বিদ্যায়তনে প্রমিত উচ্চারণ|348055|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ মার্চ, ২০২২ ০০:০০
বিদ্যায়তনে প্রমিত উচ্চারণ
সৌমিত্র শেখর

বিদ্যায়তনে প্রমিত উচ্চারণ

তখনো নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটছি। ক্যাম্পাস-ফুটপাতে বয়োজ্যেষ্ঠ এক পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা। তিনি হাতে কয়েকটি ধোয়া কাপড় নিয়ে চলছেন। তার উদ্দেশ্য লন্ড্রি। নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার রাস্তার ধারেই একটি গুচ্ছদোকানঘর আছে। সেখানে নৈমিত্তিক শুকনো খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে অনেক কিছুই পাওয়া যায়; কাপড় ইস্ত্রি পর্যন্ত হয়ে থাকে। তার সঙ্গে ফুটপাতে কথা হতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোথায় কাপড় ইস্ত্রি করাই। আমি বললাম। পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম: ‘কত করে করান’। তিনি বললেন : ‘গড়ে দুই’ এবং আরও কিছু। আমি তার সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপের পর বুঝলাম, প্রথমে আমি তার কথার অর্থ যা বুঝেছিলাম সেটা ঠিক নয়। আমি বুঝেছিলাম, তিনি বুঝি এতগুলো কাপড় ‘গড়ে দুটাকা’ করে ইস্ত্রি করান। আসলে তিনি আমাকে বলেছেন, তারা কাপড় ‘ঘরে ধোন’ আর এখানে শুধু ইস্ত্রি করান এবং তাতে দাম পড়ে তিন বা চার টাকা (এখন মনে নেই কত)। একথা পরে কয়েকজনকে বলেছি: কীভাবে সেদিন আমি ‘বোকা’ বনে গিয়েছিলাম!

যিনি ‘ঘরে ধুই’কে ‘গরে দুই’ উচ্চারণ করেছেন তিনি নিজে ব্যাপারটি সেদিন বুঝতে পারেননি; এ ধরনের উচ্চারণ সম্পর্কে তিনি আজও বুঝতে পারেন কি না জানি না। কিন্তু তিনি একটি বড় পদে আছেন, তাকে প্রতিনিয়তই কথা বলতে হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গেই কথা বলতে হয়। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের উচ্চারণ অন্যের কাছে বিড়ম্বনার অথবা হাসির খোরাক হতে পারে। আমি প্রসঙ্গক্রমে আমাদের সংসদ সদস্যদের উচ্চারণ নিয়ে কোনো কথা বলছি না। কারণ তারা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেন। অঞ্চলের মানুষরা ভোট দিয়ে যাদের নির্বাচিত করবেন, তারাই সংসদে বসবেন। তবে সম্মানিত সদস্যরা প্রমিত উচ্চারণে কথা বললে ‘ভালো’ হয় এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবি জানাই, সচেতন বলে গর্ব করি, অগ্রসর বলে সম্মান চাই, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী বলে অন্যের সমীহ প্রত্যাশা করি তাদের বাংলা উচ্চারণ ‘সাধারণ’ মানের হলে এ সম্মান বা সমীহ কিছুই মেলে না। আর উচ্চারণে আঞ্চলিকতা থাকলে তো অন্যের হাসির পাত্র হতে হয়। তাই দায়িত্ব আমাদের বেশি। শুধু সার্টিফিকেটধারী হলেই কি একজন ‘শিক্ষিত’ মানুষ হওয়া যায়? না। শিক্ষা হলো নিজেকে পরিমার্জিত করা, শিক্ষা হলো সর্বোচ্চ সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করা। একজন শিক্ষিত মানুষই পারেন ঠিক জায়গায় ঠিকভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে। একে ইংরেজিতে বলে adaptability, বাংলায় ‘খাপ খাইয়ে নেওয়া’। শিক্ষিত মানুষ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিদ্যা অর্জন করেন। কথা বলার ক্ষেত্রেও তাই। আমরা মা-বাবার সঙ্গে বা শিক্ষকের সঙ্গে যে ভাষারীতিতে কথা বলি বন্ধুদের সঙ্গে সে রীতি বা ভঙ্গিতে বলি না। অঞ্চল বা এলাকাতে যেভাবে কথা বলি সে কারণেই ঢাকা বা শহরে সেভাবে কথা বলি না। দেশের বাইরে গেলে তো বাংলাই বলি না। অর্থাৎ স্থান-কাল-পাত্রভেদে শিক্ষিত মানুষের ভাষাব্যবহার রীতি পরিবর্তিত হচ্ছে। এটা মানতে হবে এবং সেভাবেই প্রস্তুত করতে হবে নিজেকে। কেউ যদি তার এলাকা বা অঞ্চলে গিয়ে প্রমিত উচ্চারণে কথা বলতে থাকে সেটা বেশ বেমানান লাগবে; আবার যারা ঢাকায় এসে এলাকা বা তার অঞ্চলের ভাষারীতি ত্যাগ করতে পারে না সেটাও মানানসই লাগে না। তার মানে, প্রকৃত শিক্ষিত লোক নিজের আঞ্চলিক ভাষাটিও জানেন ও একে সম্মান করেন আবার প্রমিত ভাষারূপটিও জানেন ও একে সর্বদা মর্যাদা দেন।

বলা হয়, প্রতি দশ বর্গকিলোমিটার পর পর ভাষারূপের ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। তাহলে এটাই তো স্বাভাবিক যে, চট্টগ্রাম আর রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা কিংবা বরিশাল আর সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ভিন্ন হবে। বাংলাদেশের ভিন্ন চার অঞ্চলের মানুষ তার অঞ্চলে অবশ্যই আঞ্চলিক ভাষারীতিতে কথা বলবেন কিন্তু তারা যখন একত্রে বসবেন, যখন কোনো অফিসে একসঙ্গে কাজ করবেন, যখন কোনো অনুষ্ঠানে পাশাপাশি বক্তৃতা দেবেন তখনো কি আঞ্চলিক ভাষারীতি প্রয়োগ করবেন? করবেন, যদি তিনি যথেষ্ট পরিমাণে ‘শিক্ষিত’ ও ‘রুচিশীল’ না হন। যদি শিক্ষিত ও রুচিশীল হন তাহলে তিনি প্রয়োগ করবেন প্রমিত ভাষারীতি। তাহলে এটাই ঠিক যে, মানুষের ভাষা শুনে বা ভাষারীতি ব্যবহার দেখে বোঝা যায়, লোকটি যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষিত ও রুচিশীল কি না! এটা বাংলাভাষীদের ক্ষেত্রে যেমন সত্য অন্যভাষীদের ক্ষেত্রেও। ধরা যাক, ইংরেজি ভাষা এরও আঞ্চলিক রূপ আছে, আছে প্রমিত রূপ।

এই যে ‘প্রমিত’ কথাটির এত ব্যবহার এটা আবার কী? ‘প্রমিত’ কথা বলে ভয় দেখিয়ে দেওয়া নয়তো? না, তা নয়। প্রমিত হলো প্রকৃষ্টভাবে মিত বা পরিশীলিত বা সংযত। ভাষার যে রূপ প্রকৃষ্টভাবে মিত বা পরিশীলিত বা সংযত তা-ই প্রমিত। প্রমিত রূপ তাই সব ভাষাতেই থাকে। বাংলাতেও আছে। ঐ যে আমার পরিচিতজন বলছিলেন: ‘গরে দুই’ এটা আঞ্চলিক উচ্চারণ। তার আঞ্চলিক উচ্চারণের কারণে ‘ঘ’ >‘গ’ আর ‘ধ’ >‘দ’ হয়ে গেছে অর্থাৎ ধ্বনি দুটো মহাপ্রাণত্ব হারিয়েছে। বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিতে অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ বলে দুটো ধারণা আছে। আমাদের সব আঞ্চলিক ভাষায় ধ্বনির অল্পপ্রাণত্ব ও মহাপ্রাণত্ব ঠিকঠাক মান্য করা হয় না। এটা প্রমিত উচ্চারণে বড় বাধা। তাই অনেকের উচ্চারণে ‘বুথ’ হয়ে যায় ‘ভূত’। আমাদের দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ‘ক’ >‘খ’ আবার ‘খ’ >‘ক’ উচ্চারণ করার প্রবণতাও আছে। যেমন: ‘কমলা খাব’ নয়, তারা উচ্চারণ করে ‘খমলা কাব’। এটা শুধু ‘ক’ আর ‘খ’ উচ্চারণের মধ্যে নয়, অল্পপ্রাণকে মহাপ্রাণ আর মহাপ্রাণকে অল্পপ্রাণ করে উচ্চারণ করার প্রবণতা আছে ঐ অঞ্চলের প্রায় সব ধ্বনিতে। তাই ‘চাবি’কে ‘ছাবি’, ‘ছাই’কে ‘চাই’ করার প্রবণতা দেখা যায় সেখানে। শুধু অল্পপ্রাণ আর মহাপ্রাণ নয় ঘোষত্ব মোচন হয়ে অঘোষ হয়ে যায় কোনো কোনো আঞ্চলিক উচ্চারণে; উল্টোটিও হয়। যেমন: ‘টাকা’ উচ্চারণ হয়ে যায় ‘টাহা’। এখানে ‘ক’ হয়ে গেল ‘হ’। ‘ক’ আর ‘হ’ দুটোই উচ্চারণের দিক থেকে কণ্ঠ্য ধ্বনি। কিন্তু ‘ক’ যেখানে অঘোষ; ‘হ’ সেখানে ঘোষ ধ্বনি। একটু অসচেতন হলেই ‘টাকা’ উচ্চারণ ‘টাহা’ হয়ে যেতে পারে। তাহলে একথা বলা যায়, প্রমিত উচ্চারণ না হওয়ার পেছনে মানুষের অসচেতনতা একটি কারণ। ভাষা ব্যবহার বা উচ্চারণের সময় সচেতন থাকলে উচ্চারণত্রুটি থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। উচ্চারণের দ্রুততাও কিন্তু ভুল উচ্চারণের কারণ হতে পারে। প্রতিটি শব্দের মধ্যে প্রয়োজনীয় সময়-দূরত্ব না রেখে উচ্চারণ করলে হঠাৎ কোনো শব্দ বেফাঁস উচ্চারিত হতে পারে। তাই দ্রুত উচ্চারণ বা অতিদ্রুত উচ্চারণ প্রমিত উচ্চারণে বিঘœ ঘটায়। আর অনেকে ‘সহজ’ করে উচ্চারণের নামে ভুল উচ্চারণ করে থাকে। যেমন: ‘পাহাড়’ ‘পাহারা’ দেওয়া ‘আমার’ দায়িত্ব নয়। এখানে ‘ড়’ এবং ‘র’-এর উচ্চারণ একটু কষ্ট করে হলেও আলাদা না রাখলে চলে না। কেউ যদি সেটা আলাদা না করে তবে অর্থবিভ্রাটও ঘটতে পারে। এই অর্থবিভ্রাট মারাত্মক!

কলাভবন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির দিকে যেতেই দেখি আমড়াওয়ালাকে ঘিরে আছে আমার কিছু ছাত্রছাত্রী। তারা আমাকে আদাব-সালাম দিতেই আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম: ‘তোমরা এখানে কী করছ?’ ওরা উত্তর দিল: ‘আমরা আমরা খাই।’ আমি তো অবাক! বললাম: ‘ঠিক আছে, তোমরা তোমরা খাও আমি যাই!’ বোঝা গেল: ‘ড়’ থেকে ‘র’ হলে কী বিপদ!!

লেখক : উপাচার্য, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ