দুর্ধর্ষ অপরাধীদের জামিনের তথ্য নেই পুলিশের কাছে! |360233|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
দুর্ধর্ষ অপরাধীদের জামিনের তথ্য নেই পুলিশের কাছে!
সরোয়ার আলম

দুর্ধর্ষ অপরাধীদের জামিনের তথ্য নেই পুলিশের কাছে!

দুর্ধর্ষ অপরাধীরা কে কখন জামিনে মুক্ত হচ্ছে সেই তথ্য নেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে। অপরাধীরা কীভাবে জামিন পাচ্ছে সেটাও জানে না তারা। ফলে কে কখন জামিন নিয়ে আত্মগোপন করছে বা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা সংস্থাগুলোর নজরের বাইরেই থাকছে। এ অবস্থায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিসহ গুরুতর অপরাধে জড়িতদের জামিন ও কারাগার থেকে তাদের মুক্তি পাওয়ার তথ্য পেতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গঠন করতে যাচ্ছে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল। এর আগেও মনিটরিং সেল গঠন করার কথা ছিল, কিন্তু করতে পারেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এবার এই বিশেষ সেল গঠন করতে সম্প্রতি কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আগামী দুই মাসের মধ্যেই মনিটরিং সেলের কার্যক্রম শুরু হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ওই সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেলের মূল অফিস থাকবে ঢাকায়। আর ৬৪ জেলায় থাকবে শাখা অফিস। এই সেলকে সব ধরনের সহায়তা করার কথা রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ মনিটরিং সেলের প্রধান হবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব। আরও থাকবেন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা। তাদের সহায়তা করবেন র‌্যাবসহ কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তারা। জেলা পর্যায়ে আদালত পুলিশসহ জেলা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা থাকার কথা রয়েছে সেলে।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, দুর্ধর্ষ জঙ্গি, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, একাধিক মামলার আসামি ও মাদক কারবারিরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এসব অপরাধী জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ সরকারবিরোধীদের সঙ্গে মিলে দেশে নানা নাশকতা চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্ধর্ষ অপরাধীরা কারাগার ছাড়ার আগে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আগাম তথ্য পাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও বিশেষ কারণে তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। আদালতের সরকারের নিয়োগ করা আইনজীবী থেকে শুরু করে কারাগারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ফাঁকি দিয়ে ওরা বেরিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো সমালোচনার মধ্যে পড়েছে।

এ বিষয়ে গত দুই মাসের ব্যবধানে পুলিশ সদর দপ্তরে হওয়া একাধিক বৈঠকে বলা হয়েছে, গত এক বছরে অন্তত শতাধিক দুর্ধর্ষ অপরাধী জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছে। অথচ পুলিশ ওইসব সন্ত্রাসীর জামিনের বিষয়ে কিছু জানে না। অপরাধীরা পুনরায় একই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে। তাদের তালিকা করতে বৈঠক থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের জামিনের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও একাধিক বৈঠক হয়েছে।

বিভিন্ন সময় জঙ্গিদের জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এছাড়া জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজিরা না দেওয়ার তথ্য জানা যায়। নানা সময় জঙ্গিদের জামিন পাওয়ার বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগও জানিয়েছেন। তারা জামিন প্রক্রিয়ায় থাকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদও দিয়েছেন।

জানা গেছে, বিশেষ মনিটরিং সেলটি গঠন হওয়ার পর বিশেষ সুবিধায় কোনো অপরাধী জামিন পাচ্ছে কি না, জামিন পাওয়ার পর এসব আসামি কী করছে এবং মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছে কি না এসব বিষয় তদারকি করবে। কতজন তালিকাভুক্ত অপরাধী জামিনে রয়েছে এবং তাদের সর্বশেষ অবস্থা তাও তদারকি করবে বিশেষ এই সেলটি।

এই নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দুর্ধর্ষ অপরাধীরা জামিন পাচ্ছে কি না তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মনিটরিংয়ে সরকারি আইনজীবীদের আরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয়কে যথাযথ পদক্ষেপ নিতেও অনুরোধ করা হয়।

ওইসব বৈঠকে আরও বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত আসামি, দুর্ধর্ষ জঙ্গি ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের মধ্যে কতজন জামিনে রয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে সেই হিসাব নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এমনকি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর কতজন নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছে আর কতজন গা ঢাকা দিয়েছে তাও কেন্দ্রীয়ভাবে জানা নেই সংস্থাগুলোর। প্রতিদিন দেশের মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জেলাগুলোর জজ আদালত থেকে কে কখন জামিন পাচ্ছে, সে হিসাবও নিয়মিত রাখা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামিন মনিটরিং করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সেল গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে সেল গঠন করা যায়নি। এবার সেল গঠন হবে। তিনি আরও বলেন, জামিন নিয়ে অপরাধীরা বের হয়ে যাচ্ছে। অথচ জামিনের বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য থাকছে না। মনিটরিং সেলটির কার্যক্রম শুরু হলে অপরাধীরা জামিন পাওয়ার পরপরই তথ্য চলে আসবে। কোন কোন পথ অনুসরণ করে তারা জামিন পেয়েছে সেই তথ্যও আসবে সেলে। তাছাড়া কারাগার থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে আগাম তথ্য চলে আসবে মনিটরিং সেলের কাছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব দাগী অপরাধী জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছে তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরনো পেশায় সক্রিয় আছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।’

নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন পুলিশ সুপার (এসপি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারা জামিন পাচ্ছে বা কারা কারাগার থেকে বের হয়ে যাচ্ছে সেই হিসাব থাকা খুবই জরুরি। তারা আরও বলেন, বিশেষ দুর্বলতার কারণে জামিনের দৈনন্দিন পরিসংখ্যান রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সমন্বয় ও নজরদারি না থাকায় একাধিক মামলার আসামি একটি মামলাতেই জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যায়। তবে এর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে আলোচিত মামলাগুলোর কতজন আসামি জামিনে রয়েছে তার পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাছাড়া তাদের মধ্যে কতজন নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছে, কতজন ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলেছে সেই তালিকাও তৈরি হচ্ছে। আসামি গ্রেপ্তারের পর জামিন পাওয়া ও কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার বিষয়গুলো কঠোর নজরদারিতে রাখার জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামি কারাগারে যাওয়ার পর তারা কী করছে তাও মনিটরিং করতে হবে। অপরাধীরা জামিন পেলে তাৎক্ষণিক জানাতে হবে। তাছাড়া আদালতে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা থাকেন তাদেরও তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।