সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাহাবুদ্দীন আহমদ|351036|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০২২ ১৩:০৩
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাহাবুদ্দীন আহমদ
অনলাইন ডেস্ক

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাহাবুদ্দীন আহমদ

সাহাবুদ্দীন আহমদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ – ১৯ মার্চ ২০২২)

একটি দেশে গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তার উল্লেখযোগ্য সূচক হলো— সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনতা? এ সংবাদমাধ্যমকেই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সংবাদপত্র সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করে থাকে। কিন্তু নানা আইন ও বিধির বেড়াজালে বাংলাদেশে সে স্বাধীনতা বারবার হোঁচট খেয়েছে।

এ সব আইনের সঙ্গে মৌলিক অধিকারের ধারণা সাংঘর্ষিক বলে বিশেষজ্ঞদের মতামতে ওঠে এসেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারগুলোর বর্ণনা করা হয়েছে। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের (খ) ধারায় যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্ট-১৯৭৩ এর মতো ধারা নিয়ে ছিল আপত্তি। যেখানে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলের ক্ষমতা ছিল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের।

১৯৯১ সালে সেই ক্ষমতা রহিত করে যুগান্তকারী এক উদ্যোগ নেন সদ্য প্রয়াত তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ।

এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পর কেন্দ্রীয়ভাবে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ ও পত্রিকা বন্ধের ভয় দেখিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোকে কোণঠাসা করে রাখে। অবশ্য বিজ্ঞাপন এখন আর কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। অন্যদিক নির্বাহী আদেশে পত্রিকা বন্ধের আইনও বাতিল হয় পরবর্তীতে।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন হলে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক হাওয়া লাগে। সংবাদপত্রও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সাংবাদিকদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বিচারপতি মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেন।

তখন বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধ্যাদেশ ১৬ ও ১৭ ধারায় যেকোনো সময় সরকার গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার রাখত। পরে কমিটির সুপারিশে সেই ক্ষমতা রহিত হয়। আবার সাংবাদিকদের খবরের সূত্র প্রকাশে চাপ দেওয়ার যে আইন ছিল, তাও বাতিল হয়। ১৯৭৪ সালের স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টে সংবাদপত্রের বিষয়ে যে দুটি কালো বিধি ছিল, তা বাতিল হয়। এ ছাড়া সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য অনুমতির জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার রীতিও কিছুটা শিথিল হয়। আইন করা হয় ডেপুটি কমিশনার যদি কাউকে ৬০ দিনের মধ্যে পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি না দেন, তাহলে সেটি প্রেস কাউন্সিলে আসবে এবং কাউন্সিল যা সিদ্ধান্ত দেবে, সেটিই মেনে নিতে হবে। এর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আপিল চলবে না।

পরবর্তীতে নানান আইন সংবাদমাধ্যমের ওপর খড়্গ হয়েছে। সর্বশেষ ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ছাড়াও যে সব আইন ও বিধি সাংবাদিকদের ওপর নিয়ন্ত্রক হিসেবে আছে— আদালত অবমাননা আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, কপিরাইট আইন, প্রেসকাউন্সিল অ্যাক্ট, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, পোস্ট অফিস অ্যাক্ট, শিশু আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, তথ্য অধিকার আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ভোক্তা অধিকার আইন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা আইন এবং বাংলাদেশের সংবিধান। এসব আইনের মধ্যে বেশ কিছু আইন আছে ঔপনিবেশিক আমলের। যেমন আদালত অবমাননা আইন ১৯২৬ সালের আর অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩ সালের।

এত কঠিন পরিস্থিতির মাঝে সাহাবুদ্দীন আহমদের উদ্যোগ সব সময়ই কৃতিত্ব পেয়ে এসেছে। অবশ্য কর্মক্ষেত্রে তার জীবনের ব্রতই ছিল। তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের নজির রেখে এসেছে।

বিচারপতি হিসেবে তার দেওয়া বহু রায় ঢাকা ল’ রিপোর্টস্, বাংলাদেশ লিগ্যাল ডেসিশন্স এবং বাংলাদেশ কেইস রিপোর্টসে প্রকাশিত হয়। চাকরি সংক্রান্ত বিষয়, নির্বাচনী বিরোধ এবং শ্রমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক বিষয়ে তার প্রদত্ত কিছু রায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৮ম সংশোধনীর ওপর তার রায় দেশের শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক অনন্য ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত। এখানে তিনি অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে নিজস্ব ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করা, গোষ্ঠী শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক মানবাধিকার খর্ব করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরোধিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অস্বীকৃতি এবং আইনের শাসনের পরিবর্তে আদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধান রহিত করার প্রবণতার জন্য তৃতীয় বিশ্বের একনায়ক শাসকদের সমালোচনা করেছেন। বিচার বিভাগে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও ছুটির ক্ষেত্রে হাইকোর্টের চিরাচরিত ক্ষমতা খর্ব  করা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক নিম্ন আদালতসমূহ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অবলম্বনে