মোটরবাইক দুর্ঘটনা সতর্কতা ও সচেতনতা|360176|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
মোটরবাইক দুর্ঘটনা সতর্কতা ও সচেতনতা
আবু আফজাল সালেহ

মোটরবাইক দুর্ঘটনা সতর্কতা ও সচেতনতা

গাড়ি যত ছোট হয়, ঝুঁকি ততই বাড়ে। যে গাড়ির চাকার সংখ্যা কম, তার দুর্ঘটনার হার ততই বেশি। এ হিসাবে মোটরসাইকেলে ভ্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আর গতি যদি বেপরোয়া থাকে তাহলে তো কথাই নেই। নিজেও ঝুঁকিতে থাকে, পথচারীকেও ঝুঁকিতে রাখে। মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েক বছর ধরে দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অর্ধেকের মতো ঘটে থাকে মোটরবাইক ঘিরে। আর প্রতি ঈদের ছুটির সময় ঘটে অর্ধেকের বেশি মোটরবাইক দুর্ঘটনা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে-পরের দুই সপ্তাহে দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় ৩২৩ জন নিহত হন। নিহতের ৪৩ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। নিহতদের বড় অংশই ছিল কিশোর-তরুণ। এবার ঈদের ছুটির সময় সড়কে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় ৪৮ শতাংশই মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী।

ঢাকা শহরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশ বেড়েছে। বাহনটি দিন দিন যেমন জনপ্রিয় হচ্ছে, এর চালকদের বিরুদ্ধে বেপরোয়া আচরণের অভিযোগও জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল আরোহীদের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও ভারী হচ্ছে। দ্রুতগতিতে কর্মস্থল বা কাক্সিক্ষত স্থানে পৌঁছাতে অনেকে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালায়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ মোটরসাইকেল চলছে। শুধু রাজধানীতেই চলছে ১২ লাখের বেশি। মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব এবং যানজটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

এবারের ঈদুল ফিতরে ৪ মে রাত ১২টা থেকে ৭ মে রাত ১২টা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় ২১ হাজার ৩৬০টি মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু সেতু পারাপার হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর তিন দিনের হিসাবে এত বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল এর আগে কখনো পারাপার হয়নি। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়। ঈদের আগের এক সপ্তাহের হিসাবও প্রায় এমনই হবে।

তীব্র যানজটে ঢাকা শহরে দ্রুতগতিতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মোটরসাইকেল একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় সুযোগ পেলেই বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো কিংবা ফুটপাতের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো নিত্যঘটনা। পথচারীদের অভিযোগ, অনেক মোটরসাইকেল আরোহী ফুটপাতের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো তাদের অধিকার বলে মনে করে। ঈদ বা কোনো উৎসবে নবীন বা অদক্ষ চালকরা বেপরোয়া গতিতে মোটরবাইক চালিয়ে থাকে। তীব্র হর্ন দিয়ে দ্রুতগতিতে ফুটপাতের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চলার দৃশ্য রাজধানীতে যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। অনেক সময় সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে বৃষ্টির মৌসুমে রাতের বেলা। অন্য গাড়ি তাদের ধাক্কা দিয়েছে কিংবা রাস্তায় বাইক পিছলে গেছে।

দুর্ঘটনার কারণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেল চালক ছিলেন বেপরোয়া, দুজনের বেশি আরোহী থাকা, হেলমেট না-থাকা ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না-থাকা, আকস্মিক বাঁক, সরু ও ভাঙা সড়ক, ট্রাফিক নিয়ম না-মানা, অতি উচ্চগতির মোটরসাইকেলের সহজলভ্যতা, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা কম থাকা, পরিবারের সদস্য বা সন্তানদের বেপরোয়া আচরণ অবজ্ঞা করা বা প্রশ্রয় দেওয়া, অদক্ষ চালক, অবৈধ ওভারটেক, পুরনো যন্ত্রাংশ ইত্যাদি। বাইকচালক ও আরোহীরা অনেক সময় মোবাইল ফোনে প্রচুর কথা বলেন। এটাও দুর্ঘটনার কারণ।

বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো কিংবা ফুটপাতের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো এখন নিত্যঘটনা। পথচারীদের অভিযোগ, অনেক মোটরসাইকেল আরোহী ফুটপাতের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো তাদের অধিকার বলে মনে করে। তা ছাড়া সিগন্যালে অপেক্ষার ধৈর্যও তাদের থাকে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে চালক পা-হাত ছেড়ে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। এতেও দুর্ঘটনা ঘটে। সময় হাতে না নিয়ে দ্রুত কর্মস্থল বা কাক্সিক্ষত স্থানে পৌঁছাতে অনেকে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালান। চলার সময় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করে থাকেন অনেক বাইক চালক ও আরোহী। এতে চালকের মনোযোগ অন্যদিকে সরে গিয়ে দুর্ঘটনার কারণ হয়। তীব্র যানজটের ঢাকা শহরে দ্রুতগতিতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন আরোহীরা।

মানুষ নির্ধারিত সময় গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ বাহনটির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। অনেকে মনে করে, মোটরসাইকেল মানেই গতি। অল্পসময় অনেক ট্রাফিক থাকলেও দ্রুততার সঙ্গে গন্তব্যে সহজেই পৌঁছানো যায়। বেশি গতি ওঠালে চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গতি যেন বেপরোয়া না হয়, সেদিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে। গতি যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে বেশির ভাগ সময় দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলা এ দুর্ঘটনা কমাতে চালক ও পথচারীকে সতর্ক হতে হবে।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

[email protected]