মাঙ্কিপক্সের শঙ্কা|362620|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২ ০০:০০
মাঙ্কিপক্সের শঙ্কা
লে. কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ

মাঙ্কিপক্সের শঙ্কা

বেশ কিছুদিন যাবৎ সারা পৃথিবীর মানুষ জানতে পারছে মাঙ্কিপক্স নামের নতুন ভাইরাসের আবির্ভাবের কথা। ভাইরাসটি আমেরিকা, কানাডাসহ ইউরোপের কিছু মানুষকে আক্রান্ত করেছে। এজন্য মাঙ্কিপক্স নিয়ে আমাদের মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।

ভাইরাস এর পরিচয় : মাঙ্কিপক্স গুটি বসন্ত গোত্রের একটি ভাইরাস। একসময় গুটি বসন্ত সারা পৃথিবীর জন্য ছিল বিভীষিকাময় একটি রোগ। সফল টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ব থেকে গুটি বসন্ত বিদায় নিয়েছে। কিন্তু এই ভাইরাসের গোত্রভুক্ত অনেক ভাইরাস এখনো পৃথিবীতে বিদ্যমান। তার মধ্যে একটি মাঙ্কিপক্স। এটি বিরল প্রজাতির ভাইরাস। পশু থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এজন্য এ ভাইরাসকে বলা হয় জুনোটিক ভাইরাস।

ভাইরাসটি নতুন নয় মোটেও : একদল গবেষক ১৯৫৮ সালে সর্বপ্রথম গবেষণাগারে বানরের মধ্যে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। ১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোতে মানুষের দেহে এই রোগটি ধরা পড়ে। মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকায় এই রোগটির প্রাদুর্ভাব বিদ্যমান। এই ভাইরাসটি দুটো ধরন রয়েছে। একটি মধ্য আফ্রিকা (কঙ্গো) ধরন আরেকটি পশ্চিম আফ্রিকা ধরন। কঙ্গো ধরনটি সবচেয়ে মারাত্মক এবং বিস্তার ঘটে তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে।

লক্ষণ ও জটিলতা : এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার এক থেকে দুই সপ্তাহ পর উপসর্গ দেখা দেয়। উপসর্গগুলো হচ্ছে জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, সমস্ত শরীরে ব্যথা, পিঠে ব্যথা ইত্যাদি প্রাথমিক লক্ষণ। এর পাশাপাশি গলা ব্যথা, কাশি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে প্রধান লক্ষণ হচ্ছে পক্সের মতো সমস্ত শরীরে পানিপূর্ণ গুটি তৈরি হয়। জ্বর হওয়ার তিন দিনের মাথায় সাধারণত ত্বকে শুরু হয় এমন গুটি। প্রথমে মুখম-লের মধ্যে থাকলেও পরে সমস্ত শরীরে তা ছড়িয়ে পড়ে। এটি একসময় শুকিয়ে যায় এবং শরীর থেকে ঝরে পড়ে। এই রোগের আরেকটি প্রধান লক্ষণ হচ্ছে লসিকা গ্রন্থি খুলে যাওয়া। শরীরের বিভিন্ন স্থানের লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায় এই ভাইরাসটির আক্রমণে।

রোগটি দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষত যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল। কখনো এই ভাইরাসের আক্রমণে শরীর জুড়ে হাজার হাজার ছোট ছোট গুটির মতো তৈরি হতে পারে যা ত্বকের কার্যক্ষমতা বিকল করে দেয়। এ রোগে মৃত্যুহার শতকরা ৪-৬ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। মৃত্যু হার আরও বেশি বিশেষত যাদের বয়স কম।

এই ভাইরাসের কারণে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হতে পারে। মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার এই বিপর্যয়ের নাম হচ্ছে এনকেফালাইটিস। এছাড়া এই ভাইরাসের কারণে রক্ত সংক্রমিত হতে পারে ফলে সেফসিস দেখা দেয়। এছাড়া এটি নিউমোনিয়া তৈরি করতে পারে। এই ভাইরাস কখনো কর্নিয়াকে আক্রমণ করলে চোখের দৃষ্টিশক্তি বাধা দেয়।

কীভাবে বিস্তার লাভ করে মাঙ্কিপক্স : রোগীর সংস্পর্শে দীর্ঘ সময় থাকলে এই রোগটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াতে পারে। এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও এই রোগটি ছড়াতে পারে। রোগীর শরীরের বিভিন্ন ধরনের রসের মাধ্যমেও এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়াতে পারে।

চিকিৎসা : যে কোনো সাধারণ ভাইরাসের মতো মাঙ্কিপক্সের চিকিৎসা একই রকম। জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ, সর্দি-কাশি ইত্যাদি সঙ্গে থাকলে অবশ্যই অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হবে। রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার, পানীয় সরবরাহ করতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রতিরোধ : এই ভাইরাসের আক্রমণে মৃত প্রাণী থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। আক্রান্ত প্রাণীর বিছানা অথবা ব্যবহৃত দ্রব্য অন্যদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীকে অবশ্যই আলাদা করে রাখতে হবে। কোনো আক্রান্ত প্রাণী অথবা মানুষের সংস্পর্শে আসার পর অবশ্যই হাত উত্তমভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। সুরক্ষার জন্য মাস্ক, চশমা, গ্লাভস ইত্যাদি পরিধান করতে হবে।