বুদ্ধিজীবী ও বাংলাদেশ|360177|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
বুদ্ধিজীবী ও বাংলাদেশ
এম আর ইসলাম

বুদ্ধিজীবী ও বাংলাদেশ

রাষ্ট্র যদি একটা পরিবার হয়, তবে সেখানে বেশ কিছু সদস্য থাকবে; যাদের কেউ কেউ আইনি ও নৈতিক অনুশাসনে অনুগত বা বাধ্য থাকে, আবার কেউ কেউ হতে পারে অবাধ্য, অর্থাৎ ভুল করে কারণে-অকারণে। পরিবারে এমনটা দেখা দিলে পরিবারের সবচেয়ে পরিণত, বিজ্ঞ সদস্য অবাধ্য বা ভুল করা সদস্যের ভুলগুলো তুলে ধরে, তাকে ভুল শোধরাতে নির্দেশ করে। রাষ্ট্র নামক পরিবারের এই সবচেয়ে পরিণত আর বিজ্ঞ সদস্যের নাম রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী সমাজ বা ইন্টেলেকচুয়ালস সোসাইটি। কারণ এদের মেধা, জ্ঞান, ও গবেষণার চর্চা তাদের অন্য আর দশজন সাধারণের চেয়ে আলাদা করে ভাবতে, দেখতে এবং বুঝতে শেখায়। তাই তো, জার্মান দার্শনিক এই জ্ঞানী সমাজকে তুলনা করেছেন ‘ঙষি ড়ভ অঃযবহধ’ বা ‘ঙষি ড়ভ গরহবৎাধ’-এর সঙ্গে, যাদের আলোকময় দৃষ্টি অন্ধকারের মধ্যেও তাদের পথ দেখায়।

বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা বড়ই প্রশ্নবোধক ও হতাশাব্যঞ্জক! বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন অথবা ন্যায্য সমাজ গঠনে বুদ্ধিজীবীদের যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেখানে তারা খানিকটাই ব্যর্থ। পৃথিবীতে যত উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ বা সমাজ আছে, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন তাদের দার্শনিক বা বুদ্ধিজীবী সমাজ। আজকের জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকা, ইতালি, ইংল্যান্ড, জাপান শুধু ভারী শিল্পের দেশ বা শক্ত অর্থনীতি অথবা পরাক্রমশালী সশস্ত্র বাহিনীর কারণে বর্তমানের পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেয় না; বরং নেতৃত্ব দেওয়ার গণতান্ত্রিক গুণগুলো তারা প্রথমে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে। আর তারপরই তারা এসেছে বিশ্ব নেতৃত্বে। ওইসব উন্নত গণতন্ত্রে, বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের সরকার ও নাগরিক সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে কোনটা তাদের ভুল আর কোনটা সঠিক। কার্যকারণের জটিল সমীকরণ নিরীক্ষা করে, তারা প্রতিটা ঘটনাকে এবং তার ফলাফলকে ব্যাখ্যা করেছে। তাই, তাদের নিরপেক্ষ আর চিন্তাশীল মতামত বা পর্যালোচনা অনেক সময়ই অপ্রিয় হলেও বাস্তবে এবং সুদূর প্রসারে সঠিক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে। পপুলার বা জনপ্রিয় বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আরামদায়ক রাজনৈতিক বয়ান বা ইতিহাসের মিথ তৈরি করা, বুদ্ধিজীবীদের কাজ নয়।

বাংলা ব্যাকরণের ‘বুদ্ধিজীবী’র সমাসের মতোই বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান। বাংলা ব্যাকরণে ‘বুদ্ধিজীবী’ উপপদ তৎপুরুষ সমাস; যার ব্যাসবাক্য করা হয়েছে, ‘বুদ্ধি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করেন যে’। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দিন শেষে তাদের মূল কাজটা করতে না পারলেও, বুদ্ধি বেঁচে জীবিকা নির্বাহ করেছেন ঢের। নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা এগুলোকে নির্মোহভাবে চর্চা না করে, তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা সরকারের তল্পিবাহক হতে হতে, দিন শেষে ঢাকের বায়ায় পরিণত হয়েছেন। তাদের এমন অমূলক ও অপ্রত্যাশিত ভূমিকা দেশ, সমাজ, রাজনীতি এমনকি অর্থনীতিকেও বিপন্ন করে তুলেছে। বুদ্ধিজীবীদেরও রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু তারা অন্য অনেকের মতো দলীয় দাসে পরিণত হবেন না নিশ্চয়ই। রাজনীতিকদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে বা গঠনমূলক সমালোচনা করে তারা রাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতির উপকার করবেন এমনটাই কাম্য।     

অথচ আমাদের বিধিবাম! অন্যের অন্যায্য কাজকে অহেতুক যুক্তিতর্ক দিয়ে ন্যায্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই যেন আমাদের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের কাজ। জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার পরিবর্তে আজকের অনেক বুদ্ধিজীবীই লোভ আর ভয়ে বশীভূত। সবাক আর নির্বাক পক্ষপাতিত্বের প্রতিযোগিতা তাদের মধ্যে। গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থরক্ষায় তারা তাদের সারা জীবনের অর্জনকে বিসর্জন দেয়। এক ভোগী জীবনের কপট বাসিন্দা এরা। এদের চাই দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদ, বিদেশি কূটনীতিকের দায়িত্ব, সরকারি বিভিন্ন কমিশনের সদস্যপদ, অর্থনৈতিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট প্রজেক্ট, রাষ্ট্রীয় পদক, সরকারি বরাদ্দের প্লট, ফ্ল্যাট, আমলাতান্ত্রিক জীবনের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা, সরকারি পয়সায় বিদেশ সফর ইত্যাদি।   

সারা জীবন আইন, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব পড়ে আসা এ দেশীয় স্কলাররা সাধারণত সমাজের অনেক অনাচার, অবিচারের ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না। অথচ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য হিসেবে তারা দলীয় ঝাণ্ডা তুলে ধরেন ঠিকই। কেউ কেউ তো আবার অনেক উদ্ভট বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের সাফাই গেয়ে কিছু বাগিয়ে নেওয়ার ধান্দায় থাকেন। তবে সবাই একচেটিয়া এমনটা নন। ব্যতিক্রম আছে; যেমন কেউ কেউ নির্মোহ আর নিরপেক্ষভাবে ঘটনা বিশ্লেষণ করে তাদের মতামত জানান বটে, তবে তাদের সংখ্যা নেহাত নগণ্য। নির্মোহ সমালোচক বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগী মানসিকতা ধারণ করতে হয়। বঞ্চনা আর বৈষম্যের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এরা নিজেদের জন্য নয়, বরং বাঁচবেন দেশ আর মানুষের জন্য। জীবনের অর্জিত জ্ঞান আর গবেষণা দিয়ে সমাজ আর সমাজের বোধ তৈরি করে দেবেন। সৃষ্টি করবেন জনমত।

বুদ্ধিজীবীদের মূল কাজ যেকোনো ঘটনার বা সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন করা, মতামত দেওয়া। তবে, এটা কোনো সহজ কাজ না। যা খালি চোখে দেখা যায় না, বুদ্ধিজীবীরা সেটাই দেখবেন, ব্যাখ্যা করবেন এবং ব্যাখ্যা চাইবেন। সরকারের বিরোধী দলের থেকে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা খানিকটা আলাদা। রাজনৈতিকবিরোধী শিবির মূলত যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক বিরোধিতা করে। তাই, তাদের সমালোচনায় যুক্তির চেয়ে পক্ষপাতিত্ব আর বিরোধিতা থাকে বেশি। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের গঠনমূলক পর্যালোচনায় বা সমালোচনায়, রাষ্ট্র বা সরকারেরই আখেরে লাভ হয়। রাজনীতিকদের দলীয় লেন্সে যে ভুল ধরা পড়ে না, সেটা বুদ্ধিজীবীদের লেন্সে ধরা পড়ে। তাই, বুদ্ধিজীবীদের ধরিয়ে দেওয়া ভুল থেকে, তারা নিজেদের সিদ্ধান্তকে শুধরে নিতে পারে। এই প্রক্রিয়া একই সঙ্গে একটা পলিটিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে, যা রাষ্ট্রের যেকোনো দল বা ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। এমন আইডিয়োলজিক্যাল বা আদর্শগত মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রেই আইনের চেয়ে শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্র তখন ব্যক্তি বা দলীয় শাসনের থেকে বেরিয়ে এসে, আইনের এবং আদর্শের শাসনের অধীনস্থ হয়।

তাই যেকোনো রাজনৈতিক সরকারেরই উচিত রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনভাবে সমালোচনা বা পর্যালোচনার অধিকার ও দায়িত্বকে সমুন্নত রাখা। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদেরও উচিত কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর পার্টিজান না হয়ে, সমাজ, মানুষ ও সময়ের জন্য নির্মোহভাবে গভীর পর্যালোচনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটা জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণে অবদান রাখা। তাদের মনে রাখা উচিত শ্রদ্ধা, সম্মান আর ইতিহাসের পাতায় ইতিবাচকভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে, আর কোনো বড় প্রাপ্তি হতে পারে না।

লেখক শিক্ষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়