জার্মানিতে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ|348836|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ মার্চ, ২০২২ ০০:০০
জার্মানিতে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ
হান্স হার্ডার

জার্মানিতে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ

এই ছবিটি ১৯২১ সালে জার্মানির ডার্মস্টাট (Darmstadt) শহরে তোলা। রবীন্দ্রনাথের পাশে হারমান কাইজারলিং (Hermann Keyserling) এবং তার স্ত্রী মারিয়া-লুইজে গোঠাইন। রবীন্দ্রনাথ তখন এক সপ্তাহ ধরে ডার্মস্টাটে এসে কাইজারলিংয়ের আয়োজনে উচ্ছ্বাসভরা একদল জার্মান শ্রোতার সামনে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করেন আর নানা বক্তৃতা দেন।

জার্মানিতে বাংলা চর্চা নিয়ে কথা বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের এই ছবি কেন প্রাসঙ্গিক? এই জন্য যে, সাধারণ জার্মান ভাষাভাষীদের বাংলার সঙ্গে সংস্পর্শ এক শতাব্দীর একটু বেশি আগে ঘটে রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই। ১৯১৩ সালে যখন রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তখন বিশ্বব্যাপী একটা আলোড়ন এবং অনুবাদ-তরঙ্গ, অনুবাদ-সুনামিও বলা যেতে পারে সৃষ্টি হয় যেটা জার্মানিকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ১৯১৪ সালে মারি-লুইজে গোঠাইন (Marie-Luise Gothein)-এর অনুবাদে গীতাঞ্জলি কবিতা সংকলনের জার্মান সংস্করণ বেরিয়ে সেই সুনামির সূত্রপাত ঘটল। তারপর এক-এক করে রবিঠাকুরের আরও রচনা জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হতে থাকে : কবিতা, গীতিনাট্য, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। সাত বছরের মধ্যে ১৪টি বই।

এই রাবীন্দ্রিক ঢেউতে ভেসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেই আরও কয়েকজন বাংলা লেখকের গল্প বেরোয় রাইনহার্ড ভাগনার Reinhard Wagner)-এর অনুবাদে : (Bengalische Erzähler) ‘বাঙালি গল্পকার’ (১৯২৭) হলো বইটির নাম। প্রচ্ছদে শীর্ষকের সঙ্গে লেখা আছে ‘aus dem Indischen übertragen’, অর্থাৎ ‘ভারতীয় ভাষা থেকে অনূদিত’। এটা অনুবাদক রাইনহার্ড ভাগনারের বাংলা ভাষাজ্ঞানের প্রতি প্রশ্নচিহ্ন অতটা মনে হয় না যতটা পাঠক-পাঠিকাদের বাংলা সম্পর্কে ধারণাহীনতার প্রতি একটা ইঙ্গিত। বাংলা বুঝি তখন সাধারণ জার্মানদের চেতনায় ভারতবর্ষের বহু ভাষাগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া আলাদাভাবে পরিচিত ছিল না।

পরবর্তী সময়কার বাংলা সাহিত্যের জার্মান অনুবাদগুলো অনেকটা খণ্ডচিত্রের মতো। বিশ শতকের সত্তর দশকে পাচ্ছি বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ওরফে বনফুলের একটি গল্পসংগ্রহ Ferien am Ganges)) ১৯৭৫ সালে এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লাল সালু’ (Baum ohne Wurzeln) ১৯৭৮ সালে প্রথমটি ইংরেজি আর দ্বিতীয়টি ফরাসি থেকে অনূদিত। এরপর ১৯৮৫ সালে আসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ মূল বাংলা থেকে সরল সেনের অনুবাদে। ওই সময় যদি জার্মানদের চোখে বাংলার অস্তিত্ব কিছুটা জোরালো আর স্পষ্ট হয়ে আসে, সেটা একদিকে অবশ্যই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আর স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের একটা ফল। অন্যদিকে ওটা জার্মান একাডেমীয় মহলের তিনটি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত : ষাট দশকের শেষে নাকি পূর্ব জার্মানির হালে ((Halle) বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইনৎস মোডে (Heinz Mode) সেখানে বাংলা চর্চার সূচনা করেন, সত্তর দশকে পশ্চিম জার্মানিতে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে (Heidelberg University) কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বাংলা পড়াতে শুরু করেন এবং নব্বই দশকে হালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাহুল পিতার দাশের অধ্যাপনা আরম্ভ হয়।

সে সময় অবধি আলাদা করে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণার অভাবের মানে কিন্তু এটা নয় যে, বাংলার চিন্তাজগৎ পুরোপুরি অচেনা রয়ে গিয়েছিল। বাংলার বেশ কয়েকজন চিন্তানায়কের পায়ের ছাপ, বিশেষ করে আধুনিক হিন্দুধর্মের সংস্কার-আন্দোলনবিষয়ক কাজ সম্পর্কে জার্মানরা জানতে পারে। উল্লেখ্য সেসব হলো, হেলমুট ফন গ্লাজেনাপ (Helmut von Glasenapp), পাউল হাকার (Paul Hacker), হান্স-ইয়োয়াখিম ক্লিমকাইট (Hans-Joachim Klimkeit) আর হাইনরিশ ফন স্টিটেনক্রোন ((Heinrich von Stietencron)-এর তাত্ত্বিক আর ঐতিহাসিক জার্মান গবেষণাগ্রন্থ, যেগুলোতে রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ইত্যাদি ধর্মচিন্তকের বিপুল আলোচনা পাই।

সে যাই হোক, আলাদাভাবে বাংলার ওপর মনে হয় প্রথম হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইনৎস মোডেই জোর দিয়েছিলেন। মোডে শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাজ করেননি, বরং ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ ও বাংলা রূপকথাও জার্মান ভাষায় অনুবাদ আর তৎসম্পর্কে বিস্তর আলোচনা করেছেন।

এদিকে পশ্চিম জার্মানিতে হাইডেলবার্গের দক্ষিণ এশিয়া সংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (১৯৩৩-২০২০) বাংলা-জার্মান ভাষাগুলোর মাঝখানে একটা দুপেশে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করেন। গ্যোয়েটে Goethe) থেকে শুরু করে গুন্টার গ্রাস (Günther Grass) পর্যন্ত অনেক জার্মান সাহিত্যিকের রচনার বাংলা সংস্করণ তৈরি করেন এবং উল্টোদিকে নিজে বা তার ছাত্রদের হাত দিয়ে অনেক বাংলা লেখা জার্মানে অনুবাদ করেন। তার মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান ইত্যাদি কবির কবিতা এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো লেখকের উপন্যাস। ১৯৯২ সালে অলোকরঞ্জন তার গ্যোয়েটে আর রবীন্দ্রনাথের তুলনামূলক অধ্যয়নের মতো সাহিত্যতাত্ত্বিক লেখার পাশাপাশি ‘Leben in Liedern’ অর্থাৎ ‘গান নিয়ে বাঁচা’ নামে বাউল গানেরও একটা জার্মান সংকলন প্রকাশ করেন।

১৯৯৪ সাল থেকে রাহুল পিতার দাশ হালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক ভাষাগুলোর ওপর জোর দেন বিশেষত বাংলার ওপর। রাহুল পিতার দাশ নিজেই বাউল দর্শন, গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ইত্যাদি অনেক রকম বিষয়ে গবেষণা করেন আর তার ছাত্রদের বাংলা-চর্চায় উদ্দীপ্ত করেন। হালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ‘ঘরানা’ থেকে বেরিয়ে আসা কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবার্ট জিগফ্রিড (Robert Siegfried)-এর ঠাকুরগাঁওয়ের নক্সবন্দি মুজাদ্দিদী সুফিদের নিয়ে একটা সন্দর্ভ, কার্মেন ব্রান্ট (Carmen Brandt)-এর বাংলাদেশি বেদেদের নিয়ে একটা গবেষণাগ্রন্থ এবং বর্তমান লেখক হান্স হার্ডার (Hans Harder)-এর চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারী সম্প্রদায়ের বিষয়ে একটা বই। এই ২০২২ সালে সারা জার্মানিতে দুটি জায়গায় রীতিমতো বাংলা পড়ানো হয় : হাইডেলবার্গ (Heidelberg) আর বন (Bonn) বিশ্ববিদ্যালয়ে। হালের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত কারণ রাহুল পিতার দাশ সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্র্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক কারণে অনেক ছোট বিভাগ বন্ধ করে দিতে চাইছে যেগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশীয় অধ্যয়ন (South Asian Studies) একটি। একাডেমীয় মহলে বনে কার্মেন ব্রান্ট আর হাইডেলবার্গে আমি হান্স হার্ডার এবং চৈতি বসু বাংলা চর্চা বহাল রাখার প্রয়াস পাচ্ছি। হাইডেলবার্গের বাংলা চর্চায় বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য মাক্স ষ্টিলে (Max Stille)-এর কাজ। তিনি পিএইচডি করার পর ‘নেটজ বাংলাদেশ’ (NETZ Bangladesch) বলে একটা এনজিও পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিলের স্বরূপ আর সামাজিক ভূমিকা নিয়ে তার সম্প্রতি বই আকারে প্রকাশিত পিএইচডি সন্দর্ভ অসাধারণ এক উপলব্ধি।

জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক পরিমণ্ডলের বাইরে বাংলা নিয়ে কাজ হয়নি তা কিন্তু নয়। তার সবচেয়ে গুরুত্ববাহী উদাহরণ হলেন মার্টিন কেম্পশেন (Martin Kämpchen। তিনি বহু বছর থেকে শান্তিনিকেতনের পাশে একটি গ্রামে বাস করে বিভিন্নভাবে বাংলার সাহিত্য আর সংস্কৃতি জার্মান পাঠকের সামনে নিয়ে আসছেন। ২০০৫ সালে মার্টিন কেইম্পশেন রবীন্দ্রনাথের একটা রচনাসম্ভার সম্পাদনা করেন যেটিতে তিনি নিজে রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা আর গান নতুন করে অনুবাদ করেছেন। ওই বইটিতে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, রাহুল পিতার দাস, আক্সেল মন্টে (Axel Monte) এবং বর্তমান লেখকেরও রবীন্দ্রনাথের লেখার নতুন অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেম্পশেনের হাতে ২০০৮ সালে ‘‘এবংঢ়ৎব্ধপযব সরঃ ংবরহবহ ঝপযহৃষবৎহ” শিরোনামে রামকৃষ্ণ পরমহংসের কথোপকথনগুলোরও একটি জার্মান সংস্করণ প্রকাশ পায়।

জার্মানিতে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের বাইরেও ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতিতত্ত্ব ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে গবেষণাপত্র আর লেখালিখি হয়। এত ছোট একটি লেখার মধ্যে সেদিকে নজর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু অন্তত আরেকটি জার্মান বাংলা-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ না করে থাকতে পারছি না। জার্মানিবাসী ড. আবু গোলাম জাকারিয়া প্রমুখ প্রবাসী একদল বাংলাদেশি আর জার্মান নাগরিক অনেক বছর থেকে নানাভাবে বাংলার বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে জার্মান জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গত পঁচিশ বছর ধরে ড. জাকারিয়ার উদ্যোগে পরপর চারটি সম্পাদিত বই প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমটিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিত্ব, জীবন আর সাহিত্য সৃষ্টির ওপর আলোকপাত করা হয়। তারপর একই আদলে বেগম রোকেয়া আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিষয়ে জার্মান ভাষায় দুটি প্রবন্ধ সংকলন বেরিয়েছে। আর সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ড. জাকারিয়ার সম্পাদিত একটি বই প্রকাশ পায়।

এই যে জার্মান বাংলা-চর্চার একটা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা, এতে আশা করি দেখা যাচ্ছে যে, জার্মান জনসাধারণের চোখে বাংলা আগের মতো অচেনা আর নয়। কিন্তু প্রচুর কাজ বাকি আছে। বাংলা ভাষা ভাষাভাষীদের সংখ্যা অনুযায়ী দুনিয়ার ষষ্ঠ ভাষা আর বিশ্বায়নের ফলে সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে দূরত্ব অনেক রকমভাবে কমে গেছে। আশা করা যাক যে, দুদিকেই গবেষণা, অনুবাদের কাজ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বৃদ্ধি হোক। পরস্পরকে চিনতে হলে এসব কাজ খুবই দরকার।

লেখক : হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের আধুনিক ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত।