শিশুশ্রমের ‘কেন্দ্র’ উপকূল|360237|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২ ০০:০০
শিশুশ্রমের ‘কেন্দ্র’ উপকূল
সুমন সিকদার, বরগুনা

শিশুশ্রমের ‘কেন্দ্র’ উপকূল

যেখানে শিশুর হাতে থাকার কথা বই সেখানে কোমলমতি শিশুদের কাঁধে ওঠে সংসারের বোঝা। যেখানে হাসিখুশি ও আনন্দ-উল্লাসে বেড়ে ওঠার কথা সেখানে শুধুই দারিদ্র্যের ছোবল। যে চোখে স্বপ্ন দেখার কথা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের, সেই চোখ নির্ঘুম রাত জাগে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার নেশায়। নৌকা আর জাল নিয়ে ছুটতে হয় মাছ শিকারে। শুধু জেলে, কৃষক বা শ্রমিকের মতো পেশাই নয়, উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর প্রায় সব পেশাতেই শিশুদের সমান পদচারণা। বাবা-মায়ের হাত ধরে সুনিশ্চিত ভবিষতের উদ্দেশ্য বেড়ে ওঠাই প্রতিটি শিশুর অধিকার, কিন্তু উপকূলে দেখা যায় এর ভিন্ন রূপ। শিশুশ্রমের বেড়াজালে বন্দিজীবন কাটে হাজারো শিশুর। দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে বিবর্ণ হয়ে ওঠে তাদের শৈশব। উপকূলের মৎস্যঘাটগুলো যেন শিশুশ্রমের আঁতুড়ঘর। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে চলে শিশুশ্রমের মহাযজ্ঞ।

বরগুনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, নলী মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও চরদুয়ানি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ উপকূলের বিভিন্ন চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, ৮-১৫ বছর বয়সী শত শত শিশু কাজ করছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কেউ কাজ করে মৎস্য আড়তে, কেউ জেলে নৌকায় আবার কেউবা কাজ করে পাইকারদের সঙ্গে। অনেক শিশু আবার কাজ করে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোর শ্রমিক হিসেবে। যে যেভাবেই কাজ করুক না কেন, পরিশ্রমটা করতে হয় পুরোমাত্রায়। বড়দের সঙ্গে সমানতালে কাজ করতে হয় দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য। শুধু মৎস্য ঘাট কিংবা বাজারেই নয়, একই চিত্র উপকূলের চাষের ক্ষেত, ইটভাটা, হোটেল ও রেস্টুরেন্টেও। এসব জায়গায় অহরহ চোখে পড়ে দিনমজুর হিসেবে শিশুদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম।

বরগুনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, যেসব শিশুর থাকার কথা ছিল বাবা-মায়ের কাছে, যাওয়ার কথা ছিল বিদ্যালয়ে, তারাই বড়দের সঙ্গে কাজ করছে পুরোমাত্রায়। কেউ সাগর থেকে আসা ট্রলারের ভেতর থেকে মাছ তুলছে, আবার কেউ সেই মাছের দর হাঁকাচ্ছে বিক্রির উদ্দেশ্যে।

বরগুনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও মৎস্য বাজারে এ প্রতিবেদকের কথা হয় একাধিক শিশুর সঙ্গে। যাদের প্রত্যেকেই দরিদ্রতার বেড়াজালে বন্দি হয়ে সুখের শৈশব ছেড়ে এসেছে কষ্টের কর্মজীবনে।

খাজার দোয়া মৎস্য আড়তে চার বছর ধরে কাজ করছে ১২ বছর বয়সী মেহেদী। মাত্র আট বছর বয়স থেকেই হাড়ভাঙা খাটুনি তার নিত্যদিনের সঙ্গী। মেহেদীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে। বাবা থেকেও না থাকার মতো। মা এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঝিয়ের কাজ করেন, কিন্তু তাতে সংসার চলে না। মাছ বাজার থেকে মেহেদী যা রোজগার করে তা দিয়েই চলে তাদের সংসার।

মেহেদী প্রথমে মাছ বাজারে মাছ টোকাত, এখন সে পুরোমাত্রায় একজন দক্ষ শ্রমিক। কথার ফাঁকে পড়াশোনা করতে ইচ্ছে হয় কি না জানতে চাইলে মেহেদী বলে, ‘ইচ্ছে তো হয় সাহেবদের পোলাপাইনের মতো পড়ালেহা হিইক্কা অনেক বড় হই, কিন্তু সংসার চালাইবো কেডা? মোগো ভাগ্যে যে পড়ালেহা নাই, পড়মু কেমনে?’

মেহেদীর সঙ্গে কাজ করেন বরগুনা সদর উপজেলার পোটকাখালী গ্রামের মো. রাসেল (১৩)। পৃথিবী কী তা বুঝে ওঠার আগেই তাকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন জন্মদাতা বাবা ইউনুস গাজী। প্রতিদিন  সকালে সাগর থেকে আসা ট্রলারের মাছ তুলতে হয় রাসেলকে। আর এ থেকে উপার্জিত টাকা দিয়েই চলে তাদের সংসার। রাসেল বলে, ‘বাপ মইরা গেছে হেই ছোডকালে, এহন ঘরের দায়দায়িত্ব সবই তো আমার। কাম করমু না খামু কী?’

কথা হয় খাজার দোয়া মৎস্য আড়তের মালিক মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তার ওখানে কাজ করে বেশ কয়েকজন শিশুশ্রমিক। শিশুদের কাজে লাগানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ৭০-৮০ জন শিশু কাজ করে, যাদের প্রত্যেকের বয়স ১০-১৫ বছর। আমরা সাধারণত শিশুদের কাজে নিতে চাই না। কিন্তু কী করব বলেন, এমনভাবে এসে ধরে যে কাজ না দিয়ে উপায় থাকে না। এরা প্রত্যেকেই খুব গরিব, কাজ না করলে খাবে কী? এখানে কাজ করে যা পায় তাতে অনেক সময় বাজারের টাকাই হয় না। ঠেকা পড়লে আরও বাড়তি টাকাপয়সা দিয়ে থাকি যাতে করে ওদের সংসার ভালো চলে।’

শুধু মেহেদী ও রাসেলই নয়, দারিদ্র্যের বেড়াজালে এভাবে হাজারো শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। শিশু অধিকারের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও নেই বাস্তবে। তাই উপকূলের হাজারো শিশু বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী ১৯১টি দেশের মধ্যে প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯০ সালের আগস্টে স্বাক্ষর করলেও ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ এই সনদ গ্রহণ করে। আগের তুলনায় শহরে এলাকায় শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও উপকূলের চরাঞ্চল ও জেলেপল্লীতে এর মাত্রা অত্যধিক।

শিশুদের সুরক্ষায় ১৯৭৪ সালের শিশু আইন সংশোধন করে ২০১৩ সালের ১৬ জুন সংসদে শিশু আইন ২০১৩ পাস হয়। শিশু আইন ছাড়াও শিশু অধিকার রক্ষায় সরকারের অসংখ্য আইন ও প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে জাতীয় শিশু নীতিমালা ২০১১, জাতীয় শিক্ষা নীতিমালা ২০১০ এবং জাতীয় শিশুশ্রম নিরোধ নীতিমালা ২০১০ অন্যতম।

শিশু অধিকার রক্ষায় প্রণীত আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বরগুনার নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু অধিকার রক্ষায় প্রণীত আইন ও নীতিমালাগুলোর সঠিক প্রয়োগ এবং আমাদের সচেতনতাই পারে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে আনতে।’

উপকূলের শিশুদের কাজে জড়িয়ে পড়ার জন্য দারিদ্র্যকে দায়ী করে তিনি আরও বলেন, ‘দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করতে হবে এবং সেই পথে আমাদের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করি একদিন আমাদের শিশুদের জন্য নিশ্চিত ভবিষ্যতের একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে পারব।’

এ প্রসঙ্গে বরগুনা জেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা মেহেরুন নাহার মুন্নি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠন নানামুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে শিশুশ্রমের মাত্রা একটু বেশি। এর কারণ হচ্ছে এখানে দারিদ্র্যের হার বেশি, যার ফলে শিশুরা লেখাপড়া ছেড়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেমে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে রক্ষা করতে হলে তাদের পরিবারকে সচ্ছল করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই আজকের শিশু আগামীতে একজন সফল নাগরিক হিসেবে দেশ পরিচালনায় অংশ নিতে পারবে।’