ঈদ ঘিরে বাড়তি উদ্বেগ|362476|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ মে, ২০২২ ০০:০০
ঈদ ঘিরে বাড়তি উদ্বেগ
উম্মুল ওয়ারা সুইটি

ঈদ ঘিরে বাড়তি উদ্বেগ

‘দাম তো বাড়িয়েছে, তারপরও কেন তেল নেই। আমার তো এক লিটারের বেশি তেল কেনা সম্ভব নয়। ভাই, কোনোভাবে দেখেন না এক লিটারের একটা বোতল যদি পাওয়া যায়? যে কোম্পানিরই হোক।’ কলাবাগানের একটি মহল্লার ছোট মুদি দোকানির কাছে গতকাল বুধবার সকালে এভাবেই এক লিটার সয়াবিন তেলের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন ডলি।

শুধু কলাবাগানেই এমন চিত্র নয়, রাজধানীর প্রায় প্রত্যেক এলাকার দোকানেই এ পরিস্থিতি। দাম বাড়ানোর পরও সয়াবিন তেল কিনতে গিয়ে খালি হাতে ফিরছেন ক্রেতারা। কোনো কোনো দোকানে খোলা সয়াবিন পাওয়া গেলেও দাম ২২০ টাকা কেজি। অথচ রোজার ঈদের পরপরই ভোজ্য তেলের নতুন যে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাতে খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ১৮০ টাকা।

শুধু সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেই নয়, দাম বাড়ছে প্রায় প্রত্যেকটি ভোগ্যপণ্যের। ঈদুল ফিতরের আগে ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দেয়। তখন বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেছে। দেশের বাজারেও খুচরা পর্যায়ে দাম না বাড়ালে ভোজ্য তেল সরবরাহ সম্ভব নয়। ঈদের পর ৫ মে সয়াবিন তেল ও পাম তেলের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু পরদিন বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় তেল। এরপর মাঠে নামে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তাদের অভিযানে বেরিয়ে আসতে শুরু করে মজুদ করা তেল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, অভিযানে ১০ লাখ লিটারের বেশি ভোজ্য তেল জব্দ করা হয়েছে। এসব তেল ঈদের আগেই কিনে মজুদ করেন ব্যবসায়ীরা। পরে বোতলজাত তেল গায়ের দাম মুছে বেশি দামে বিক্রি করতে শুরু করেন। ভোক্তা অধিকারের অভিযানের পরও বাজারের ভোজ্য তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। এরই মধ্যে আটা-ময়দা, চাল, ডিম, সবজি, মাছ, মাংসের দাম বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের।

আসছে ঈদুল আজহাকে ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে পাইকারি ও খুচরা দোকানদাররা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা আর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দোহাই দিয়ে গত এক মাসে ভোগ্যপণ্যের কোনো কোনোটির শতভাগ দামও বাড়ানো হয়েছে। আগের মজুদ করা পণ্যের দামও বাড়ছে রাতারাতি।

পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বরাবরই বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ যেকোনো সংকট হলেই একশ্রেণির ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এবারও সেদিকেই যাচ্ছে পরিস্থিতি।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সোহাগ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছেও সরবরাহ কম। যে পরিমাণ অর্ডার দেওয়া হয়, তার চেয়ে অর্ধেক পণ্য পাই।’

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে পাইকারি ও খুচরা বাজাদের ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পরও গত এক সপ্তাহে আবার সরবরাহ কিছুটা কম। আদা, রসুন, হলুদ, শুকনা মরিচ, চিনি, গোলমরিচ, লবঙ্গ, জিরাসহ প্রায় সব গরম মসলার দাম বাড়তির দিকে। আবার এসব পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি অর্থাৎ আমদানি ব্যয় বেশি এমন দোহাই দিয়ে ইতিমধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে।

রাজধানীর মৌলভীবাজার, শ্যামনগর ও কারওয়ান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোজারে ঈদের আগেও এরকম সরবরাহ ঘাটতি তৈরি করা হয়েছিল। সরকারের বাজার মনিটরিং টিম ও ভোক্তার অধিদপ্তরের টিম এসে তাদের ওপর চড়াও হয়। আসলে বড় মজুদদার ও অসাধু সিন্ডিকেটকে ধরতে হবে। তা না হলে তেল নিয়ে এবং আরও কিছু পণ্য নিয়ে এবারও ঝামেলা হবে।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং সেল, ভ্রাম্যমাণ আদালত ছাড়াও একাধিক সংস্থা বাজার নজরদারি করছে। কেউ যেন পণ্য মজুদ করে ঈদের সময় সংকট তৈরি করতে না পারে সে ব্যাপারে কাজ করছে তারা। এর মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের তালিকাও করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এছাড়া আগেও যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সারা দেশের এমন ব্যবসায়ীদের নজরে রাখা হচ্ছে।

‘দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা’বিষয়ক টাস্কফোর্সের এক সদস্য গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুচরা পর্যায়ে মূল্য তালিকা প্রদর্শন এবং প্রতিটি ধাপে পাকা রসিদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে টাস্কফোর্স ১৬ দফা সুপারিশ করেছে রোজার ঈদের আগেই। এই ১৬ দফা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারলে কেউ বাজার নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে পারবে না। টাস্কফোর্সের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সমুদ্র ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং শুল্ক স্টেশনগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খালাসে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ফেরি পারাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যও সুপারিশ করা হয়। এছাড়া কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুদদারির বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশকেও সহায়তা দিতে বলা হয়েছে। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফার বিষয়ে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে টাস্কাফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী সারা দেশে নজরদারি আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বাজারে কঠোর নজরদারি রাখছি। যেখানেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা দাম বেশি রাখার ঘটনা দেখব সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।’ তিনি বলেন, ‘আশা করছি ঈদকে ঘিরে আর বাজার অস্থির হওয়ার সুযোগ নেই। ঈদুল আজহায় যেসব নিত্যপণ্য বেশি কেনাবেচা হয় সেসব পণ্যের দাম এখন থেকেই বেড়ে যাচ্ছে।’ বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সারা দুনিয়াতেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তির দিকে। সেই প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে আমরা পণ্যের সংকট মোকাবিলায় কাজ করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঈদুল আজহাকে ঘিরে যেন কোনোভাবেই বাজার অস্থিতিশীল না হয় সেদিকে নজর রাখতে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বাণ্যিজ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া সরকারপ্রধান বাজার মনিটরিংয়ে তার কার্যালয়ে থেকেও নজরদারির জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে মাঠে সজাগ থাকতে বলেছেন।

বাংলাদেশ কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই যুদ্ধের কারণে ও করোনা মহামারীর চাপে দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগে আছে। আর এ ধরনের সুযোগ সবসময়ই ব্যবসায়ীরা নিয়ে থাকে। তারা আগের আমদানি করা পণ্যও যুদ্ধ পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে। এবারও ঈদের আগে এরকম ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আলোচনায় আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারও নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন নজদারিটা আরও বাড়াতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করে তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে এবং জনসমক্ষে তাদের নাম প্রকাশ করতে হবে।’