তেল কারসাজি করে হাতানো হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা|360231|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
তেল কারসাজি করে হাতানো হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা
শাহেদ আলী ইরশাদ

তেল কারসাজি করে হাতানো হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা

ঈদের আগে থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানো ও সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা শুরু হয়। ঈদের পর দাম বাড়িয়েও বাজার স্বাভাবিক করা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মাঠে নামে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এরপরই গুদামে মজুদ করা সয়াবিন ও পাম তেল বেরিয়ে আসতে শুরু করে। গত চার দিনে সারা দেশে অন্তত ৬ লাখ লিটার তেল জব্দ করা হয়।

জব্দ করা এসব তেল ঈদের আগে থেকে মজুদ করা। ঈদের পর দাম বাড়ালে গায়ের মূল্য মুছে বেশি দামে বিক্রি করছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ বোতলজাত তেল খুলে বেশি দামে বিক্রি করছিলেন।

ভোজ্য তেল নিয়ে এমন কারসাজি করে গত কয়েক দিনে অন্তত ১৬০ কোটি টাকা ভোক্তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। ভোজ্য তেলের প্রতিদিনের সরবরাহ ও চাহিদার সঙ্গে তুলনা করে তিনি আনুমানিক এই হিসাব দিয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেলের দাম কমালে বাজারে তার প্রভাব পড়তে দীর্ঘ সময় লাগলেও দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হয় তার পুরোটাই বিপরীত। বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে পুরনো দামে কেনা সয়াবিন তেল।’

সফিকুজ্জামান আরও বলেন, ‘আমাদের পাইপ লাইনে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টন তেল আছে। যে তেল রিফাইনারি (আমদানিককারক) থেকে আগের দামে কিনেছেন ব্যবসায়ীরা সেই তেল এখনো ভোক্তার কাছে পৌঁছায়নি। এই তেল যদি বর্তমান দামে বিক্রি করতে পারে, তাহলে প্রায় ৪০ হাজার টন তেলে ৩৮ টাকা করে বেশি নিলে ১৬০ কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যখন আমরা তেলের দাম কমালাম সেটা সমন্বয় করতে ১৫ দিন সময় লাগল। আর ৬ মে যখন তেলের দাম বাড়ল বাড়তি দামের তেল ৮ মে বাজারে চলে আসল। তো আমি বলব দাম কমানো এবং বাড়ানোর সময় মিল মালিকদের কার্যক্রম একই রকম হওয়া উচিত।’ এখন সৎ ব্যবসায়ী খুঁজে পাওয়া একটা দুর্লভ ব্যাপার হয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গত ৯ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্য তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে করা এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ‘নির্ধারিত দামে ভোজ্য তেল বিক্রি করা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা তারা রাখেননি। ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে ভুল করেছি।’

গত ৫ মে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে, যা পরদিন থেকে কার্যকর হয়। বোতলজাত সয়াবিন লিটারপ্রতি ৩৮, খোলা সয়াবিন ৪৪ ও পাম তেল ৪২ টাকা বাড়ানো হয়। সে হিসেবে ১৬০ টাকা লিটারের বোতলের দাম হয় ১৯৮ ও খোলা সয়াবিন ১৩৬ থেকে বেড়ে হয় ১৮০ টাকা।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সহকারী প্রধান (বাজার নিয়ন্ত্রণ) মাহমুদুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিকমানের ইনভেনটরি সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট অনুযায়ী জাতীয় মূল্য নির্ধারণ কমিটি তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়। তবে সেখানে আগের মাসের আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা, ইনবন্ড ও এক্সবন্ড এই তিনটির গড় হিসাব করা হয়। মে মাসের তেলের দাম নির্ধারণে আমলে নেওয়া হয় এপ্রিল মাসের বিশ^বাজারের দর। প্রতিটনের জন্য ১ হাজার ৭৯০ ডলারে এলসি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ১ ডলার ৮৯ টাকা হিসাবে প্রতিটন সয়াবিন তেলের আমদানি মূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। এই দামের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে ব্যাংক সুদ, সরকারের ভ্যাট, প্রসেস লস, প্রশাসনিক ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, প্যাকেজিং খরচ, বিজ্ঞাপন, বিপণন, উৎপাদনকারীর মুনাফা, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফাসহ প্রায় ৩০টি খাত।

পাম তেল আমদানির ক্ষেত্রেও একই সূত্র ব্যবহার করে ট্যারিফ কমিশন। দেখা যায়, ১ হাজার ৭৫০ ডলার দাম ধরে প্রতিটনের দাম দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ‘এই দামটা যে ঠিক করা হয়েছে, এই তেল কবে আনা হয়েছে। নতুন লেভেল না দেওয়া পর্যন্ত পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এলসি খোলা থেকে তেল বাজারে আসা পর্যন্ত মনিটরিং দরকার। সরকার যে ট্যাক্স প্রত্যাহার করেছে তারপরও এই দাম নেওয়া অযৌক্তিক। এতে একদিকে রাজস্ব ক্ষতি হবে অন্যদিকে ভোক্তার পকেট কাটা যাবে।’

এস আলম গ্রুপের (এস আলম ভেজিটেবল ওয়েল লিমিটেড) জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ ১১ মে সয়াবিন তেল পরিস্থিতি নিয়ে এফবিসিসিআই আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, ‘ঈদের আগে আমরা প্রতিদিন ব্যবসায়ীদের ৫ থেকে ৬ হাজার টন তেল ডেলিভারি দিয়েছি। কিন্তু তেল কোথায় গেল।’

আরও ৩১৫০ লিটার জব্দ : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী বাজারে অভিযান চালিয়ে মজুদ করা ২ হাজার ৩৫০ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গতকাল পরিচালিত এ অভিযানে এনএস ট্রেডার্সকে ৫০ হাজার টাকা ও নিউ ভাই ভাই স্টোরকে ২০ হাজার টাকা অর্থদ- করা হয়। পরে জব্দকৃত তেলগুলো সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে খুচরা মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কাউছার মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কাউছার মিয়ায় বলেন, ওই দুটি দোকান বেশি দামে বিক্রির জন্য মজুদ করে বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে।

মানিকগঞ্জ শহরে বোতলজাত সয়াবিন তেল অবৈধ মজুদ করে বোতল খুলে খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে এক তেলের ডিলারকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় কালীপদ অ্যান্ড সন্স নামের তেলের ডিলারের গুদামে অভিযান চালিয়ে পাঁচ লিটার ও দুই লিটারের ১ হাজার ৩শ লিটার তেল পাওয়া যায়। গত রমজান মাসে এই তেল মজুদ করা হয় বলে ভোক্তা অধিকার জানিয়েছে।

মাদারীপুরের কালকিনিতে সয়াবিন তেল মজুদ ও বোতলের তেল খুলে বেশি দামে বিক্রয় করার দায়ে ২ ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল উপজেলার খাসেরহাট বাজারে অভিযান চালিয়ে ফরাজি স্টোরে ঈদের আগের গুদামে মজুদ করা ১ হাজার ৯৫৪ লিটার তেল জব্দ করা হয়। এ ছাড়াও মেসার্স রবীন্দ্রনাথ কুন্ডু স্টোরের মালিক বোতলজাত ২৭০ লিটার সয়াবিন তেল খুলে খোলা তেল হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করছিলেন।

ময়মনসিংহে অভিযান চালিয়ে একটি দোকানের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা আগের দামের ১৪ লিটার সয়াবিন তেল উদ্ধার করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পরে সেগুলো আগের দামে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে দোকানিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ফরিদপুর শহরের হেলিপ্যাড মার্কেটের মফিজ স্টোর ও আসাদ স্টোরে অভিযান চালিয়ে ৩০০ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ ঘটনায় মফিজ স্টোরকে ৪০ হাজার এবং আসাদ স্টোরকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠান দুটি ১০ দিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

৮ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা : উৎপাদন ও সরবরাহের পাশাপাশি সেবা সীমিতকরণ বা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে দেশের ভোজ্য তেল আমদানিকারক ৮ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।

বাসস জানায়, গত বুধবার প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে স্বাধীন অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে এ মামলা করে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মামলার শুনানিতে অংশ নিতে নোটিস পাঠানো হয়েছে।

কমিশনের চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলাম বাসসকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যেসব অসামঞ্জস্য বা প্রতিযোগিতাবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা কমিশন আইনের ১৫-এর ‘খ’ ধারা অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। আগামী ১৮ ও ১৯ মে কমিশনে মামলাগুলোর শুনানি হবে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নোয়াখালী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর প্রতিনিধি)