তদন্তে কূলকিনারা মিলছে না|360235|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
তদন্তে কূলকিনারা মিলছে না
এস এম নূরুজ্জামান

তদন্তে কূলকিনারা মিলছে না

রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্তের জট খোলেনি দেড় মাসেও। এমন পরিস্থিতিতে মামলাটির দুই আসামিকে আবারও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারী ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মতিঝিল বিভাগের কর্মকর্তারা। দুই আসামি কাইল্যা পলাশ ও ওমর ফারুককে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টিপু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন মূল পরিকল্পনাকারী বিদেশে পলাতক সুমন শিকদার ওরফে মুছাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল শুক্রবার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। ঘটনার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও টিপু হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া মোটরসাইকেল চালক এবং অস্ত্র সরবরাহকারী এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। কারা এ হত্যার প্রকৃত মদদদাতা কিংবা পরিকল্পনাকারী সে সম্পর্কেও এখনো পরিষ্কার হতে পারেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। অনেকটা অনুমানের ওপর ভর করেই তদন্ত কার্যক্রম চলছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। মূল শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও তার কাছ থেকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করতে পারেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। মোটরসাইকেল চালকের নাম মোল্লা শামীম বলে জানা গেলেও বের করা সম্ভব হয়নি অস্ত্রদাতার নাম কিংবা উদ্ধার হয়নি সেই অস্ত্রটিও।

গত ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে মতিঝিল এজিবি কলোনি থেকে বাসায় যাওয়ার পথে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে মাইক্রোবাসে গুলি করলে টিপু (৫৪) ও তার পাশের রিকশাযাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি (২০) নিহত হন। এ ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয় শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশ। ডিবি তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী আবৃত্তিকার আহকাম উল্লার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা এরফান উল্লাহ দামালকে গ্রেপ্তার করে। খুনের এক সপ্তাহ পর র‌্যাব এ ঘটনায় মতিঝিলের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক (৫২), আবু সালেহ শিকদার ওরফে শ্যুটার সালেহ (৩৮), নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির (৩৮) এবং মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্যা পলাশকে (৫১) গ্রেপ্তার করে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তের জন্য একমাত্র সম্বল ছিল সিসিটিভি ফুটেজ। তবে মাথায় হেলমেট থাকায় মোটরসাইকেল চালক এবং আরোহীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে ডিবির মতিঝিল বিভাগের এডিসি শাহিদুর রহমান রিপন মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে হত্যাকান্ডের ঠিক পরদিনই কিলার আকাশের বিষয়ে নিশ্চিত হন। জয়পুরহাট সীমান্ত পার হতে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় বগুড়া ফিরে এলে সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তার কাছ থেকে শুধু সুমন শিকদার ওরফে মুছার নাম ছাড়া আর কোনো তথ্য বের করতে পারেননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। অস্ত্র সরবরাহকারীর নামও অজানা রয়ে গেছে। তবে তাদের ধারণা, আরও দুটো ব্যাকআপ টিম ছিল কিলিং মিশনে। কারণ আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের আগের রাত অর্থাৎ ২৩ মার্চ টিপুকে হত্যার আরেকটি মিশন ব্যর্থ হয়েছিল।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে টিপু হত্যা মামলার তদন্তকারী দলের তত্ত্বাবধায়ক ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রিফাত রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চটাই দিচ্ছি এ মামলার ক্লু-আউটের জন্য। হত্যাকান্ডের প্রধান শ্যুটার আকাশ স্বীকার করেছে তার সঙ্গে শুধু মুছার কথা হতো। তার নির্দেশেই সে কাজটি করেছে। তবে এর ওপরে কারা রয়েছে সে সম্পর্কে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা পাইনি। এখন মূলত মুছা ও শামীমকে গ্রেপ্তার করার জন্য গ্রেপ্তার আসামিদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কাজেই এ মামলার চার্জশিট দাখিল করার মতো সময় এখনো হয়নি।’

টিপু হত্যায় কয়টি অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল এবং তা উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘উদ্ধার করা গুলির খোসার ফরেনসিক রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যেত যে এ হত্যায় একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি না। হত্যায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র আমরা উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।’

টিপু হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে মুছা অন্যতম বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল। তিনি বলেন, ‘তাকে (মুছা) গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে অন্যদের নামও বেরিয়ে আসত। একই সঙ্গে মোল্লা শামীমকেও আমরা খুঁজছি।’

র‌্যাবের আরেক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার তিন থেকে চার মাস আগে টিপু হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এর পেছনে কাজ করেন এ হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ-প্রকাশের অন্যতম শ্যুটার ও বোচা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সুমন শিকদার ওরফে মুছার সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করেন ওমর ফারুক। প্রাথমিকভাবে দেওয়া হয় ৯ লাখ টাকা। টাকার বড় একটি অংশের জোগান দেন ওমর ফারুক। হত্যাকান্ডের ঠিক ১২ দিন আগে সবকিছু ঠিক করে ১২ মার্চ দুবাইয়ে চলে যায় মুছা। এ প্রসঙ্গে উপকমিশনার রিফাত রহমান শামীম বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখার মাধ্যমে সন্দেহভাজন পলাতক আসামি মুছাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে এখনো বলার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি।’

টিপু হত্যা মামলার তদন্তের জট এখনো না খোলায় হতাশ তার স্ত্রী ও মামলার বাদী ফারজানা ডলি। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে আমার স্বামী খুনের বিচারের অপেক্ষায় আছি। যারা পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাদের কাউকে ধরতে পারেনি পুলিশ। মাঝেমধ্যে ফোন দিয়ে শুধুই ধৈর্য ধরতে বলছেন। গত পরশুও দুই আসামি কাইল্যা পলাশ ও ওমর ফারুককে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নিয়েছে। এর বাইরে দৃশ্যমান অগ্রগতি জানাতে পারেননি তদন্তকারীরা।’