ধর্মীয় জ্ঞানের বিষয়ে শৈথিল্য নয়|362597|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২ ০০:০০
ধর্মীয় জ্ঞানের বিষয়ে শৈথিল্য নয়
শাহীন হাসনাত

ধর্মীয় জ্ঞানের বিষয়ে শৈথিল্য নয়

এখন বাংলা ভাষায় ইসলাম তথা দ্বীন সম্পর্কে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। দ্বীন সম্পর্কে মানুষের জানার আগ্রহ বাড়ছে, নতুন-নতুন পাঠক সৃষ্টি হচ্ছে। বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা ছাড়াও নানা পর্যায়ে দ্বীনের আলোচনা হচ্ছে। ওয়াজ মাহফিল, তাবলিগ জামাত, মসজিদে জুমাপূর্ব আলোচনা, বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ও ঘরোয়া পরিবেশে ইসলাম শিক্ষার আয়োজনসহ পীরি-মুরিদির ধারায়ও দ্বীনের আলোচনা হচ্ছে। দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও বিস্তারে এগুলোর ভূমিকা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। এভাবে ইসলাম প্রচারে বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে, মানুষের ইমান-আকিদা, ইবাদত-বন্দেগি, আখলাক-চরিত্র তথা দ্বীনের সর্বাঙ্গনে ভয়াবহ জ্ঞানশূন্যতা দেখা দিত। কিন্তু উপরোক্ত বাস্তবতা নিয়ে তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা, এসব মাধ্যমে যারা দ্বীন শিখছে তারা সমাজের কত শতাংশ? যারা এখন পর্যন্ত এই শিক্ষার আওতায় আসেনি, তারা কত শতাংশ? এই পার্থক্যের প্রমাণ মেলে জুমার নামাজে, ঈদের মাঠে ও জানাজার সময়। এই তিন নামাজে অংশ নেওয়া মুসলমানরা পরিচয়ে ইসলাম ধরে রেখেছে বটে, তবে বলা চলে তারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না। আকিদা-বিশ্বাস নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, কোন কারণে ইমান নষ্ট হয়, তা তাদের ভাবনায়ও আসে না। অজু-গোসল, হালাল-হারাম প্রভৃতি বিষয়ে তাদের অজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এক কথায়, ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ বেখবর।

এর ভিন্নচিত্রও আছে, যারা কোনো না কোনোভাবে দ্বীনের পথে চলছে, দেখতে-শুনতে দ্বীনদার, নামাজ-রোজা করে, মসজিদে যাতায়াত আছে, তাবলিগ কিংবা কোনো পীরের মুরিদ দ্বীন ও শরিয়ত সম্পর্কে তাদেরও যে খুব জানাশোনা আছে, এমন নয়। এই শ্রেণির লোকেরা সুন্নত-বিদআত সম্পর্কে কিছুই জানে না। তাওহিদ ও শিরকের প্রভেদ সম্পর্কে সচেতন নয়। নিয়মিত তাসবিহ আদায় করে অথচ সহিহ-শুদ্ধভাবে নামাজ পড়তে জানে না, নামাজে পঠিত সুরা-কেরাত শুদ্ধ নয়। এমনও বহু মুসলমান আছে, সে নিয়মিত তাবলিগে যায়, গুরুত্ব দিয়ে নামাজ পড়ে অথচ সে জানে না, তার ওপর হজ ফরজ হয়ে আছে। এভাবে ধরে ধরে দ্বীন-ধর্ম বিষয়ে অজ্ঞতার ফিরিস্তি দিলে খতিয়ান অনেক লম্বা হবে। সারকথা, বর্তমানে দ্বীনদারদের বড় একটি অংশ পালনীয় ইসলাম সম্পর্কে জানে খুবই কম।

ইসলাম, ধর্মের বিধিবিধান ও পালনীয় ইসলাম সম্পর্কে এমন অজ্ঞতা এক কঠিন ব্যাধি। এই ব্যাধি নিরাময়ে দরকার সচেতনতা, ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি। অজ্ঞতা যে তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে, ইমান-আমল বরবাদ করে মানবিকতাকে ধ্বংস করছে সেই চেতনা ও অনুভূতি তাদের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। সেই সঙ্গে দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা নিরাময়ে আলেমদের কাছে দ্বীন ও শরিয়ত বিষয়ে জানতে চাওয়া, ইসলামবিষয়ক লেখা ও দ্বীনি রচনাবলি পাঠ এবং আলেম-উলামাদের সাহচর্য-সান্নিধ্য গ্রহণ করা।

আজকের লেখার উদ্দেশ্য মূলত দ্বীনি জ্ঞান আহরণের এই তিন মাধ্যম সম্পর্কে সামাজিক শৈথিল্য ও সীমালঙ্ঘনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ প্রসঙ্গে। প্রথমে আলোচনা করা যাক আলেমদের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করা সম্পর্কে। এ বিষয়ে কোরআন মাজিদে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমাদের জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস করো।’সুরা নাহল : ৪৩; সুরা আম্বিয়া : ৭ হাদিসে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘অজ্ঞতার দাওয়াই তো জিজ্ঞেস করা।’ সুনানে আবু দাউদ : ৩৩৬

দুঃখজনক বিষয় হলো, এ দাওয়া বর্তমান সময়ে চরমভাবে অবহেলিত। অধিকাংশ মানুষ তা প্রয়োগ করে না, আবার যারা প্রয়োগ করে তাদের অধিকাংশই ভুল ব্যবহার করে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে দুই রকম প্রান্তিকতা বিদ্যমান। হয় এর প্রতি শৈথিল্য করা হয়, নয়তো সীমালঙ্ঘন।

আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগি, অর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত লেনদেন, পারস্পরিক আচার-ব্যবহার ও আখলাক-চরিত্রসহ যাবতীয় বিষয়েই রয়েছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা। কিন্তু তা জানে কয় জন? যারা জানে না তাদেরই বা কয় জন এ সম্পর্কে জ্ঞানীজনদের জিজ্ঞেস করে? অধিকাংশই করে না। হয়তো একটা ভুল বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করছে, সেই বিশ্বাসের ওপর তার বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, তাও কাউকে জিজ্ঞেস করে না বিশ্বাসটি সঠিক কি-না। সেই বিশ্বাসটি শিরক ও কুফর পর্যায়েরও হতে পারে। একটু বিবেক-বুদ্ধি খাটালে সে সম্পর্কে অন্তরে খটকা লাগার কথা। তা সত্ত্বেও দেখা যায়, সেই বিশ্বাস নিয়ে কবরে যাচ্ছে, জীবনে একবার কারও কাছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার গরজবোধ করে না।

একজন নামাজি তার নামাজ কতটুকু সহিহ-শুদ্ধ হচ্ছে, তা কখনো খতিয়ে দেখে না। মসজিদে এসে দেখে ইমাম সাহেব রুকু থেকে উঠে সিজদায় যেতে উদ্যত। এক নামাজি নিজে-নিজে রুকু দিয়ে জামাতে শামিল হয়ে গেল এবং ইমামের সঙ্গে একত্রে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করল। আপনি তার পাশে নামাজ পড়েছেন। রুকু আপনিও পাননি। ফলে সালামের পর আপনি আরেক রাকাত নিজে-নিজে পড়ে নিলেন। ওই লোক পাশেই তা দেখছে। কিন্তু একটিবার জিজ্ঞেস করছে না, তার নামাজ হলো কি-না।

অনেক সম্পদশালী আছে, যারা নিজেরাই ফয়সালা নিয়ে নেয় তার ওপর জাকাত ফরজ হয়নি। কাউকে তার সম্পদের হিসাব দিয়ে জিজ্ঞেস করে না, তার ওপর জাকাত ফরজ কি-না। বাবা-মায়ের ইন্তিকাল হয়ে গেছে, উত্তরাধিকার সম্পদ কীভাবে বণ্টন করতে হবে তা কোনো আলেমকে জিজ্ঞেস করে না। এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে। তারা নিজ ইচ্ছামতো চলে, সমাজের প্রচলনই তাদের কাছে শেষ কথা। তাই কোনো আলেমকে জিজ্ঞেস করে না তাদের চলাটা ঠিক হচ্ছে কি-না। ফলে ভুলভ্রান্তি ও কুসংস্কারের ভেতরে থেকেও মনে করে, বেশ ধর্ম মেনে জীবনযাপন করছে। এই শ্রেণির লোকদের সম্পর্কে কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলো, আমি কি তোমাদের সংবাদ দেব কর্মে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের? তারা সে সব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা নষ্ট হয়ে যায়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা উত্তম কাজ করছে।’ সুরা কাহফ : ১০৩-১০৪

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক