জমি রেলওয়ের আয় দখলদার নেতাদের|360228|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
জমি রেলওয়ের আয় দখলদার নেতাদের
শহীদুল হুদা অলক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

জমি রেলওয়ের আয় দখলদার নেতাদের

দেশের উত্তরের সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে বাংলাদেশ রেলওয়ের জায়গায় অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ করে বছরের পর বছর ধরে অর্থ কামিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। রেলের ৭৮ দশমিক ১৬ একর জায়গা দখল করে তারা নির্মাণ করেছেন বসতবাড়ি, কারখানাসহ বহু বিপণিবিতান। দখলদারদের এ তালিকায় রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও। এমনকি রয়েছে রহনপুর পৌরসভাও। মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রেলের জায়গা দখল করে গড়েছেন তিনটি বাড়ি আর বিএনপি ও জামায়াত নেতারা করেছেন বিপণিবিতান। এসব স্থাপনা থেকে প্রভাবশালী দখলদাররা প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও অবৈধ দখলে যাওয়া জমি উদ্ধারে তৎপরতা নেই রেল কর্র্তৃপক্ষের। রেল কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়ান প্রভাবশালীরা।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী বিভাগের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর-আমনুরা রেলপথের গোলাবাড়ি থেকে রহনপুর হয়ে ভারত সীমান্তবর্তী শিবরামপুর পর্যন্ত মোট ৩৭৮ দশমিক ৮৮ একর জায়গা রয়েছে রেলওয়ের। এর মধ্যে বর্তমানে রহনপুর রেলস্টেশন ও তার আশপাশ এলাকায় রেলওয়ে ব্যবহার করছে মাত্র ১৪৭ দশমিক ৮৪ একর। বাকি সম্পত্তির মধ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শূন্য দশমিক ৪৫ একর, কৃষিজমি হিসেবে ৮১ দশমিক ২৪ একর, জলাশয় হিসেবে ১২ দশমিক ০১ একর এবং বিএডিসির সার গুদামের জন্য ৫ দশমিক ০৩ একর জায়গা লিজ দেওয়া হয়েছে। পতিত রয়েছে ৫৪ দশমিক ১৪ একর আর অবৈধ দখলে রয়েছে ৭৮ দশমিক ১৬ একর জায়গা।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে বোর্ডের জারি করা এক নির্দেশনা অনুযায়ী, রেলস্টেশনের এক হোম সিগন্যাল থেকে আরেক হোম সিগন্যাল পর্যন্ত রেলপথের দুই পাশের ১০০ ফুটের মধ্যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু ওই নির্দেশনা পালনের বালাই নেই রহনপুর রেলস্টেশন এলাকায়। দখলদাররা অবকাঠামো গড়ে ব্যবসা করছেন রেলপথ ও স্টেশনের দেয়াল ঘেঁষেই।

সরেজমিন দেখা গেছে, অবৈধ দখলে থাকা বিশাল জায়গা জুড়ে বড় বড় অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করেছেন রহনপুরের প্রভাবশালীরা। রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের ‘কোলজুড়ে’ তিনটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য হালিমা খাতুন। রেলের জায়গায় করা বাড়িগুলোর একটিতে তিনি বসবাস করেন, বাকি দুটি ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে পাচ্ছেন নগদ অর্থ। বহু বছর ধরে রেলের জায়গা হালিমার অবৈধ দখলে থাকলেও তা দখলমুক্ত করতে রেল কর্র্তৃপক্ষ কোনো ভূমিকা নেয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রহনপুরের এক বাসিন্দা অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হালিমা খাতুন আওয়ামী লীগের নেত্রী। তিনি উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন, ছিলেন জেলা পরিষদের সদস্য। এ কারণে তার অনেক ক্ষমতা। তিনি রেলের জমি দখলে নিয়ে বাড়ি করেছেন এবং বাড়িগুলো ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। তার ক্ষমতার কারণে ভয়ে অনেকে কিছু বলতে পারেন না। আর শুধু হালিমা নয়, অনেক প্রভাবশালী রেলের জায়গা দখল করে রেখেছেন। কী করব? আমরা দেখেও না দেখার মতো করে বসে রয়েছি।’

রেলের জায়গা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে অবকাঠামো তৈরির তালিকায় রয়েছেন রহনপুর স্টেশন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আশরাফুল ইসলাম আশরাফ, মোহাম্মদ হোসেন, রহনপুর পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম তুহিন, যুবদল নেতা ডাবলু ও জামায়াত নেতা সানোয়ার হোসেনসহ আরও অনেক প্রভাবশালী। রহনপুর রেলস্টেশনের বাইরে রহনপুর কলেজ মোড় এলাকায় রেলের জলাশয় দখল করে মার্কেট বানিয়েছেন হাবিবুর রহমান হবি ও আশরাফুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি। এছাড়া হিরুপাড়া এলাকায় রেলের জায়গায় তৈরি করা হয়েছে এমএম ফুড নামে একটি বেকারি কারখানা।

অবৈধ দখলদারদের তালিকায় ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। খোদ রহনপুর পৌরসভা রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশে আমবাজার এবং পূর্ব পাশে বাজার বসিয়ে লাখ লাখ টাকা খাজনা আদায় করছে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে পৌর কর্র্তৃপক্ষকে আইনি নোটিস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। দৃশ্যত রেলের জায়গা পৌর বাজারে পরিণত হয়েছে।

রেলওয়ের জায়গা দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে বলে দাবি করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হালিমা খাতুন। অবশ্য তিনি রেলওয়ের জায়গায় তার দুটি বাড়ি থাকার কথা স্বীকার করেন। ক্ষমতাসীন দলের এই নেত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। ১৯৯১ সালে আমার বিয়ে হয় বাঙ্গবাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা উপজেলা যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে। আমার শ্বশুর দীর্ঘদিন আগে বাঙ্গবাড়ি থেকে রহনপুরে চলে এসেছিলেন। আমার যে একটা বাড়ির কথা বলা হয়েছে সে বাড়িটা ছাদ দেওয়া আছে এক কাঠার ওপর। সে বাড়িটা ছিল একটা লোকের টিনের ছাপড়া। আমি ওই বাড়িটা ওই লোকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে টিনের জায়গায় ছাদ দিয়েছি। আর আরেকটি বাড়ি সেটি দেড় কাঠা জায়গার ওপর, সেটিও আমি কিনে নিয়েছি ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো পাঁচ বছর জেলা পরিষদের সদস্য ছিলাম। কী করলাম নারীদের জন্য এই উপলব্ধি থেকে দ্বিতীয় বাড়িটিতে আমি মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করেছি। আমার দখলে মোট আড়াই কাঠা জমি রয়েছে।’ রেলের জায়গায় থাকা দ্বিতীয় বাড়িটি নারীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার দাবি করলেও ওই কেন্দ্রের জন্য এখনো কোনো উপকরণ কেনা হয়নি বলে স্বীকার করেন হালিমা খাতুন।

রেলের জায়গা দখলের অভিযোগ রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতা সানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। অবশ্য তার দাবি, তিনি রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে রেলের জমিতে স্থাপনা বানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সানোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রহনপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন ৭৫০ স্কয়ার ফুট (বর্গফুট) জায়গা রেলের কাছ থেকে লিজ নিয়ে হোটেল করেছিলাম। এখন হোটেল চলে না। তাই দোকানঘর করে মার্কেট বানিয়েছি। রেলকে খাজনা দিয়েই ব্যবসা করছি।’ আগে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ২০১০ সাল থেকে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

দখলদারের তালিকায় নাম থাকা অন্যরাও রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে রেলের জায়গায় অবকাঠামো বানিয়েছেন বলে দাবি করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেলের জায়গা কোনোভাবেই ১০০ বছরের জন্য লিজ (ইজারা) দেওয়া হয় না। লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষিজমি দুই বছরের জন্য, পুকুর তিন বছরে জন্য দেওয়া হয়। আর বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রতি বছরের জন্য নবায়নযোগ্য লিজ দেওয়া হয়। নবায়ন না করলে লিজ বাতিল বলে গণ্য হবে। লিজগুলো প্রদান করা হয় খোলা নিলামের মাধ্যমে।’

অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ একটি জটিল প্রক্রিয়া। উচ্ছেদ করতে গেলে দখলদার প্রভাবশালীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। তবে উচ্ছেদ আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। বাধা আসলেও যারা অবৈধ দখল করে আছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাব। উচ্ছেদ করে তাদের লাইসেন্সের (লিজ) আওতায় নিয়ে আসব। পর্যায়ক্রমে সব উচ্ছেদ করা হবে।’

এদিকে ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া রহনপুর রেলস্টেশনের এখন পর্যন্ত অবকাঠামোগত তেমন উন্নয়ন হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে রহনপুর রেলস্টেশন ঘিরে ভারতের সিঙ্গাবাদ রেলরুট দিয়ে ত্রিদেশীয় (বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল) বাণিজ্যের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে রহনপুর রেলস্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ রেল বন্দরে রূপ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে রহনপুরবাসী। এ প্রসঙ্গে রহনপুর রেলবন্দর বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক নাজমুল হুদা খান রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর আগে রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রেলরুট দিয়ে শুরু হওয়া সীমান্ত বাণিজ্য এখনো চালু আছে। এখানে আমদানিকারকরা ট্রান্সশিপমেন্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা চাইলেও তা পূরণ হচ্ছে না যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের অবহেলা ও রেলের জায়গা অবৈধ দখলে থাকার কারণে।’