতি ‘ভাষা নৈরাজ্যে’র পর্যায়ে চলে গেছে। এফএম রেডিওর উপস্থাপকরা বাংলা ইংরেজি এমনকি হিন্দি-উর্দুর মিশ্রণ এবং বিকৃত উচ্চারণে কথা বলে যান। ‘হ্যালো লিসেনার্স’, ‘হ্যালো ভিউয়ার্স’ সম্বোধনের জোয়ারের পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলোর অনুষ্ঠানের ইংরেজি কিংবা বাংলা-ইংরেজি মেশানো নামেরও ছড়াছড়ি চলছে। এর ফলে আগামী প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষা কোন রূপ নিয়ে বেঁচে থাকবে তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দেয়। কিশোর-তরুণরা এরই মাঝে এমন দূষিত ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। আড্ডার কথা-বার্তা শুনলে আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মাধ্যমের আধেয় দেখলে সহজেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ দেশে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭-সহ সরকারি অনেক বিধিনিষেধ আছে। হাইকোর্ট সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আদেশ দিয়েছে ২০১৪ সালে। রেডিও ও টেলিভিশনে ‘বিকৃত উচ্চারণ’ এবং ‘ভাষা ব্যঙ্গ’ অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। ২০১২ সালে ভাষাদূষণ ও বিকৃতি রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি আরও কিছু সুপারিশের পাশাপাশি ভাষাদূষণ রোধে আইন তৈরি করে বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দেশি বেতার ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করে। সুপারিশে বলা হয় বেতার ও টেলিভিশনে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত এবং ভাষায় বিদেশি শব্দের অকারণ মিশ্রণ দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার বিকার ও দূষণ রোধে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতেও বলা হয়। বলা হয়, কমিটির কাজের আওতায় থাকবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, অগ্রগতি পরিবীক্ষণ ও এ বিষয়ে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, বিদেশি ভাষার সুরে বাংলা উচ্চারণ রোধের বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশের আলোকে সমুদয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মুদ্রণ ও অনলাইন মাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রমিত ভাষা ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ভাষাদূষণ রোধে তথ্য মন্ত্রণালয় একই ধরনের কমিটি গঠন করতে পারে বলেও সুপারিশ করা হয়। গণমাধ্যমে মিশ্র এবং ইংরেজি ভাষার ব্যবহার বন্ধে উচ্চ আদালত নির্দেশনা দেওয়ার পর গণমাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে কমিটিও গঠন করে তথ্য মন্ত্রণালয়। এত সব কিছুর পরেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ভাষার শুদ্ধচর্চার বিষয়টি শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের আলোচনা আর লেখালেখির মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকছে।

যে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রাণ দিয়ে বাঙালি রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষার অবমূল্যায়নে শেষ পর্যন্ত তাদের চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতি-সচেতন মানুষ তা প্রতিরোধ করতে সব সময় সোচ্চার ছিল। এখন স্বাধীন বাংলাদেশে গণমাধ্যমে ভাষা দূষণের মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তা প্রতিরোধ করতেও তেমনই সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

গণমাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান পদক্ষেপ নিতে পারে। কারও উদাসীনতা-উন্নাসিকতায় প্রিয় বাংলা ভাষা যদি বড় কোনো বিপর্যয়ে পড়েই যায়, তাহলে তো জাতির সাংস্কৃতিক মেরুদ- এমনকি গৌরবময় আত্মপরিচয়ই বিপণœ হবে। কবি শামসুর রাহমান যেমন লিখেছিলেন

‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?

উনিশ শো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি

বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।

সে ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে

কতো নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।

এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি,

এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!

তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো

বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।’

লেখক : সাংবাদিক ও আবৃত্তিশিল্পী