রাজউকে অনুমোদনের তথ্য নেই|357604|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০
রাজউকে অনুমোদনের তথ্য নেই
তোফাজ্জল হোসেন রুবেল

রাজউকে অনুমোদনের তথ্য নেই

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধিক্ষেত্র ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থাপনা বা ইমারত নির্মাণ করতে হলে অনুমোদন নিতে হবে এ সংস্থাটি থেকে। এছাড়া স্থাপনার নকশা অনুমোদনের আগে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রও নিতে হবে রাজউকের কাছ থেকে। এরপর জমির মালিকানা, নকশা অনুমোদনকারী কর্র্তৃপক্ষের তথ্যসহ নানা ধরনের তথ্য দিয়ে নির্মাণ সাইটে সাইনবোর্ড ঝোলাতে হবে। বিদ্যমান আইনে এ ধরনের বিধান থাকলেও রাজধানীর কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠে পুলিশের স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব মানা হচ্ছে না। বিতর্কিত এ স্থাপনার বিষয়ে রাজউকের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মহলের কাছেও অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। এছাড়া স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকেও নকশা তৈরি বা অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

তেঁতুলতলা মাঠে স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা আইন ভঙ্গ করেছে বলে অভিযোগ নগর পরিকল্পনাবিদদের। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তেঁতুলতলায় কোনো কমপ্লেক্স হচ্ছে না, এখন দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। আর দেয়াল নির্মাণ করতে কোনো অনুমোদন লাগে না। কিন্তু তেঁতুলতলা মাঠে পুলিশের লাগানো ‘কলাবাগান থানা ডিএমপি, ঢাকার নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমি’ লেখা সাইবোর্ড রয়েছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের এক মাস ধরে নিয়মিত অবস্থান করার কথা জানান এলাকাবাসী।

জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান এবিএম আমীন উল্লাহ নূরী গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেঁতুলতলা মাঠে স্ট্রাকচার নির্মাণের বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে পরে বিস্তারিত জানা যাবে।’

তবে রাজউকের মাঠপর্যায়ে নকশা অনুমোদনে জড়িত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কাছ থেকে তেঁতুলতলা মাঠে থানা কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য কোনো নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

রাজউকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কোনো আবেদন আসেনি। তবে রাজউকের বাইরে আইন অনুযায়ী স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি ইমারত নির্মাণের অনুমোদন দিতে পারেন। তিনি দিয়েছেন কি না তা বলতে পারব না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মীর মানজুরুর রহমান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা এলাকায় থানা কমপ্লেক্স নির্মাণ সম্পর্কিত কোনো আবেদন স্থাপত্য অধিদপ্তরে আসেনি। আমরা কলাবাগান থানার কমপ্লেক্স নির্মাণের কোনো নকশা অনুমোদনও করিনি।’

রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইমারত নির্মাণের জন্য সরকারের বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা রয়েছে। ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ এর ধারা ৩, ৪ ও ৫ অনুযায়ী প্রত্যাশিত সংস্থা বা ব্যক্তিকে রাজউকের আওতাধীন ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে নিতে হবে অনুমোদন। এছাড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী নকশা অনুমোদনের আবেদন করার আগেই নিতে হবে ভূমি ছাড়পত্র। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী স্থাপনা হওয়ার পর সেখানে বসবাস করতেও নিতে হবে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা বসবাস উপযোগিতার সনদ। ইমারতের নকশা অনুমোদনের জন্য প্রথমে ভূমি ছাড়পত্র নিতে হলে জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ প্রস্তাবিত জমি ব্যবহার ছাড়পত্রের জন্য নির্ধারিত ফিসহ আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীকে নির্ধারিত সাইটের জরিপ ম্যাপ সংযোজন করতে হবে, যাতে জমি চিহ্নিত করার মতো আরএস ও সিএস ম্যাপসহ একটি খসড়া নকশা থাকবে। এরপর ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র পাওয়া সাপেক্ষে নির্মাণ অনুমোদনের আবেদন করতে হবে। এ আবেদনে যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন কারিগরি ব্যক্তিবর্গ নকশায় অমুদ্রিত স্বাক্ষর প্রদান করবে এবং কারিগরি ব্যক্তিবর্গকে তাদের পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর নকশা ও দলিলাদির নির্ধারিত স্থানে উল্লেখ করতে হবে। নির্মাণ অনুমোদনপত্রের জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের অনুলিপি, ফি প্রদানের রসিদ, আবেদনকারীর বৈধ মালিকানার প্রমাণস্বরূপ দলিলাদির সত্যায়িত অনুলিপি, যোগ্যতাসম্পন্ন কারিগরি ব্যক্তি কর্র্তৃক প্রদত্ত মাটি পরীক্ষা প্রতিবেদন, প্লটের ক্ষেত্রফল, ভূমি আচ্ছাদন, সেটব্যাক স্থানের পরিমাপ, প্রকল্পে নিয়োজিত স্থপতির অভিজ্ঞতার প্রমাণস্বরূপ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে কারিগরি ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত সার্টিফিকেটের অনুলিপি ও নির্ধারিত কাগজে মেট্রিক মাপে সকল নকশা প্রণয়ন করতে হবে।

এছাড়া প্রকল্প এলাকায় সাইট প্ল্যান বা এলাকা নকশার তথ্য দিয়ে নির্ধারিত সাইনবোর্ড ঝোলাতে হবে। যেখানে থাকবে সাইট যে মৌজায় অবস্থিত, সাইটের অবস্থানসহ এর সিএস ম্যাপ, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আরএস বা এসএ ম্যাপের অংশবিশেষ অথবা সরকার বা অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃক উন্নয়নকৃত প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাইটের অবস্থানসহ প্রকল্প এলাকা নকশার অংশবিশেষ, সাইটের দাগ বা প্লট এবং পার্শ্ববর্তী দাগ বা প্লটসমূহের অবস্থান নির্দেশক। সাইটের প্রতি দিকের সীমানা ও পরিমাপ, বহির্ভাগের পরিমাপ, উচ্চতা, তলার সংখ্যা এবং রক্ষিত আবশ্যিক উন্মুক্ত স্থানের পরিমাপসহ বিস্তারিত তথ্যও থাকতে হবে। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তেঁতুলতলা মাঠে নেই কোনো নির্দেশনাসংবলিত সাইনবোর্ড। অবশ্য একটি সাইনবোর্ড সেখানে আছে যাতে ‘কলাবাগান থানা ডিএমপি, ঢাকার নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমি’ লেখা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কলাবাগানে কোনো কমপ্লেক্স নির্মাণ করছি না। সেখানে এখন দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। আর দেয়াল নির্মাণ করতে কোনো অনুমোদন লাগে না।’

তবে এ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন রাজউকের এক অথরাইজড অফিসার। তিনি সংবাদমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, ‘ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ এর সংজ্ঞায় স্পষ্ট বলা আছে, ইট-রডসহ নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করলেই তা ইমারত বলে গণ্য হবে। সেখানে দেয়াল তো নিশ্চয় এসব উপকরণ দিয়েই করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই দেয়াল নির্মাণের অনুমোদন লাগবে।’

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘এ মাঠে (তেঁতুলতলা মাঠ) তো অবকাঠামোগতভাবেই বেশি জায়গা নেই। একটি থানা করার জন্য যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন হয়, তা এখানে নেই। তেঁতুলতলা মাঠে থানার ভবন করা হলে, পুরো এলাকা অচল হয়ে যাবে। থানার জন্য যে পরিমাণ প্রিজন ভ্যান কিংবা মোটরবাইক এবং গাড়ি থাকে সেই গাড়ি রাখার মতো জায়গা এখানে নেই। এখানে ভবন করা মানে হলো সামনের রাস্তাটিও দখল করে ফেলা। এতে করে পুরো এলাকাটি অচল হয়ে যাবে।’