শিরিন আবু আকলেহ ও ৪৪ জন|360190|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
শিরিন আবু আকলেহ ও ৪৪ জন
বিপুল জামান

শিরিন আবু আকলেহ ও ৪৪ জন

২০০০ সাল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে অন্তত ৪৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ১১ মে জেনিন রিফিউজি ক্যাম্পে খবর সংগ্রহের সময় নিহত হন আলজাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ। ‘প্রেস’ ঘোষিত পোশাক পরিহিত থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনায় সমালোচনার ঝড় বইছে বিশ্বজুড়ে। আলজাজিরার তথ্যাবলম্বনে লিখেছেন বিপুল জামান

গত ১১ মে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আক্রমণের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আলজাজিরার সাংবাদিক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান শিরিন আবু আকলেহ নিহত হন। ৫১ বছর বয়সী আকলেহ আলজাজিরার আরবি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক ছিলেন। আলজাজিরার যাত্রার এক বছর পরেই যুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত ছিলেন। শেষ ইমেইলে আলজাজিরার রামাল্লা ব্যুরোকে শিরিন আবু আকলেহ লিখেছিলেন, ‘দখলদার বাহিনী জেনিনে হামলা চালায় এবং জাবরিয়াত পাড়ায় একটি বাড়ি ঘেরাও করেছে। সেখানে যাচ্ছিঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া মাত্রই আমি সংবাদ পাঠাব।’ তিনি একটি ‘প্রেস’ লেখা জ্যাকেট পরে ছিলেন। সেখানে অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গেই দাঁড়িয়েছিলেন। অতর্কিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলি ছুড়তে শুরু করলে গুলিটি তার ঠিক কানের নিচে আঘাত হানে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী ‘ঠাণ্ডা মাথায়’ এবং ‘ইচ্ছেকৃতভাবে’ ৫১ বছর বয়সী শিরিন আবু আকলাকে গুলি করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সাংবাদিকদের টার্গেট করে গুলি চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, বুধবার সকালে তাদের সৈন্যরা এবং নিরাপত্তা বাহিনী জেনিনের শরণার্থী শিবিরে হামলা চালিয়েছিল ‘সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের’ ধরতে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, গোলাগুলি চলার সময় ‘সম্ভবত’ ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের গুলি লেগেছিল এদের গায়ে। কিন্তু ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট এই ঘটনার জন্য পুরোপুরি ইসরায়েলি সরকারকেই দায়ী করেছেন।

লক্ষ্য যখন সাংবাদিক

ফিলিস্তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০০০ সাল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে অন্তত ৪৫ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

আলজাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ ১১ মে পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থী শিবিরে যখন দায়িত্ব পালন করছিলেন তখন গায়ে ‘প্রেস’ চিহ্নিত প্রতিরক্ষামূলক পোশাক ছিল। নিয়ম অনুযায়ী সাংবাদিকদের দিকে গুলিবর্ষণ করার কথা না হলেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলি ছোড়ে সাংবাদিকরা যেখানে ছিলেন সেখানে। গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন শিরিন। গুলিবিদ্ধ হন তার পাশে থাকা আল সামুদি। তবে তার অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত সাংবাদিকদের দীর্ঘ মিছিলে শিরিন আবু আকলেহ হলেন এখন পর্যন্ত সর্বশেষ ব্যক্তি। এই বাহিনীর রয়েছে সাংবাদিকদের উদ্ধত অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার পূর্ব ইতিহাস। ফিলিস্তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে অন্তত ৪৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সমিতি এই সংখ্যা বলছে ৫৫।

গত বছর, ২০২১ সালের মে মাসে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় স্থানীয় ভয়েস অব আল-আকসা রেডিও স্টেশনের সম্প্রচারকারী ইউসেফ আবু হুসেন নিহত হন। পরিবার ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হুসেনের বাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। ১০ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত ১১ দিনের বোমাবর্ষণের সেই ঘটনায় কমপক্ষে ২৬০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল। ধারাবাহিক হামলার মাঝপথে, ১৫ মে, ইসরায়েলি হামলায় আলজাজিরা এবং অন্যান্য মিডিয়া সংস্থার অফিসের সেই ভবনটি ধ্বংস হয়।

আলজাজিরার কার্যালয়ে হামলার নিন্দা জানাতে, বোমা হামলার নিন্দা জানাতে এবং এ বিষয়ে ইসরায়েল সরকারকে জবাবদিহি করতে চাপপ্রয়োগে আলজাজিরা সকল মিডিয়া এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান আহ্বান করেছে। তারপরও ইসরায়েলি বাহিনীর সাংবাদিক হত্যা অব্যাহত রয়েছে।

২০১৮এক সপ্তাহে দুই সাংবাদিক নিহত : ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে, দুই ফিলিস্তিনি সাংবাদিক এক সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

গাজা সীমান্তে একটি গণবিক্ষোভ কাভার করার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হন আহমেদ আবু হুসেন। ২৪ বছর বয়সী, আবু হুসেন যিনি ১৩ এপ্রিল জেবালিয়ার কাছে এই বিক্ষোভের সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হন এবং মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গাজাভিত্তিক ভয়েস অব দ্য পিপল রেডিও স্টেশনের ফটোগ্রাফার হুসেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় ‘প্রেস’ লেখা প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরা ছিলেন।

এর কয়েক দিন আগে, গাজাভিত্তিক এআইএন মিডিয়া সংস্থার ফটোগ্রাফার ইয়াসের মুর্তজা, আগের দিন ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আহত হওয়ার ফলে ৭ এপ্রিল মারা যান। গাজা উপত্যকার দক্ষিণে খুজাতে একটি বিক্ষোভ কাভার করার সময় ‘প্রেস’ লেখা একটি নীল জ্যাকেট পরা সত্ত্বেও ৩০ বছর বয়সী মুর্তজা পেটে গুলিবিদ্ধ হন।

২০১৪-ফিলিস্তিনে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক বছর : ইসরায়েল ৮ জুলাই থেকে ২৬ আগস্ট, ২০১৪ পর্যন্ত গাজায় সবচেয়ে মারাত্মক হামলা চালায়। এ হামলায় গাজায় কমপক্ষে ২১০০ জন নিহত এবং ১১০০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। সে বছর ফিলিস্তিনে সাংবাদিকদের জন্যও সবচেয়ে মারাত্মক ছিল। ফিলিস্তিনের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে অন্তত ১৭ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

২০০০-২০১২ : কমপক্ষে ২৫ সাংবাদিক নিহত হন। ২০০০ থেকে ২০১২ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার শুরু থেকে কমপক্ষে ২৫ সাংবাদিক ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলের জবাবদিহিতার অভাব

সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলার ব্যাপারে ইসরায়েলের জবাবদিহিতা না থাকার ব্যাপারটি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা এটিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাজ বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু ওই ঘটনায় আরেকজন সাংবাদিক আলি আল-সামুদি পিঠে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত। আল সামুদি এবং অন্যান্য সাংবাদিক যারা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবিকে খারিজ করে দেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করছে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে ঘটে থাকতে পারে। আল-সামুদি বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অপারেশন ভিডিও করতে যাব এমন সময় তারা আমাদের ওপর গুলি করতে শুরু করে কোনো রকম সতর্ক না করেই বা স্থান ত্যাগ করতে না বলেই।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রথম গুলিটি আমাকে আঘাত করে এবং দ্বিতীয় গুলি আঘাত করে শিরিনকে... সেখানে কোনো ফিলিস্তিনি বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না।’ গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় আবু আকলেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় সাংবাদিক শাথা হানাইশা বলেছেন, ‘সাংবাদিকদের দলকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।’ ‘আমরা চারজন সাংবাদিক ছিলাম, আমরা সবাই ভেস্ট পরা, সবাই হেলমেট পরা,’ হানাইশা আলজাজিরাকে বলেছেন। তিনি (শিরিন) গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাওয়ার পরও দখলদার সেনাবাহিনী গুলি চালানো বন্ধ করেনি। গুলি চালানোর কারণে আমি তাকে টেনে নেওয়ার জন্য আমার হাতও বাড়াতে পারিনি। সেনাবাহিনী হত্যার জন্যই গুলি চালাচ্ছিল এবং এ ব্যাপারে তারা অনড় ছিল।’

প্রত্যক্ষদর্শী এই সাংবাদিকদের সাক্ষ্যপ্রমাণের কারণে ইসরায়েলি বাহিনীকে পূর্বোক্ত দাবি থেকে পিছু হটতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা একটি ভিডিও প্রদর্শন করে যে দাবি করেছিলেন, জেনিনে সাংবাদিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা; এ দাবি এখন ধোপে টিকছে না। যাচাইকরণের প্রচেষ্টায় দেখা গেছে যে, আবু আকলেহ যে এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল সেই এলাকায় গলিপথটি ছিল না। ইসরায়েলের সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আভিভ কোচাভি পরে বলেছেন, আবু আকলেহকে কে গুলি করেছে তা স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আবু আকলেহের হত্যাকাণ্ডের একটি যৌথ তদন্ত পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এই আহ্বানকে একটি হোয়াইট ওয়াশ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ। ইইউ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ, সেইসাথে অন্যান্য সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন আবু আকলেহের হত্যার একটি পূর্ণ, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

শিরিনের জন্য ফিলিস্তিনিদের শোক, বিচারের দাবি

ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার এক দিন পরে সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহের সম্মানে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের আয়োজন করা হয় ফিলিস্তিনি শহর রামাল্লাতে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের শহরে বৃহস্পতিবার দুপুরে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের (পিএ) রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি অংশ নেন। রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস আবু আকলেহকে সম্মান জানান এবং কম্পাউন্ডে তাকে শেষ বিদায় জানান। এ সময় জাতীয় রক্ষীবাহিনীর একটি বিশাল মিছিল আল আকলেহের দেহ বহন করে আনে। মাহমুদ আব্বাস বলেন, আবু আকলেহের মৃত্যুর জন্য ইসরায়েল ‘শতভাগদায়ী’।

‘আমরা আবু আকলেহ হত্যার বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ তদন্তের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি,’ আব্বাস বলেছেন, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা সুষ্ঠু বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) যাবেন। আবু আকলেহের হত্যাকাণ্ড ফিলিস্তিন ও আরব বিশ্বে শোকের ছায়া ফেলেছে।

ফিলিস্তিনের অনেকেই ২০০০ সাল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা প্রতিরোধের সময় পশ্চিম তীরের প্রধান শহরগুলোতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বড় আকারের আক্রমণের নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের জন্য তাকে স্মরণ করে। সাংবাদিকতার ছাত্র আজহার খালাফ বলেন, ‘তার শাহাদাতের খবরটি প্রত্যেক ফিলিস্তিনির মুখে চড় মারার মতো ছিল।’ ২২ বছর বয়সী বিরজাইট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র আবু আকলেহকে ‘মিডিয়া আইকন’ এবং ‘আদর্শ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ‘তিনি প্রতিটি বাড়ির মানুষ ছিলেন, তিনি প্রতিটি ফিলিস্তিনিদের ব্যথা অনুভব করেছিলেন এবং তাদের ব্যথা বহন করে অপরকে জানিয়েছিলেন।’ ‘তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের কণ্ঠস্বর।’ শিরিনকে হত্যার খবর জেনে তার মুখাবয়বের একটি বড় ছবি রামাল্লা শহরের কেন্দ্র আল-মানারা স্কোয়ারে সেঁটে দেওয়া হয়। শিরিন আবু আকলেহের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ৩৭ বছর বয়সী রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মী হাজেম আবু হেলাল বলেছেন, ‘শিরিন জনগণের কাছের ছিলেন।’ ‘সবাই তাকে শুধু তার কাজের জন্যই নয়, নানা সামাজিক কাজে তার সম্পৃক্ততার জন্যও ভালোবাসত। তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সংগঠনের অনেক উদ্যোগে অংশ নিতেন, আবু হেলাল তাকে ‘দয়ালু’ এবং ‘পেশাদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আবু আকলেহের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের হাসপাতালের মর্গে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তাদের উচ্চস্বরের ভীষণ কান্নায় চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছিল। এরপর তার মরদেহ বের করে আনা হয় এবং তাকে পিএ ন্যাশনাল গার্ডের গাড়িতে করে রাষ্ট্রপতি চত্বরে নিয়ে যাওয়ার আগে প্রার্থনা করা হয়।

কম্পাউন্ডে অনুষ্ঠানের পরে, আবু আকলেহের মরদেহ একটি অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্যে একটি কাফেলায় করে রামাল্লা এবং জেরুজালেমের মধ্যে অবস্থিত কালান্দিয়া চেকপয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারাহর সেন্ট লুইস ফ্রেঞ্চ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখানেই শিরিনের পরিবার বাস করে। শুক্রবার তাকে সমাহিত করা হবে। বুধবার এবং বৃহস্পতিবার, আবু আকলেহকে জেনিনসহ বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি শহরে শ্রদ্ধা জানানো হয়। যেখানে তাকে হত্যা করা হয়েছিল সেই জেনিন, নাবলুস এবং রামাল্লা, এইসব অঞ্চলে যখন তার দেহ বহন করা হচ্ছিল তখন তার সঙ্গে যাত্রা করছিল শোকার্ত ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ মিছিল। তার দেহ যখন বহন করা হচ্ছিল তখন উপস্থিত শত শত ফিলিস্তিনি সেøাগান দিচ্ছিলেন, ‘আমাদের আত্মা দিয়ে, আমাদের রক্ত দিয়ে, আমরা তোমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করব, শিরিন’, ‘রামাল্লা থেকে জেনিন পর্যন্ত, ঈশ্বর তোমার আত্মার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, শিরিন।’

ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শাতায়েহ আলজাজিরাকে বলেন, আবু আকলেহ ‘একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব’ এবং ‘তিনি একজন তারকা’। তার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে, শাতায়েহ আরও বলেন, আবু আকলেহ ‘শুধু একজন সংবাদদাতাই ছিলেন না, ঘটনাগুলো নিজে মোকাবিলা করেছেন, যাপন করেছেন এবং তার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘তার শেকড় জেরুজালেমে এবং তার পরিবারের শেকড়ও সেখানেই। সেখানে সর্বত্র তার অবস্থান দেখেছি, শোকগৃহে, উদযাপনে, বিক্ষোভে এবং অবস্থান ধর্মঘটে।’ ‘আমরা আজ এসেছি শিরিনের সাথে দাঁড়াতে। আমি শিরিনকে দেখে বিশ্বের কাছে আমার চোখ খুলেছিলাম,’ ১৯ বছর বয়সী এলিন সালামেহ আলজাজিরাকে বলেছেন।

প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা দেখে ফুঁসে উঠেছে বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা। আলজাজিরার নিয়মিত কলামিস্ট অ্যান্ড্রু মিট্রোভিকা বলেন, ‘শিরিন আবু আকলেহকে খুন করা হয়েছে। তিনি ‘নিহত’ হননি। তাকে খুন করা হয়েছে। তার মুখমণ্ডলে গুলি করা হয়েছে। হাতে না, পায়ে না, বাহুতে না। মুখে। এটা নিহত করার গুলিবর্ষণ ছিল না, ছিল খুন করার গুলিবর্ষণ। আবু আকলেহকে মুখে গুলি করা হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। তাকে খুন করা হয়েছে সত্য বলার জন্য, যা তিনি করছেন আলজাজিরায় ১৯৯৭ সাল থেকে। আবু আকলেহ তার দায়িত্ব পালন করেছেন যথাযথভাবে। অসম্মান, ভয়াবহতা এবং বিপদ সত্ত্বেও তিনি মহত্ত্ব, ধৈর্য এবং সহনশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ঘটমান ঘটনাকে তুলে ধরা ছিল তার কর্তব্য, বাধ্যবাধকতা এবং দায়িত্ব। তিনি করেছেন সে কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে শিরিনকে নিয়ে আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস যেখানে ইসরায়েলকে সমর্থন করেন এমন সদস্যের সংখ্যাই বেশি সেখানেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে আলজাজিরার সাংবাদিক নিহত হওয়াকে নিন্দনীয় বলা হয়েছে। যদিও কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ইসরায়েলকে এই ঘটনায় দোষী বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু কিছু সদস্য যারা পররাষ্ট্রনীতি এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার সমিতিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন তারা সম্পূর্ণভাবে ঘটনাকে উপেক্ষা করেছেন। কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব এ হত্যাকা- নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনামুখর ছিলেন। এই কংগ্রেস সদস্য নিহত সাংবাদিকের প্রতি সম্মানে এক মিনিটের নীরবতার প্রস্তাবের দাবি উত্থাপন করেন এবং ঘটনার জন্য দায়ী বাহিনীর প্রতি নিন্দা জানান। তিনি তার টুইটার অ্যাকাউন্টে টুইট করেন, একজন আমেরিকান সাংবাদিক খুন হয়ে গেলেন যিনি পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত ছিলেন ‘প্রেস’ লেখা দ্বারা। কিন্তু আপনি কিছুই করছেন না এবং বলছেনও না শুধু আরও খুন করার সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া।’ এই টুইটের দ্বারা তিনি প্রতি বছর ইসরায়েলকে আমেরিকার ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তার দিকে ইঙ্গিত করে প্রসিডেন্ট জো বাইডেনকে কটাক্ষ করেছেন। তালিব বলেন, আপনি ফিলিস্তিনি, আমেরিকান বা অন্য কিছু, যা-ই হন না কেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে হত্যা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

রিপাবলিকান সদস্যদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইলহান ওমার ডেমোক্রেট মুসলিম আমেরিকান সদস্য ইসরায়েলকে নিন্দা করে বলেন, ‘একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ঘোষণা করার পরও তিনি (শিরিন আবু আকলেহ) ইসরায়েল সেনাবাহিনী কর্র্তৃক নিহত হয়েছেন। আমরা প্রতি বছর ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন সামরিক সাহায্য দিচ্ছি ইসরায়েলকে কোনো প্রকার নিষেধাজ্ঞার ধরাবাধা ছাড়াই।’ তিনি টুইটের মাধ্যমে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই জবাবদিহিতার জন্য কী করা হবে?’ তার এমন ক্ষুব্ধ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি কোনো।