গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পেছন দিকে এগিয়ে যাওয়া|360175|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পেছন দিকে এগিয়ে যাওয়া
রাজেকুজ্জামান রতন

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পেছন দিকে এগিয়ে যাওয়া

তথ্যের যে কী শক্তি তা আধুনিককালের সবাই অনুধাবন করতে পারেন। ঘরের অথবা বাইরের, দেশের বা বিদেশের সবকিছু জানার আগ্রহ মানুষের অপরিসীম। এই আগ্রহ বা প্রয়োজন মেটানোর প্রধান হাতিয়ার সংবাদমাধ্যম। শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাজারে সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে তুঘলকি কারবার, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সাগরে ইলিশ ধরা পড়ছে কি না, দুর্নীতির খতিয়ান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জনজীবনের দুর্গতি, প্রশাসনের দায় কিংবা ক্ষমতাসীনদের দুর্বৃত্তপনার বিষয়ে জানার উপায় কি আছে গণমাধ্যম ছাড়া? পাঠক বা জনসাধারণকে সচেতন করা বা সতর্ক করা, শাসকশ্রেণির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা, অর্থনীতির বর্তমান সংকট আর ভবিষ্যতের আশঙ্কার বিষয় মানুষ জানে তো সংবাদমাধ্যমের দ্বারাই ।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো সত্য যে, তথ্য নিরপেক্ষ হলেও তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম সব সময় নিরপেক্ষ হয় না। আর তথ্য পরিবেশনের যে একটা উদ্দেশ্য থাকে, তা তো জানা কথাই। কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবাধ তথ্যের ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

মানুষ কথা বলতে চায়, প্রকাশ্যে কথা বলতে না পারলে মানুষ গোপনে বলে, উচ্চৈঃস্বরে বলতে ভয় পেলে ফিসফিস করে বলে, সরাসরি বলতে না পারলে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলে, শ্রদ্ধা-ভক্তি হারালে ব্যঙ্গ করে বলে আর বিশ্বাসযোগ্য তথ্য না পেলে গুজবের বিস্তার ঘটে। একসময় হলি রোমান আম্পায়ার সম্পর্কে বলা হতো, ইট ইজ নট হলি, নট রোমান ইভেন নট এন আম্পায়ার অলসো। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও কি এমন কথা বলা যাবে যে, এটা ঠিক গণচরিত্রের নয়, সংবাদমাধ্যম হিসেবে কার্যকারিতা হারাচ্ছে আর এর স্বাধীনতা প্রায় বিপন্ন। প্রায় শব্দটার বহুল ব্যবহার তথ্যের সঠিকতার অভাব থেকে নয়, শব্দটার ব্যবহার বেড়েছে সতর্কতা হিসেবে। বিপদ তাড়াতে না পারলেও বিপদ এড়াতে কে না চায়। কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অনেকেই ব্যঙ্গ করে লিখছেন, আমার মন খারাপ এই কথাটা লেখার কারণেও নাকি এখন বিপদ নেমে আসতে পারে।

মুজতবা আলীর একটি কৌতুকের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। হিটলারের জামানায় জার্মানিতে একজন আর একজনকে জিজ্ঞেস করেছিল, কি রে তুই নাকি দাঁতের ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়েছিস। উত্তরে বলেছিল, কী আর করব? কেউ তো মুখ খুলতেই চায় না।

কোন দেশে গণমাধ্যম কতটুকু মুক্ত বা কতখানি স্বাধীনতা ভোগ করে তা থেকে সে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২২ সালের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম (স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩)। রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ পিছিয়েছে দশ ধাপ, অর্থাৎ ঝুঁকি বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় বেশি। ২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫২তম (স্কোর ৫০ দশমিক ২৯)। আর ২০২০ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। অর্থাৎ, গত দুই বছর আগের সূচকেও বাংলাদেশের একধাপ অবনতি হয়েছিল। আর এবারের সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার ছাড়া সবার নিচে বাংলাদেশের অবস্থান। সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত (১৫০), পাকিস্তান (১৫৭), শ্রীলঙ্কা (১৪৬), আফগানিস্তান (১৫৬), নেপাল (৭৬), মালদ্বীপ (৮৭) ও ভুটান (৩৩)।

রিপোর্ট থেকে বোঝা যায় গত বছরের তুলনায় শুধু বাংলাদেশ পিছিয়েছে তা-ই নয়, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সবার অবস্থান উদ্বেগজনক। সামরিক শাসনে থাকা মিয়ানমারের অবস্থান এবার ১৭৬, গত বছর ছিল ১৪০। এবারের সূচকে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের অবস্থানেরও অবনতি হয়েছে। ভারত পিছিয়েছে আট ধাপ, পাকিস্তান পিছিয়েছে ১৭ ধাপ, শ্রীলঙ্কা ১৯ ধাপ, আফগানিস্তান পিছিয়েছে ৩৪ ধাপ আর মালদ্বীপ পিছিয়েছে ১৫ ধাপ। এই দেশগুলো পেছালেও কেউ কি উন্নতি করেনি? উন্নতি হয়েছে দুটি দেশের যেমন উন্নতি হয়েছে ভুটানের, ৩২ ধাপ এগিয়েছে দেশটি। আর নেপাল এগিয়েছে ৩০ ধাপ। ঢাকার বাসে হেলপাররা যেমন বলত, পেছন দিকে এগিয়ে যান। বাংলাদেশও কি তেমনি পেছন দিকে এগিয়ে গেল?

ইনফরমেশন টেকনোলজির কথা যত বহুল প্রচারিত, ঠিক ততটাই মনে হয় আতঙ্কের কারণ। এক ক্লিকে যেকোনো খবর অথবা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সারা বিশ্বের খবর কিংবা হাতের মুঠোয় সারা বিশ্ব এই প্রচারণার সুফল আপাত দৃশ্যমান। কিন্তু খবরের পেছনে যারা তারা কেমন আছেন, কেমন থাকেন, যারা সংবাদ সংগ্রহ করেন তাদের চাকরি ও জীবনের নিরাপত্তা কেমন তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এবার বিশ্ব গণমাধ্যম দিবসে ইউনেসকোর মূলমন্ত্র ছিল : জার্নালিজম আন্ডার ডিজিটাল সিজ বা ডিজিটাল অবরোধে সাংবাদিকতা।

অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, এই অভিধাটি বাংলাদেশের সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার জন্য শতভাগ সত্য। নানা ঘটনায় এটা তো পরিষ্কার যে আমরা এক অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতেই আছি। সাংবাদিকতা একটা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে সব সময়ই বিবেচিত হয়ে আসছে। ডিজিটাল, ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট সব মাধ্যমেই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিপদ ওত পেতে থাকে; তবে ডিজিটাল মাধ্যমটির মাথার ওপর যেন একটা খাঁড়া ঝুলছে। ক্ষমতাসীনরা একটু বিব্রত হলে এই খাঁড়া নেমে আসে। একটু এই খাঁড়ার নাম হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।

সব খবর যেমন জানা যায় না, সব খবর তেমন প্রচারিত হয় না। তবে যতটুকু তথ্য আছে সেসব বিশ্লেষণ করে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের গবেষণা করে জানিয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৮৯০টি মামলা হয়। প্রথম ১৫ মাসে গড়ে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল আর পরবর্তী ৯ মাসে গড়ে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আর একক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় হিসেবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই বেশি মামলা হয়েছে।

জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ, শিক্ষার্থীদের ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, শিক্ষক ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, বেসরকারি চাকরিজীবী ২ দশমিক ১৮ শতাংশ, ব্যবসায়ী ২ দশমিক ১৮ শতাংশ, সরকারি চাকরিজীবী ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও আইনজীবী শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ। মামলা করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন পেশার মানুষ হলেও মামলা যারা করেছেন, অর্থাৎ বাদীরা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন কোনো সংগঠনের নেতাকর্মী অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এই আইন সম্পর্কে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে আইনটি জারি করার সময় সরকারের একাধিক মন্ত্রী বলেছিলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ দমন করতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। নিশ্চিন্তে থাকুন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ আইন ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু তারা সে কথা রাখেননি, ওপরের পরিসংখ্যান দেখলে তা বুঝতে অসুবিধা হবে না কারও। শারীরিক হামলা, চাকরির অনিশ্চয়তা তো আগে থেকেই ছিল, এখন যুক্ত হয়েছে আইনগত হয়রানি।

দৃষ্টান্ত দেখলেই বোঝা যায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কীভাবে সাংবাদিক তথা নাগরিকদের হাত-পা বেঁধে দিয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতিপ্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ ও ব্যবহার করলে দোষী ব্যক্তির ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদন্ড, জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে এই আইনে। কোনো আইন যদি এই উদ্দেশ্যেই করা হয় যে, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করা হবে, তাহলে সেই আইনকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। এই আইনটির বেশির ভাগ ধারা জামিন অযোগ্য। গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে হাজির করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়, ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে থেকে প্রমাণ করতে হয়, তিনি নিরপরাধ।

আবার এটাও দেখা গেছে যে, এ পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের বিচার হয়েছে। অর্থাৎ বিচার করা এ আইনের প্রধান উদ্দেশ্য নয়; মূল্য উদ্দেশ্য হলো ভয় পাইয়ে দেওয়া। অর্থাৎ এই আইনের মাধ্যমে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে এবং সে উদ্দেশ্য অনেকাংশেই সফল হয়েছে। ক্রমাগত ভয় দেখানোর ফলে এখন নিজে থেকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে দিয়েছে।

রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ। আইন সভা বা সংসদ যেখানে আইন প্রণীত হয়, বিচার বিভাগ যেখানে আইন অনুযায়ী বিচারকরা হয়, প্রশাসন যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মসম্পাদন করে এই তিন স্তম্ভের ওপর ভর করে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকার কথা। কিন্তু আইন যদি গণতান্ত্রিক না হয়, বিচার বিভাগ যদি যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে, প্রশাসন যদি জনগণের ওপর নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনসাধারণ। তখন সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। যে কারণে সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সেই সংবাদমাধ্যম যদি আতঙ্কে থাকে আর সংবাদকর্মীরা যদি ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার বিপদ কি এড়ানো যাবে?

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]