ওপারে ভালো থাকবেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী|348155|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ মার্চ, ২০২২ ২২:৩৮
ওপারে ভালো থাকবেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী
রফিকুল বাহার

ওপারে ভালো থাকবেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী

১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী। জন্মের ৭১ বছর পর  কোমরের ব্যথার চিকিৎসা নিতে ডিসেম্বরের ১২ তারিখে তিনি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের সামিতা বেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসায় সেরে যাবেন এমন আশা নিয়ে বিদেশ যাত্রা করেছিলেন।

১২ ডিসেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারি অর্থাৎ ২২ দিনের ব্যবধানে এ অসাধারণ মানুষটি লাইফ সাপোর্টে চলে যান। আর কথা বলতে পারেননি তিনি কারো সঙ্গে। প্রিয়তমা স্ত্রী, ছেলে কারো সঙ্গে না। ২৮ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব চেষ্টা-সাধনার পরও তার ব্লাড প্রেশার কমতে থাকে। শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিস্তেজ হতে থাকে। মৃত্যু ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ-বিদেশে শোক সংবাদ প্রচার পেতে থাকে।

নাছির উদ্দিনের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুরে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে। বিএ পাশে করেই পারিবারিক ব্যবসা চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে বলাকা সু স্টোরে যোগ দেন। ব্যবসার শুরুতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন রিটেইলিংয়ের (খুচরা) সঙ্গে। এরপর খাতুনগঞ্জের পুরোনো কাপড় আমদানির ব্যবসা। রি-রোলিং মিল প্রতিষ্ঠা, পুরোনো জাহাজ আমদানির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। এর কোনোটাতে তিনি মানিয়ে নিতে পারেননি। কিংবা থাকতে চাননি। পরে ইউসিবিএলের উদ্যোক্তা পরিচালক নুর মোহাম্মদ ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহর সঙ্গে মিলে পাথরঘাটায় এনজেডএন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসার মোড় ঘুরতে থাকে তখনই।

১৯৯৩ সালে দেশে প্রথম ও বৃহত্তম সরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন শুরু করেন। পেছনে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন প্রতিদিন তার গড়া প্রতিষ্ঠান দশ কোটি টাকার জিনস উৎপাদন করে। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় জিনস উৎপাদনকারী একক প্রতিষ্ঠান হলো এই প্যাসিফিক জিনস। প্রতিদিন সারা পৃথিবীর জিন্স পছন্দকারীদের জন্য তৈরি করেন দেড় লাখ পিস।

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের শেক্‌সপিয়ার সরণিতে জারা, এইচএনএম, ইউনিপোলো, মাক্স অ্যান্ড স্পেনসারের স্টোরে ঢুকেছিলাম। জামা-কাপড় পছন্দ করে বিল পরিশোধের জন্য ক্যাশ কাউন্টারের লাইনে আমি। কৌতুহলবশত কাপড়গুলোর ট্যাগ পড়ছিলাম। দেখি মেড ইন বাংলাদেশ। আনন্দে আত্মহারা আমি। কাপড় আর কিনিনি। রেখে এলাম তাকের ওপর। মনে মনে ভাবলাম দেশে গিয়ে সংগ্রহ করব। বিদেশি পাউন্ড খরচ করার দরকার কী। এর প্রায় সাত বছর পর আবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিশাল মলের ছোট ছোট আউটলেটে ঢুকি পোশাক কেনার জন্য। পছন্দ করছিলাম আর দেখছিলাম। তাও দেখি মেড ইন বাংলাদেশ। এর দুই বছর পর আমেরিকার নিউইয়র্কে স্টোরে গিয়েও একই অবস্থা দেখলাম। দেশে ফিরে একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর সঙ্গে জানতে চাইলাম, ইউরোপ-আমেরিকায় আমাদের পণ্যের মার্কেট কারা কীভাবে তৈরি করল? জবাব যা পাওয়া গেল, তার অর্থ এ রকম-এ খাতে বাংলাদেশের লিজেন্ড কয়েকজন। তবে স্পেশালি জিনসের বাজারটা এককভাবে বড় হয়েছে চট্টগ্রামের প্যাসিফিক জিনের নাছির সাহেবের হাত ধরে।

নাছির ভাইয়ের সঙ্গে অনেক আগে থেকে যোগাযোগ। দেখা হতো, কথা হতো। সহাস্য জবাব মিলতো অনেক কিছুর। কিন্তু যেদিন ওনার ইপিজেডের কারখানায় দেখতে গেলাম, দীর্ঘসময় ধরে এ খাত নিয়ে তিনি কথা বলতে লাগলেন। তার কথায় কিছুতেই মনোযোগের চিড় ধরে না। তার কথায় জানলাম, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া আর জেনারেটরের সংযোগে পাওয়া পর্যন্ত মাঝখানের ন্যানো সেকেন্ডের যে বিরতি সেটিও মোকাবিলার প্রযুক্তি আছে। এতে পণ্যের মান-গুণ দুটোই ঠিক থাকে। তিনি জানালেন, আমাদের দেশের দক্ষ প্রশিক্ষক ও প্রকৌশলী থেকে শুরু করে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার বিশাল একটি জায়গা দখল করে আছে ভারত ও শ্রীলঙ্কানরা। বেতন থেকেই তারা এ খাত নিয়ে যায় কোটি কোটি ডলার। দক্ষ মানব সম্পদ ব্যবস্থায় আমাদের আরো কাজ করতে হবে, কর্ম পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। পৃথিবীতে কোন দেশের মানুষ কতটা জিনস প্যান্ট পরে , কোন বয়সীদের মানুষের জিনস প্যান্টের প্রতি আগ্রহ, আমাদের দেশে জিনস পরার প্রবণতা কত শতাংশ বাড়ছে, পৃথিবীর কোন জায়গায় কোন ফ্যাক্টরি কী মানের জিনস উৎপাদন করে এর সবকিছুই তার মুখস্থ।

নাছির উদ্দিনের ফ্যাক্টরিতে ঢুকে লিফট থেকে ওপর তলা পর্যন্ত আসা-যাওয়ার সময় মালিক-কর্মচারীদের চোখাচোখি হয় কেবল। মালিককে দেখে দাঁড়িয়ে থেকে সালাম দেওয়া বা লিফটে জায়গা ছেড়ে দেওয়া, এসবের কোনো বালাই নেই। কে মালিক, কে শ্রমিক, কে কর্মচারী বোঝার কোনো উপায় নেই। অথচ অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানেই এর বিপরীত চিত্র দেখেছি। নাছির ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি আমাদের প্রতিষ্ঠানের কালচার। কর্ম-উপযোগী আধুনিক ব্যবস্থাপনা’।

সীতাকুণ্ড উপজেলার গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় পড়ানোর ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা চালু করেছেন তিনি। প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা সব ধরনের আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের টাকায় বিভিন্ন শিক্ষার্থীরা পড়ছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট-চুয়েটসহ নামকরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পুরো সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে একটি ফরম দেওয়া থাকে। ওই ফরমে জনপ্রতিনিধিরা সত্যায়িত করে দিলে গরিব-অসহায়-অসচ্ছল ব্যক্তিদের চিকিৎসা খরচ হাসপাতালে গিয়ে পরিশোধ করে আসেন নাছির উদ্দিনের প্যাসিফিক ফাউন্ডেশন। মসজিদ এতিমখানা, বালিকা বিদ্যালয় গড়েছেন অসংখ্য। কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাঠদান কার্যক্রমের অনুমতিও পেয়েছেন সরকার থেকে। শিক্ষকও নিয়োগ দিয়েছেন কলেজটির। কিন্তু সেটি চালু করে যেতে পারেননি তিনি।

দেশে যে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী রয়েছেন যাদের বৈধ (সাদা টাকা) কয়েক হাজার কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে, তাদের মধ্যে নাছির উদ্দিন একজন। অথচ চলনে-বলনে জীবন-যাপনে তিনি ছিলেন অতি সাধারণ। রিয়েল স্মার্ট।

একবার বলেছিলেন, বিদেশে গেলে ফাইভ স্টার-সিক্স স্টার হোটেল থাকার সাধ্য তার ছিল। কিন্তু তিনি থাকতেন না। সাদামাটা সুন্দর থ্রি স্টার, ফোর স্টার হোটেল তিনি থাকতেন। এ শিক্ষা তার পরিবারকেও দিয়েছেন। চট্টগ্রাম শহরে অসংখ্য দামি দামি সুন্দর গাড়ির মালিকানার তালিকায় নাছির উদ্দিনের নাম নেই। টাকা কামিয়েছেন দুহাতে। আর্ত মানবতার সেবায় বিলিয়েছেন দুহাতে নীরবে।

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সার্বক্ষণিক চেকআপের চিন্তা মাথায় নেননি তিনি। মনে করেছেন ভালো আছেন, সুস্থ থাকবেন আরো শিল্প বাড়াবেন। বাংলাদেশের মানুষের এখন গড় আয়ু ৭২ বছর। দেশ সমাজ অর্থনীতির জন্য অসাধারণ কাজ করে তিনি বাঁচলেন ৭১ বছর। জীবনের শেষ ২২টি দিন ছিল তার অমানুষিক কষ্টের, যন্ত্রণারও। আর শেষের ৫৪ দিন জীবন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন সেই যন্ত্রণা কেমন ছিল, কতটা ছিল আমরা কেউ জানি না। ওপারে ভালো থাকবেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী।

বর্তমান প্রজন্মের কারখানা মালিকদের কাছে আপনি দার্শনিকের মতো। আপনি সফল ব্যবসায়ী, ভালো মানবিক গুণাবলির পথিকৃৎ, কর্মক্ষেত্রে উচ্চ কল্পনা শক্তির আদর্শ–কোন বিশেষণটি আপনার জন্য উপযুক্ত ও প্রযোজ্য? দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়া সোজাসাপ্টা জবাব আমার, সব বিশেষণেই বিশেষায়িত করা যাবে আপনাকে।

বাংলাদেশের গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা, রাজনীতিবিদ ও সরকার রাষ্ট্রপ্রধান সবাই সব সময় থাকেন প্রচারের আলোয়। এত অর্জনের পরও আপনি ছিলেন নীরব নিভৃতে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সফল নায়কের একজন আপনি। জীবদ্দশায় আপনাকে নিয়ে যদি লিখতে পারতাম বা লেখার সংস্কৃতি এ দেশে চালু থাকত, তাহলে আপনি পড়ে প্রীত ও খুশি হতেন। ভালো লাগত–জীবনের অন্য অর্থ খুঁজে পেতেন।

রফিকুল বাহার: সাংবাদিক