তেলের দাম বৃদ্ধিতে সরকারের গাফিলতি আছে|359199|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ মে, ২০২২ ০৮:৫২
তেলের দাম বৃদ্ধিতে সরকারের গাফিলতি আছে
এস এম নাজের হোসাইন

তেলের দাম বৃদ্ধিতে সরকারের গাফিলতি আছে

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি দেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ক্যাব চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকার আইনসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে সয়াবিনের নতুন দাম নির্ধারণের ফলে সয়াবিনের দাম বৃদ্ধির রেকর্ড হয়েছে। হঠাৎ করেই এত পরিমাণ দাম কেন বৃদ্ধি হলো বলে মনে করেন?

এস এম নাজের হোসাইন : বাংলাদেশে সয়াবিন তেল নিয়ে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে ও দাম যেভাবে লাগামহীন হয়ে পড়ছে এর পেছনে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গাফিলতি আছে বলে আমরা মনে করি। এছাড়া ব্যবসায়ী শ্রেণি সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে বলেও প্রতীয়মান হয়। তাই ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা লাভের ইচ্ছা ও সময়মতো পদক্ষেপ নিতে না পারার ফলেই এভাবে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ^বাজারে যখন দাম বৃদ্ধির পর দাম কমতে শুরু করেছে তখন এখানে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখানে এখন যে সয়াবিন বিক্রি করা হয়, তা দুই থেকে ছয়মাস আগের আমদানি করা। তাই এসব তেলের মূল্যবৃদ্ধি করার কোনো যুক্তিই ছিল না।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ববাজারে সয়াবিনের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কেমন?

এস এম নাজের হোসাইন : বিশ্ববাজারে গত এক বছর ধরেই তেলসহ নিত্যপণ্যের অনেক কিছুর দাম বাড়তির দিকেই ছিল বলে আমরা দেখেছি। এই পরিস্থিতির অবনতি হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। এই দুটি দেশ থেকে তেল সরবরাহে ঘাটতি হওয়ায় ব্যাপক চাপ পড়ে পাম ও সয়াবিন তেলের ওপর। এপ্রিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং প্রতি মেট্রিক টন তেলের দাম রেকর্ড ১৪৯৭ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। এপ্রিলের শেষ দিকে তেলের দাম ছিল ১৯১৯ ডলার। সেই হিসেবে প্রতি মেট্রিক টন ১৯১৯ ডলারে কেনা তেলের সঙ্গে জাহাজভাড়াসহ নির্ধারিত অন্য খরচ যোগ করলে বাংলাদেশে লিটারপ্রতি ১৯৮ টাকা অযৌক্তিক। নতুন দাম অনুযায়ী সয়াবিন তেলের পাঁচ লিটারের বোতলের দাম এখন ৯৮৫ টাকা। আগে এর দাম ছিল প্রায় ৭৬০ টাকা। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটারের দাম হবে এখন ১৮০ টাকা, যা এতদিন ১৪০ টাকা ছিল। নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, পরিশোধিত পাম সুপার তেল প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে ১৭২ টাকা, যা এতদিন ছিল ১৩০ টাকা।

দেশ রূপান্তর : আপনি দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বাজার ব্যবস্থাপনা কীভাবে প্রভাব রাখে বলে মনে করেন?

এস এম নাজের হোসাইন : একটি উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি। মনে করেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। বাজারে তেল পাওয়া যায় না। প্রশাসন তদারকিতে নামলে অনেক ব্যবসায়ী অস্বীকার করে বলেছিলেন, তারা তেল আমদানি করেন না। অথচ তেলের দাম যখন কমছিল, তখন দেখি সেই তারাই আমদানিকারক। এখন রসিদ থাকলে সহজেই কিন্তু তাদের চিহ্নিত করা যেত। এ থেকে ভোক্তাদের সুবিধা দিতে ভোগ্যপণ্যের বাজার তদারকির আগে রসিদ ছাড়া কোনো পক্ষই যাতে বেচাকেনা ও লেনদেন না করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ভোক্তা, খুচরা, পাইকারি ও আমদানিকারকসবার কাছেই যেন পাকা রসিদ থাকে, সেটির নিশ্চয়তা চাই আমরা। এতে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। কোন স্তরে কারসাজি হচ্ছে, সেটি মুহূর্তে চিহ্নিত করা সহজ হবে। এতে পরিস্থিতি উত্তরণও খুব সহজ হবে। পাশাপাশি বাজার তদারকি করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বাজার তদারকিতে ভোক্তা অধিকারের পরামর্শ কী?

এস এম নাজের হোসাইন : যদি এবারের কথাই বলি। এবারই ভোজ্য তেল পরিশোধন কারখানায় অভিযান চালিয়েছে সরকারের জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এর সুফল ভোজ্য তেলের বাজারে দেখা গিয়েছিল। আমরা চাই, তিন স্তরের বাজার তদারকি চলুক। এ জন্য সব ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই আগে মূল উৎস বা পণ্য আমদানিকারককে তদারকিতে আনতে হবে। এখন যেভাবে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, এমন পরিস্থিতি চাইলে এড়ানো যেত। শুল্কহার আরও আগে কমানোর উদ্যোগ নিলে ভোজ্য তেলের বাজারে এতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ত না। শুল্কহার কমানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দেরিতে। এতে বাজারে কারসাজির সুযোগ তৈরি হয়েছে। মজুদ করে বাড়তি দাম পকেটে নিয়েছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী। ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীরা বেশ প্রভাবশালী। তাদের কারখানায় অভিযান চালানো, গোয়েন্দা নজরদারি, মজুদদারি, পাইকারিতে তদারকির ফলে সুফল মিলেছে। ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি ভালো উদাহরণ।

দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশে ভোক্তাস্বার্থ কতটুকু সংরক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করেন?

এস এম নাজের হোসাইন : আমাদের দেশে ভোক্তাদের অধিকার বলে যে একটি বিষয়  আছে তা মনে হয় না। ভোক্তাদের অধিকার অধিকারের বাস্তবায়ন তেমন দৃশ্যমান নয়। অনেক বছর ধরেই যেহেতু আমি ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, তাই আমি অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বলতে পারছি। ভোক্তার অধিকার রক্ষায় দেশে একটি আইন হয়েছে। এছাড়া একটি অধিদপ্তরও আছে। ১৯৭৮ সালে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ভোক্তা-স্বার্থ রক্ষায় আমাদের আগে যারা ছিলেন, তারাও কাজ করেছেন। এখন  কিন্তু ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষিত হচ্ছে না। এর বড় কারণ, ভোক্তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। বছর দশেক আগে আমরা দেশব্যাপী একটা জরিপ করেছিলাম। তাতে দেখা গেছে, ৫ থেকে ৬ শতাংশ ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সচেতন। এখন জরিপ হলে হয়তো এ হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশে দাঁড়াবে। কারণ, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিছু কাজ করছে। সবচেয়ে ভালো কাজ করছে গণমাধ্যম। ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা যত বাড়বে, তাদের অধিকারও তত সংরক্ষিত হবে। সচেতনতা না থাকায় ভোক্তারা ভোক্তা হিসেবে উপযুক্ত সম্মানটা পান না। সেটা রক্ষার জন্যই আমাদের আন্দোলন।

দেশ রূপান্তর : তাহলে ভোক্তা-স্বার্থ রক্ষায় কী করণীয়? আপনার পরামর্শ কী?

এস এম নাজের হোসাইন : ভোক্তারা খুবই অসহায়। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তাদের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমার অধিকার আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এ বিষয়টা যখন সবার মধ্যে আসবে, তখন এমনিতেই ভোক্তার স্বার্থরক্ষা হবে। কিন্তু আমাদের ভোক্তাদের মধ্যে একধরনের সহনশীলতা তৈরি হয়ে গেছে। ভোক্তাস্বার্থ লঙ্ঘিত হলেও তারা প্রতিবাদ করেন না। আবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটির কিছু ত্রুটি রয়েছে। তার সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। ভারতে ১৯৮৫ সালে ভোক্তা অধিকার আইন হয়েছে। সময়ের দাবি অনুযায়ী সেখানে চারবার আইনটির সংশোধন হয়েছে। আমাদেরটা কেন হবে না? দেশে ভোক্তা অধিকার সংগঠন খুব বেশি গড়ে ওঠেনি। ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে এর প্রয়োজন রয়েছে। গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ভোক্তা সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ভারতের শুধু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেই ১৮টি ভোক্তা অধিকার সংগঠন রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : সরকারের পক্ষ থেকে ভোক্তা-স্বার্থ রক্ষায় কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যায়। এসব যথেষ্ট কি না?

এস এম নাজের হোসাইন : বিশ্বের অনেক দেশেই ভোক্তাবিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে। তারাই ভোক্তাদের স্বার্থ দেখে। আমাদের দেশে দেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সমস্যাটা এখানেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থও দেখে, আবার ভোক্তাদের স্বার্থও দেখে। ফলে স্বার্থের দ্বন্দ্বও দেখা দেয়। সে কারণেই ভোক্তাবিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় করা প্রয়োজন। তা না হওয়া পর্যন্ত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যক্রমের আরও সম্প্রসারণ এবং তা জোরদার করা প্রয়োজন। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে, কিন্তু তা আরও বেশি করা উচিত। আমাদের দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থই দেখে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবসায়ীদের মন্ত্রণালয়ও বলে থাকেন অনেকে। এখানে ভোক্তা পর্যায়ে সুবিধা হবে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

দেশ রূপান্তর : ভোক্তা অধিদপ্তর কীভাবে কাজ করে?

এস এম নাজের হোসাইন : আমাদের দেশের ভোক্তাদের মধ্যে অভিযোগ জানানোর মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। আমরা সহনশীল হয়ে গেছি। বিচার চেয়ে কী হবে এমন মনোভাব দেখা যায় অনেক ভোক্তার মধ্যে। সে কারণেই বিক্রেতারা যে প্রতারণা করছেন, তা ভোক্তাদের সহ্য হয়ে গেছে। অধিকার রক্ষায় মানুষকে আইনও জানতে হয়। কিন্তু অনেকেই আইন জানার চেষ্টা করেন না। আবার অভিযোগ করতে হলে কিছু নিয়ম মানতে হয়। পাকা রসিদ লাগে। কিন্তু আমরা এসব বিষয়ে বেশি উদাসীন থাকি। পাকা রসিদ নিই না। ভোক্তাদের কাছে আহ্বান থাকবে, তারা যেন ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। অভিযোগ করে তারা প্রতিকার তো পাবেনই, এর জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে অধিদপ্তর যে জরিমানা আদায় করবে, এর ২৫ শতাংশ পাবেন অভিযোগকারী ভোক্তা। কিন্তু এই বিষয়টি ভোক্তারা অনেকেই জানেন না। ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযোগ না পেলে নিজ থেকে কিছু করতে পারে না। তাই সুবিধা পেতে হলে ভোক্তাদেরই অভিযোগ নিয়ে হাজির হতে হবে।

দেশ রূপান্তর : দেশে ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন পাস হয়েছিল। এটি কীভাবে কাজ করে এখন?

এস এম নাজের হোসাইন : ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইনটি পাস হয়েছিল। প্রতিযোগিতা আইন আর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন দুটি এমনই যে এগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। কিন্তু সেটা হলোই না। একটা ভালো আইন পাস করা হলো। কিন্তু এটি কাজ করার জন্য প্রতিযোগিতা কমিশনই গঠন করা হয়নি। এর মধ্য দিয়ে আইনটিকে একধরনের অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। এটা খুবই অন্যায় করা হচ্ছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে প্রতিযোগিতা কমিশন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ, এতে ভোক্তারাই লাভবান হবেন।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এস এম নাজের হোসাইন : আপনাকেও ধনবাদ।