বাংলার বুলবুল সর্বহারা নজরুল|362596|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২ ০০:০০
বাংলার বুলবুল সর্বহারা নজরুল
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বাংলার বুলবুল সর্বহারা নজরুল

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে (১৮৯৯-১৯৭৬) সর্বহারার কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কেননা তার সাহিত্যে সমাজের সর্বহারা শ্রেণির মানুষের কথা ঠাঁই পেয়েছে, প্রতিফলিত হয়েছে তাদের জীবনদর্শন। বস্তুত বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যে নজরুলই এমন একজন বিরল ব্যক্তিত্ব যার লেখনীতে কুলি, মজুর, ভিখারী প্রমুখ নিপীড়িত অসহায় মানুষের কথা বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে বিপুলভাবে। মানবতাবাদের কবি নজরুল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের প্রতি ছিলেন বিশেষ শ্রদ্ধাশীল, বিশেষ করে নিগৃহীতজনদের প্রতি সবিশেষ সহানুভূতিশীল। তার রচনা পাঠ করলে একথা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

কিন্তু একথা চরম সত্য যে, এই সর্বহারার কবি নিজেই ছিলেন একজন সর্বহারা। সমাজের কাছ থেকে, পরিবেশের কাছ থেকে, নিয়তির কাছ থেকে যে সহানুভূতিশীলতা নিয়ে সুদীর্ঘ ৭৭টি বছর জীবন সংগ্রাম চালিয়ে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছেন তার সুষ্ঠু মূল্যায়ন করলে একথাই প্রতীয়মান হবে যে, তার ভাগ্যবিপর্যয় তাকে কত করুণ পরিস্থিতির শিকার হতে বাধ্য করেছিল। জীবনযুদ্ধের এই আত্মঘাতী সংগ্রামে তিলে তিলে দগ্ধ হতে হতে যিনি অবশেষে নিঃশেষ হলেন তিনি নজরুল ইসলাম। তার জীবন ইতিহাস একজন লাঞ্ছিত, ভাগ্যাহতের জীবন ইতিহাস।

সর্বহারা নজরুল জন্মেছিলেন এক দরিদ্র পরিবারে। সে পরিবারে ভাইবোন জন্মে কেউ বেশিদিন বাঁচতেন না। তার নাম তাই রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’ দুঃখের শিশু। নজরুলের এই বাল্যনামই তার সারা জীবনের করুণ ট্র্যাজেডির সার্থক পরিচয় বহন করে। দুঃখ-দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে যিনি কালাতিপাত করে গেলেন তার পক্ষেই বোধকরি একথা বলা সাজে, ‘হে দারিদ্র্য! তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দারিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।’ শৈশবকালে পিতাকে হারাতে হয়েছিল তাকে। দশ বছসর বয়সে জীবিকার্জনের জন্য মক্তবে শিক্ষকতা, গ্রামে মোল্লাগিরি ও মাজার শরিফের খাদেমগিরি গ্রহণ করতে হয়েছিল। মাঝে মধ্যে লেটোর দলের পালাগান রচনার কাজও তাকে করতে হয়। বলা হয়ে থাকে, নজরুলের দুরন্তপনা তার মনকে বিদ্যালয়ের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারেনি। এটাই যথাযথ কারণ নয়, দারুণ অর্থসংকটই এবং পারিবারিক খরচ সংকুলান করার কাজই তাকে শিক্ষায়তনে বিদ্যাচর্চার ভাগ্য থেকে বঞ্চিত করেছে। ১৯১১ সালে বর্ধমানের মাথরুন হাইস্কুলে তিনি অত্যন্ত স্বল্পকাল বিদ্যাভ্যাস করতে পেরেছিলেন। এর পরপরই আমরা তাকে জনৈক রেলওয়ে গার্ড সাহেবের বাড়িতে বাবুর্চিগিরি করতে দেখতে পাই। তাকে পাই হুগলীর এম, বখশের রুটির দোকানে মাত্র ৫ টাকা বেতনে চাকরি করতে। জীবিকার্জনের জন্য যাকে এত নিম্নমানের কাজে এত অল্প বয়সে নিয়োজিত থাকতে হয়েছিল, তার তৎকালীন কুলীন ভদ্রসমাজ চালিত শৌখিন বিদ্যায়তনে পাঠকার্য চালাবার অবসর কোথায়? ময়মনসিংহের কাজীর শিমলা গ্রামনিবাসী কাজী রফিজুল্লার বাড়িতে থেকে দরিরামপুর স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে অবৈতনিক ছাত্র হিসেবে পড়ার সৌভাগ্য তার হলেও তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। গৃহসন্ন্যাস, ভাগ্যতাড়িত এই হতভাগ্য ছেলেটার সারা শরীরে তখন প্রচ- আগুন। কোনো আদর-স্নেহ পারিবারিক গন্ডি থেকে নজরুল পাননি। পারিবারিক অর্থসংকট দূর করার জন্য তাকে কাজের চেষ্টা করতে হতো। আর্থিক দৈন্য এবং জীবিকার্জনের এক প্রবল তাড়না নজরুলকে ঘর থেকে বের করেছিল।

১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিকবৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন। হাবিলদার নজরুলের মনে এক নিদারুণ অশান্তি ছিল। স্বদেশ প্রেমিক হাবিলদার একথা ভেবে দুঃখ পেতেন যে, তিনি লড়ছেন বিদেশিশাসিত তার স্বদেশের সম্ভ্রম রক্ষায়। এ লড়াইয়ে লাভ? দেশকে কীভাবে মুক্ত করা যাবে এ চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মের সঙ্গে কর্মী নজরুলের এই মানসিক বিরোধই বাধ্য করেছিল তাকে এক হাতে কলম আর এক হাতে রাইফেল ধরতে। তিনি লিখতে শুরু করলেন। তার লেখা প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’। এটি মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র ১৩২৬ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। নজরুলের প্রথম সাহিত্যিক রচনা এই ‘মুক্তি’ কবিতাকে পেপার বাসকেট ঘুরে আসতে হয়েছিল। কবিতাটি প্রথম সম্পাদক সাহেবের মনঃপূত হয়নি। পরে পেপার বাসকেট থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ওটি ছাপানো হয়েছিল। ‘বাউ-েলের আত্মকাহিনী’কে নজরুলেরই আত্মকাহিনী বললে অত্যুক্তি হয় না। একটি অভিজাত পরিবারের তরুণীর সঙ্গে নিম্নপদস্থ সৈনিকের প্রেম রচনার স্বপ্ন নিছক অমূলক মাত্র। বলাবাহুল্য, নজরুলের জীবনটাই চিরকালের এই অব্যক্ত অসম্ভব প্রকাশের বেদনাকে সঙ্গী করেই গড়ে উঠেছে।

নজরুলের প্রথম রচনা ‘মুক্তি’ প্রকাশের মতো ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছিল তার পরবর্তীকালের অধিকাংশ সাহিত্যিক রচনাগুলোকে। ১৯২০ সালের এপ্রিল মাসে বাঙালি পল্টন থেকে ফিরে এসে নজরুল পুরোদমে লেখা শুরু করেন। ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই রোগাক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত এই ২৩টি বছর তিনি অবিরামভাবে লেখনী চালনা করেন। এই সীমাবদ্ধ সময়ের মধ্যে তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প, একাঙ্কিকা, নাটিকা, গানের স্বরলিপি, রাগপ্রধান গান। এই সময়ে তিনি বিদ্যুৎবেগে লেখনী চালিয়ে আমাদের যা দান করে গেছেন তার সবটিই আমাদের দ্বারে পৌঁছতে পারেনি। তার অনেক কবিতা, গান আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। সংগৃহীত হয়নি অনেক কিছুই। সমসাময়িক কালে অনেক স্বার্থন্বেষী ব্যক্তি তার লেখাকে নিজের নামে চালাতেও কসুর করেননি। নজরুলই এমন একজন কবি, যিনি কলম ধরলেই লিখতে পারতেন এবং যা একবার লিখতেন তা আর সংশোধন করতেন না। পথে-ঘাটে, যেখানে যে অবস্থায় থাকতেন, লিখতেন। যে চাইত তাকে লেখা দিতেন। তার এই সরল উদার ব্যস্ততার সুযোগ অনেকে পুরোপুরিভাবে নিতেন। প্রকাশকরা তার অগোচরে বেশি সংখ্যক বই ছাপিয়ে মুনাফা লুটতেন। বন্ধুমহল তাকে নিয়ে ফুর্তি করেছে। তার বইয়ের রয়্যালিটি অর্জিত টাকা বেপরোয়াভাবে খরচ করিয়েছেন, মজা লুটে খেয়েছেন অথচ কবিকে অধিকাংশ সময় উপোস থাকতে হতো। অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়েছে সে খোঁজখবর খুব কমসংখ্যক বন্ধুবান্ধবই রেখেছেন।

বাকরুদ্ধ নজরুলের ভাগ্যও সুপ্রসন্ন হয়নি। অনেক দুঃখভোগ করে শুশ্রুষার অভাবে, সুচিকিৎসার অভাবে তাকে নিদারুণ কষ্টভোগ করতে হয়েছে জীবনের শেষ ৩৪ বছরের বাকরুদ্ধ জীবনে। ১৯৫২ সালে নজরুল নিরাময় সমিতি নামে একটা ট্রাস্ট গঠিত হলেও অসুস্থ কবির পরিচর্যার এই ট্রাস্ট ব্যর্থই হয়েছিল বলা চলে। ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনাব হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেবের সুপারিশে সরকারও কবিকে ভাতা দিতেন। এই দুই সরকারের ভাতা যার সম্মিলিত পরিমাণ টাকা (প্রাথমিক কালে ১০০০ টাকার বেশি ছিল না) তার চিকিৎসার খরচ-পথ্যাদি ক্রয় ও যাবতীয় খরচ নির্বাহের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। প্রকাশকরা তাকে যে রয়্যালিটি দিতেন তা তার পুত্ররা উঠাতেন এবং সেগুলো কবির জন্য ব্যয় প্রসঙ্গে অনেক অভিযোগ বিভিন্ন সময় শোনা গেছে।

কবির ব্যক্তিগত জীবন প্রসঙ্গ নিয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কবি-সাহিত্যিকরা নানা রকম অভিযোগ তুলে তাকে আর্থিক কষ্টে ফেলে অসহায় করে তুলেছিলেন। তবু তিনি উভয় সম্প্রদায়ের মিলনের জন্য লিখেছেন। অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁকে নজরুল একবার লিখেছিলেন: ‘‘বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা বিরোধভাব প্রায়ই লক্ষ করা যায়। আমি এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রীতিভাব দেখিতে চাই। আর তাই আমি আমার রচনায় হিন্দু দেবদেবীর নাম ব্যবহার করি, আবার আরবি ফারসি শব্দও ব্যবহার করি। হিন্দু দেবদেবীর নাম দেখিয়ে মুসলমানদের এবং আরবি ফারসি শব্দ দেখিয়ে হিন্দুদের মনঃক্ষুণœ হওয়া উচিত নয়।’’

ভাগ্যবিড়ম্বিত কবি নজরুলের প্রথম বিবাহ-স্মৃতি ছিল দুঃখময়। তিনি হলেন অসহায় ভাগ্যের ও নিয়তির ক্রীড়নক। কুমিল্লার জনাব আকবর আলী খাঁর বাড়িতে অনুষ্ঠিত বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে নজরুল ইসলামকে লাঞ্ছিত হয়ে ফিরতে হয়েছিল, তারপর তাড়াহুড়া করেই বিয়ে হলো প্রমিলা সেনগুপ্তার সঙ্গে। এই বিবাহ ব্যাপারটিই হলো নজরুল জীবনের ট্র্যাজেডি। কবি লিখলেন, ‘সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে’। সারা জীবন এই মৃত্যুময় যন্ত্রণা নজরুলকে টেনেহিঁচড়ে বেড়িয়েছে। তবু দুই জাতির মিলনের জন্য তিনি কবিতা লিখেছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হিন্দু-মুসলমান মিলনের প্রচেষ্টাকারী এই মহাত্মার প্রচেষ্টাকে ভিন্ন অর্থে বহন করে তার প্রতিভাসূর্যকে মøান করতে চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। অথচ তিনিই প্রথম লিখেছিলেন ‘‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু- মোসলমান।’’

শুধু নজরুলের জীবন সংসারই অবহেলিত ছিল না, তার সাহিত্যের মূল্যায়নেও অবজ্ঞা প্রদর্শিত হয়ে আসছে। নজরুল সাহিত্যের একজন বিদগ্ধ সমালোচক দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘‘কমরেড মোজাফফর, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, সুফী জুলফিকার হায়দার নজরুলের শুধু স্মৃতিকথা লিখে গিয়েছেন, রচনাবলির মূল্যায়ন করেননি কেউ”। কথাটি চরম সত্য। এতদিন নজরুলকে নিয়ে যত বই বা আলোচনা লেখা হয়েছে, তা সবই তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, তার রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা প্রকাশই প্রাধান্য পেয়েছে সে সব লেখাতে। নজরুল সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়নি আজও। উদ্যোগ তেমন একটা গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। উভয় বাংলার নামমাত্র গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান তার নামে স্থাপিত হলেও এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠানই রয়ে গেছে। নজরুল সাহিত্যের প্রকৃতি, স্বরূপ, বিশেষত্ব নিরূপণে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি। বলাবাহুল্য, প্রকৃত নজরুলচর্চা আজও শুরু হয়নি। এখনো আমরা শুধু জয়ন্তী অনুষ্ঠানে তার সাহিত্যকে আবৃত্তি ও গান গেয়ে কোনো রকম দায় সারি। তার ভেতরে প্রবেশ করে মর্মোদ্ধারের কোনো প্রচেষ্টা তেমন শুরু করিনি।

নজরুল প্রায় চার হাজারের অধিক গানের রচয়িতা। কিন্তু এই গানগুলোর প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য সংকলন প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন সময় নজরুল গীতির সুরারোপে বিকৃতির অভিযোগ শোনা যায়। নজরুলগীতির স্থায়ী স্বরলিপি প্রণয়ন করা বাঞ্ছনীয়। নজরুলগীতির একনিষ্ঠ সাধক ফিরোজা বেগম ও অন্যদের সহযোগিতায় বিশ্বভারতী প্রকাশিত ‘স্বরবিতানের’ মতো নজরুলগীতির স্বরলিপি নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্র্রকাশ বাঞ্ছনীয় মনে হওয়ায় কাজ চলছে। আর এমনিভাবে তার বিরাট অবদানকে দিনে দিনে অবহেলার ও অবজ্ঞার হাত থেকে বাঁচাতে হবে।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান