তপু বর্মণ এখন ডাকঘরের অমল|358361|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ মে, ২০২২ ০০:০০
তপু বর্মণ এখন ডাকঘরের অমল
সুদীপ্ত আনন্দ

তপু বর্মণ এখন ডাকঘরের অমল

তপু বর্মণ যেন ‘ডাকঘর’-এর অমল হয়ে গেছেন। কবিরাজের বারণে সারা দিন ঘরবন্দি অমল জানালার ধারে বসে কেবল সুদূরের ডাক শুনত। ডাক্তারের নির্দেশে হালকা ব্যায়াম আর সাঁতারে বন্দি-জীবন কাটানো তপু বর্মণ মাঠের ডাক শুনতে পান। বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় যখন সতীর্থরা ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে অনুশীলন করেন, তপু বর্মণ শুধু চেয়ে দেখেন। নিখুঁত ডিফেন্স করার জন্য পায়ের শিরায় রক্ত নাচে তার। কিংবা ওভারল্যাপ করে গোল দেওয়ার শিহরণ টের পান মনে মনে। ওটুকুই। বাস্তবতা হলো পায়ের অপারেশনের পর মাঠে ফেরার উপায় নেই। নিদারুণ অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার নেই। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জার্সিতে সপ্রতিভ পারফরমারের তালিকা করলে সবার ওপরে থাকবে তার নাম। লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করছেন ৯ বছর হলো। এর মধ্যেই রক্ষণের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠেছেন। পুরোদস্তুর স্টপার ব্যাক হওয়া সত্ত্বেও গোলের নেশা আছে বলেই নামের পাশে লেখা ছয়টি আন্তর্জাতিক গোল। বিস্ময়কর হলেও পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে জাতীয় দলের স্ট্রাইকারদের চেয়ে তিনি বেশি গোল করেছেন। সেই তপু বর্মণই কিনা দীর্ঘ একটা সময় রয়েছেন মাঠের বাইরে। কমলাপুর স্টেডিয়ামের ‘মৃত্যুকূপ’খ্যাত কৃত্রিম টার্ফে খেলতে গিয়েই বাঁ পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। যা তাকে ছিটকে দিয়েছে পুরো মৌসুম। বসুন্ধরা কিংসের এই নির্ভরযোগ্য ফুটবলারকে বিদেশে গিয়ে অস্ত্রোপচার করিয়ে আসতে হয়েছে। এখন চলছে তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। নিঃসঙ্গ এই লড়াইয়ের প্রহর আর যেন শেষই হচ্ছে না। অথচ ফর্মের তুঙ্গে থাকা তপুর আর তরও সইছে না। সামনের মাসে কিংস খেলবে এএফসি কাপ। জুনে জাতীয় দল খেলবে এশিয়ান কাপ বাছাই। এত এত খেলায় দর্শক হয়ে থাকাটা ঠিক মেনেই নিতে পারছেন না তপু।

সর্বনাশটা হয় ৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতা কাপে পুলিশের বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালে। কমলাপুরের প্রায় অনুপযুক্ত টার্ফে হঠাৎ লুটিয়ে পড়েন তপু। হাসপাতালে নিয়ে এমআরআই করতেই মাথায় হাত কিংস কর্তাদের। বাঁ পায়ের এসিএল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তপুর। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি কিংসের তত্ত্বাবধানে ভারতের মুম্বাইয়ে অর্থোপেডিক সার্জন দিনশো পার্দিওয়ালা তার লিগামেন্টে অস্ত্রোপচার করেন। এরপর থেকে শুরু তপুর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। এখন দিনের বেশিরভাগ সময় তার কাটে জিমে অথবা সুইমিং পুলে। চিকিৎসক বলেছেন, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে সাত থেকে আট মাস সময় লাগবে। এর মানে চলতি লিগ তো বাদই, নিকট ভবিষ্যতে ক্লাব ও জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক কোনো ম্যাচেই পাওয়া যাবে না ৪৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৬ গোল করা তপুকে। গতকাল কিংসের ডরমেটরিতে নিজ কক্ষে আক্ষেপের ডালি খুলে বসলেন তপু, ‘কিংস সামনের মাসে এএফসি কাপের তিনটি ম্যাচ খেলবে। আর জুনে জাতীয় দল এশিয়ান কাপের তিনটিসহ চারটি ম্যাচ খেলবে। এসব ম্যাচে দর্শক হয়ে থাকা কতটা কষ্টের সেটা বলে বোঝাতে পারব না। আমি আসলে ফর্মের তুঙ্গে ছিলাম। অথচ কমলাপুরের টার্ফ আমার জীবন থেকে মূল্যবান একটা মৌসুম কেড়ে নিল।’

ক্লাবে থেকেই চলছে তপুর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। সুবাদে সতীর্থদের সঙ্গেই কাটছে সময়। তবে সবার মতো খেলতে না পারার হতাশা পেয়ে বসেছে তাকে, ‘ক্লাবে থাকছি বলে সবার সঙ্গে ভালোই সময় কাটছে। চেষ্টা করছি বাইরে থেকে তাদের নানাভাবে উজ্জীবিত করতে। তবে মাঠে থেকে যেটা করি, সেটা কি বাইরে থেকে করা যায়। আজ ওরা সবাই যাচ্ছে ম্যাচ খেলতে। আর আমাকে নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে হচ্ছে জিমে। একজন পেশাদার ফুটবলার হিসেবে আমি সবসময় আন্তর্জাতিক ম্যাচ উপভোগ করি। সেটা ক্লাব হোক কিংবা জাতীয় দল। চেষ্টা করি নিজেকে উজাড় করে খেলতে। অথচ সামনে কত কত ম্যাচ আমার খেলা হবে না।’ চোটে পড়ার আগে ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক মিলিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ খেলেছেন তপু। কোনো ম্যাচেই তাকে অর্ধেকটা দিয়ে খেলতে দেখা যায়নি। তাই তার নিবেদন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। আর এত এত ম্যাচ খেলাই কাল হয়েছে এই ২৭ বছর বয়সী স্টপার ব্যাকের।

২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে জাতীয় দলের বাইরে থাকা হয়নি তপুর। গত বছর নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার চারজাতি আসরের পর জাতীয় দল খেলেছে দুটি ম্যাচ। মালদ্বীপ আর মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে। সে সব ম্যাচে দলের মøান পারফরম্যান্স ভাবিয়েছে তাকেও, ‘শ্রীলঙ্কায় শক্তিশালী মালদ্বীপকে আমরা হারিয়েছিলাম। যে দলে আলি আশফাক, আলি ফাসিরের মতো তারকারা ছিল। আর সর্বশেষ মালেতে দলকে নবীন মালদ্বীপের কাছে হারতে দেখে খুব হতাশ হয়েছি। শ্রীলঙ্কায় মালদ্বীপের বিপক্ষে আমার গোল ছিল। অথচ খারাপ লাগে এখন যারা খেলছে তাদের মধ্যে গোলের তাড়নাটাই নেই। মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে যত সুযোগ পেয়েছিলাম, তা কাজে লাগালে অন্তত একটা জয় পেতাম। এরকম ম্যাচে জয়গুলো আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।’

হতাশাকে অবশ্য খুব বেশি ভাবনায় স্থান দেন না তপু। মাঠে যেমন সবসময় ইতিবাচক থাকেন, চোটের এই কঠিন সময়টাতেও তিনি ইতিবাচক। সেটা নিজেকে নিয়ে যেমন, কিংস ও জাতীয় দল নিয়েওÑ ‘ডাক্তার সাত-আট মাসের কথা বলেছেন। আমি চাইব তার আগেই মাঠে ফিরতে। সে জন্যই পরিশ্রম করে যাচ্ছি। সামনের মৌসুমে একটা ম্যাচও মিস করতে চাই না। একই সঙ্গে আমি আমার ক্লাব আর জাতীয় দল নিয়েও আশাবাদী। দেখবেন কিংস এবার গ্রুপসেরা হবে। আর জাতীয় দলও নতুন কোচের অধীনে খেলবে ইতিবাচক ফুটবল।’

তপুর চাওয়াই যেন সত্যি হয়।