কর্মচারী পুষছেন কর্মকর্তারা|357407|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০
কর্মচারী পুষছেন কর্মকর্তারা
আশরাফুল হক

কর্মচারী পুষছেন কর্মকর্তারা

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নরসিংদীর উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কার্যালয়ের গাড়ি চালান বেলাল। তার বেতন ১৮ হাজার টাকা। একই কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নাইম ও রোকনের বেতন ৮ হাজার টাকা করে। নির্ধারিত বেতন থাকলেও তারা তা সরকারি কোষাগার থেকে পান না। তাদের বেতন হয় শীর্ষ কর্মকর্তা বা ডিআইজির ব্যক্তিগত টাকায়।

এ চিত্র শুধু নরসিংদী নয়, আরও ১০ কার্যালয়ের। ওইসব কার্যালয়ের ডিআইজিরা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশের জন্য এ ধরনের গাড়িচালক ও অফিস সহায়ক পোষেন।

নরসিংদীর বেলালের মতো নারায়ণগঞ্জে ওমর ফারুক, সিলেটে জনি, কিশোরগঞ্জে কাজল, চট্টগ্রামে জিসান, কুষ্টিয়ায় আরিফ, দিনাজপুরে রুবেল নিজস্ব গাড়িচালক হিসেবে কাজ করছেন। একই কায়দায় চালক রাখা হয়েছে রাজশাহী, বগুড়া, বরিশাল ও যশোর কার্যালয়েও।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ে কার্যালয়ের সংখ্যা ২৩টি। এর মধ্যে ১১ জেলায় নিজস্ব টাকা দিয়ে চালক রাখা হয়। অন্য ১১ জেলায় চালক আছেন রাজস্ব খাতে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, রংপুর, খুলনা, পাবনা, ময়মনসিংহ ও মৌলভীবাজার। সিরাজগঞ্জ জেলায় চালক নেই।

জেলা পর্যায়ের ডিআইজির কার্যালয়ের কয়েকজন চালক প্রত্যাহার করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ চালকরা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি চালালেও তাদের বেতন-ভাতা হয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় থেকে। মন্ত্রণালয়ের এসব গাড়ির জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও জোগায় অধিদপ্তর। 

নরসিংদী কার্যালয়ের গাড়ি আছে, অথচ চালক নেই। বাইরের চালক নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। এ গাড়ির জন্য প্রতি মাসে ২০০ লিটার করে ডিজেল বরাদ্দ রয়েছে।

নরসিংদী কার্যালয়ের চালক বেলাল ২০১৬ সাল থেকে ওই কার্যালয়ের গাড়ি চালাচ্ছেন। ওই সময়ে তাকে মাসে ১২ হাজার টাকা দেওয়া হতো। বর্তমান ডিআইজি আতিকুর রহমান তার বেতন ১৮ হাজার টাকায় উন্নীত করেন। গত ছয় বছর ধরে বেলাল অপেক্ষা করছে তার নিয়োগের জন্য। নিয়োগ না হওয়ায় ঈদের সময় উৎসব ভাতা পান না, বছর বছর ইনক্রিমেন্ট হয়ে বেতন বাড়ে না। সামাজিক মর্যাদাও নেই। তারপরও বেলাল পড়ে আছেন যদি কোনোভাবে নিয়োগটা পাওয়া যায়, সেই ভরসায়।

নিজের টাকায় গাড়িচালক এবং অফিস সহায়ক রাখার কারণ জানতে চাইলে নরসিংদীর ডিআইজি আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে হলে নরসিংদী জেলা কার্যালয়ে আসুন। এভাবে টেলিফোনে কথা বলা যাবে না।’

আতিকুর রহমান নমনীয়ভাবে বললেও চট্টগ্রামের ডিআইজি আবদুল্লাহ আল-সাকিব মুবাররাত সব দায় তুলে দিয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বা হেড অফিসের ওপর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা হচ্ছে হেড অফিসের ব্যাপার। বিষয়টি হেড অফিস জানে। কথা বলতে হলে তাদের সাথে বলেন।’

দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি তার কাছে জানতে চান, ‘বিষয়টি হেড অফিসের হলেও গাড়িটি ব্যবহার করে চট্টগ্রাম কার্যালয়। কাজেই ডিআইজি হিসেবে বিষয়টির ব্যাখ্যা আপনি নিজেই দিতে পারেন।’

জবাবে আবদুল্লাহ আল-সাকিব মুবাররাত বলেন, ‘কী হচ্ছে না হচ্ছে সব কিছু মেইনটেন করে হেড অফিস। অর্ডার হলেই কেবল আমরা জানতে পারি। তার আগে নয়।’

আপনার গাড়িচালক জিসান কতদিন ধরে আপনার সঙ্গে আছেন জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই।’

গাড়িটি টিওঅ্যান্ডই (টেবিল অন অর্গানোগ্রাম অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট) ভুক্ত কিনা জানতে চাইলে সাকিব মুবাররাত বলেন, ‘এগুলো আমি কিচ্ছু জানি না।’

এই পর্যায়ে দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি বলেন, আপনি একটা দপ্তরের প্রধান, অথচ বলছেন আপনি কিছু জানেন না। এটা কী করে হয়? জবাবে সাকিব বলেন, ‘এগুলো আমার জানা নেই। হেড অফিসের বিষয়।’

আপনার গাড়িচালক বেতন কোথা থেকে পাচ্ছেন, সেটা কী আপনি জানেন না? চালকের বেতনতো আপনি দিচ্ছেন। জবাবে ডিআইজি বলেন, ‘এসব ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

জেলা পর্যায়ের প্রত্যেকটি কার্যালয়ে একটি করে গাড়ি থাকার কথা। সেগুলোর চালকও থাকার কথা। এসব গাড়ি জেলার কলকারখানা ও স্থাপনা পরিদর্শন করার কাজে ব্যবহার হওয়ার কথা। কিন্তু এগুলো কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিদর্শনের অভাবেই বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে, শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। পরিদর্শকরা কারখানা পরিদর্শনে যান নিজেদের মোটরসাইকেলে। যাদের মোটরসাইকেল নেই, তারা যান গণপরিবহনে।

প্রতিটি জেলায় দুজন পরিদর্শকের সমন্বয়ে একটি পরিদর্শন দল গঠন করা হয়। ছোট জেলায় ছয়টি করে এবং বড় জেলায় ১৫ থেকে ২৫টি করে পরিদর্শন দল থাকে। প্রতিমাসে যৌথভাবে একটি দল ১৫টি কারখানা পরিদর্শন করেন। আলাদাভাবে প্রত্যেক পরিদর্শক ১৫টি করে দোকান বা প্রতিষ্ঠানও পরিদর্শন করেন। কালকারখানা পরিদর্শনের সময় শ্রমিকরা সময়মতো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন কি না এবং দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ বা শ্রম অসন্তোষের কারণ খতিয়ে দেখেন পরিদর্শকরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কোনো কোনো ডিআইজি কার্যালয়ে চালক ছাড়াও একাধিক অফিস সহায়ক রয়েছেন। একজন ডিআইজি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা বেতন পান। আর তিনি যেসব চালক ও অফিস সহায়ক রাখেন তাদের বেতন দিতে হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ নিজে যে বেতন পান তার চেয়ে বেশি খরচ করেন চালক ও অফিস সহায়ক রাখতে। যেসব জেলায় ‘এক্সট্রা’ আয় আছে সেসব জেলার ডিআইজিরা এভাবে কর্মচারী পোষেন। বিভিন্ন কারখানা মালিকদের কাছ থেকে আয় বেশি করেন বলেই তাদের পক্ষে চালক ও অফিস সহায়ক রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

এর আগে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়ার পর ১৬২ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। নিয়োগপত্র অনুযায়ী এসব অস্থায়ী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করতেই পারে শ্রম ও কর্মস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাদের চাকরি নবায়নেরও সুযোগ ছিল। নবায়নের পথে না গিয়ে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ দেওয়ার কিছুদিন পরই আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে পুনরায় এসব পদে লোক নিয়োগ করার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।

চাকরিচ্যুত ১৬২ জনের মধ্যে ছিলেন বগুড়ার মিল্লাত হোসেন। আউটসোর্সিংয়ের চাকরির জন্য তিনি ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন। অফিস সহায়ক পদের জন্য তিনি এ টাকা দিয়েছিলেন।

গত রবিবার মিল্লাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার সময় আমাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরিচ্যুত করার সময়ও পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়েছে। যারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাল দিয়ে চলতেন বা কর্মকর্তাদের অনৈতিক কাজে সহায়তা করতেন তাদের রেখে দেওয়া হয়েছে। এ অফিস সহায়কদের লাম্পসাম (থোক বরাদ্দ) দিয়ে রাখা হয়েছে। প্রত্যেক কার্যালয়েই দুই-চারজন করে রয়ে গেছেন। এখনো তারা বিভিন্ন কার্যালয়ে কাজ করেন। তাদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন ও রাকিবসহ তিনজন টঙ্গী কার্যালয়ে কাজ করছেন।’

মিল্লাত আরও বলেন, ‘শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ইচ্ছা করলেই আমাদের বহাল রাখতে পারত। আমরা শ্রম প্রতিমন্ত্রী, সচিব, অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা সাড়া দেননি। যে দপ্তর শ্রমিকের চাকরি ফিরিয়ে দেয়, তারাই আমাদের চাকরিচ্যুত করল। এটা আমরা কোনো দিনই চিন্তা করিনি।’

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কয়েকটি জেলা কার্যালয়ে কিছু লোক কাজ করছেন। তারা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন ভাতা পাচ্ছেন না। ডিআইজিরা তাদের সুবিধার্থে নিজেদের টাকা দিয়ে এসব কর্মচারী রাখেন। এ অনিয়ম সম্পর্কে অবগত কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক নাসির উদ্দিন আহমদের কাছে। জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু অবগত নই।’