কী কারণে হঠাৎ পদত্যাগ করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব?|360526|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ মে, ২০২২ ১৬:৩২
কী কারণে হঠাৎ পদত্যাগ করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব?
অনলাইন ডেস্ক

কী কারণে হঠাৎ পদত্যাগ করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব?

শনিবার ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন বিপ্লব দেব। ত্রিপুরার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মানিক সাহা। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ করে পদত্যাগ করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব? যে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ত্রিপুরাকে ভারত শাসনের মডেল হিসেবে তুলে ধরার কথা বলেছিল বিজেপি, শনিবার সেই মুখ্যমন্ত্রিত্বের পদ থেকে আচমকা ইস্তফা দিলেন বিপ্লব দেব। এমনকি নিজের মেয়াদ শেষের আগেই মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়লেন তিনি।

কয়েকমাস পরেই ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচন। ইতিমধ্য়েই সেখানে সংগঠন মজবুত করতে শুরু করেছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। তার আগে, বিপ্লবের ইস্তফাকে বিজেপির মাস্টারস্ট্রোক বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে আর মাত্র এক বছর বাকি। এই পরিস্থিতিতে কেন বিপ্লব দেবকে পদ থেকে সরিয়ে দিল বিজেপি? বিশ্লেষকদের মতে, বিপ্লবকে নিয়ে ত্রিপুরায় দলের ভেতরে তৈরি হওয়া গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামাল দিতেই এই পথে হাঁটল বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে বিপ্লবই প্রথম নন, অতীতে নির্বাচনের আগে একাধিক রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদল করেছে বিজেপি, তাতে সাফল্যও এসেছে। এর আগে একই ভাবে উত্তরাখণ্ড, কর্ণাটক এবং গুজরাতেও মুখ্যমন্ত্রী বদল করেছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব।

বিজেপির ভেতরের খবর বলছে, বিপ্লব দেবের মুখ্যমন্ত্রিত্বে ত্রিপুরায় প্রশাসন এবং দল- দুক্ষেত্রেই ক্ষোভ বাড়ছিল। বিজেপির জোটসঙ্গী ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা (আইপিএফটি)ও বিপ্লব দেবকে নিয়ে নিজেদের অসন্তোষের কথা বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েছিল। ত্রিপুরায় ক্ষমতায় ফিরতে গেলে আদিবাসী ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখা বিজেপি-র কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রদ্যুৎ কিশোর দেব বর্মণের দল টিপরা মোথ-ও আদিবাসী অধ্যুষিত বিধানসভাগুলিকে টার্গেট করছে।

বিজেপি সূত্রে খবর, বিপ্লব দেবের বিরুদ্ধে প্রধান তিনটি অভিযোগ উঠেছিল। নিজের মতো করে সরকার চালানো। দলের কোনও নেতার কথা না শোনা। সবাইকে নিয়ে চলতে না পারা। ত্রিপুরায় বিজেপির জোটসঙ্গী আইপিএফটির পক্ষ থেকেও বিপ্লব দেবের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বিরুদ্ধে সরব ত্রিপুরার মন্ত্রী ও বিজেপি বিধায়কদের একটা বড় অংশ। একাধিকবার প্রকাশ্যেও এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।

গত বছর আগরতলার বিধায়ক ও বিজেপি নেতা সুদীপ রায় বর্মন বলেছিলেন, আমাদের যে ভিশন ডকুমেন্ট ছিল, তার ধারেকাছে নেই। কোনটা আগে, কোনটা পরে করতে হবে, তার মিনিমাম ধ্যানধারণা নেই। কারও সঙ্গে কনসাল্ট করে না। বাকি মন্ত্রীদের ভ্যালু নেই। শুধু ওয়ান ম্যান ভয়েজ আছে। অফিসারেরা তার কথাই শুনছেন। তাহলে কে কী কাজ করবে।

এরপর এ নিয়ে একটি অভ্যন্তরীন তদন্ত করে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আর সেই তদন্তের পরই বিপ্লব দেবকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এনিয়ে বিপ্লবের বক্তব্য, প্রত্যেক কাজের একটা শৈলী থাকে। তার সময়সীমা থাকে। তার মধ্যে আমরা কাজ করি। আমাদের যেখানে যেখানে ফিট করা হয়, মুখ্যমন্ত্রী হোক বা অন্য পদ। বিপ্লব দেব সব জায়গায় ফিট।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপ্লব মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে অনেকবারই বিজেপির অস্বস্তি বাড়িয়েছেন। তার নানা মন্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দলের অস্বস্তি বাড়িয়ে একবার তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকবেন কি না, তা ঠিক করতে গণভোট দরকার বলেও মন্তব্য করেছিলেন। সেই সময়েও বেজায় চটে যান দলের নেতৃত্ব।

অনেকে মনে করছেন, বিপ্লবকে মুখ্যমন্ত্রী রেখে নির্বাচনে গেলে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া জোরালো হতে পারে বলেও গেরুয়া শিবিরের আশঙ্কা। একই সঙ্গে, বিপ্লবের বিভিন্ন মন্তব্য রাজ্যে দলের সংগঠনেও প্রভাব ফেলছিল। মনে করা হচ্ছে, সেই সব কারণেই বিপ্লবকে সরিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নতুন কোনও ‘সর্বজনগ্রাহ্য’ মুখ নিয়ে আসতে চাইছে বিজেপি।

গত চার বছরের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের নানা মন্তব্য ও সিদ্ধান্তে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিজেপির ভেতরেই তার বিরোধী গোষ্ঠী তৈরি হয়। নানা সময় বিরোধী গোষ্ঠী মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দিল্লির নেতাদের কান ভারি করতেন। এই অবস্থায় নিজের জনপ্রিয়তা তুলে ধরতে একসময় গণভোঠের দাবি তুলেছিলেন বিপ্লব দেব। যদিও শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সেই দাবি থেকে পরে সরে আসেন তিনি।

সবমিলিয়ে ভোটের এক বছর আগে গোষ্ঠী কোন্দলে ছিন্ন-ভিন্ন ত্রিপুরার বিজেপি। চড়ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী সুর। ফলে বিপ্লবকে সরিয়েই আপাতত ক্ষতে মলম দেওয়ার দাওয়াই দিল শাহ-নাড্ডা জুটি। সর্বগ্রহণযোগ্য কাউকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাতে মরিয়া বিজেপি।

তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বিজেপির অন্দরের গোষ্ঠীবাজির শিকার হয়েছেন বিপ্লব। তাছাড়া, ত্রিপুরার মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন বলে এতদিন ধরে যে অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেস করে আসছিল, সেটাই প্রমাণিত হল বিপ্লবের ইস্তফায়।

বিপ্লবের ইস্তফা প্রসঙ্গে তৃণমূলের মিডিয়া কো অর্ডিনেটর কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘এটা বিজেপির অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীবাজির চূড়ান্ত পরিণতি। বিজেপি একটা লবিবাজদের দল। এর সঙ্গে ত্রিপুরার মানুষ বা ত্রিপুরার উন্নয়নের কোনও সম্পর্ক নেই। পুরোটা বিজেপির অন্দরের ক্ষমতা দখলের খেলা’।

কুণালের আক্রমণ, ‘যারা একজন মুখ্যমন্ত্রীর মেয়াদ শেষ করাতে পারে না, তারা কী করে মানুষের কাছে যাবে। এই সরকার এবং সরকারের মাথারা যে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, সেটা প্রমাণিত হয়ে গেল’।

তৃণমূলের দাবি, ২০২৩ সালে এমনিতেই বিজেপির ক্ষমতা হারানোর কথা। তার একবছর আগে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সরতে হল বিপ্লব দেবকে। বিপ্লব ইস্তফা না দিলেও আগামী বছর সেরাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরত বলে দাবি করেছেন কুণাল ঘোষ। তার বক্তব্য, ‘আগামী দিনে ত্রিপুরায় তৃণমূল শক্তিশালী সরকার গড়বে। মাত্র ৪ মাস লড়াই করে পুরনির্বাচনে ২৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল তৃণমূল। এখন ত্রিপুরার সাধারণ মানুষই প্রশ্ন তোলা শুরু করেছে। ত্রিপুরার মানুষই বলছে, বাংলার মানুষ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেলে ত্রিপুরার মানুষ কেন পাবে না। প্রশ্ন উঠছে বাংলা সবকিছুতে এগিয়ে যাচ্ছে, ত্রিপুরা কেন যাবে না’।

যদিও তৃণমূলের এই দাবি খারিজ করে দিয়েছে বিজেপি। ত্রিপুরা বিজেপির এক বিধায়কের দাবি, ‘বিপ্লব দেবের এই ইস্তফা সম্পূর্ণ দলের অন্দরের ব্যাপার। দলের নির্দেশে কেউ কোনও পদে আসে, কোনও পদ ছাড়ে। বিপ্লববাবুকে হয়তো দল অন্য কোনওভাবে কাজে লাগাতে চায়। কিন্তু এতে তৃণমূলের উল্লাসের কোনও কারণ নেই। ২০২৩ সালে আবার বিজেপিই ক্ষমতায় আসবে। এবং শক্তিশালী সরকার গড়বে’।

২০১৮ সালে দুদশকের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ত্রিপুরায় ক্ষমতা দখল করেছিল বিজেপি। কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই মুখ্যমন্ত্রীর ভার দেওয়া হয়েছিল অনভিজ্ঞ বিপ্লব দেবকে। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি-র প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের মেয়াদই শেষ করতে পারলেন না বিভিন্ন সময়ে বিতর্কে জড়ানো বিপ্লব।