শিশুখাদ্যেও লাগাম নেই|362675|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২ ০০:০০
শিশুখাদ্যেও লাগাম নেই
তাওসিফ মাইমুন

শিশুখাদ্যেও লাগাম নেই

মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্ববাজারে বাড়ছে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম। যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। গত কয়েক মাস ধরেই চাল, তেল, চিনি, ডালসহ বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সম্প্রতি এর প্রভাব পড়েছে শিশুখাদ্যেও। আমদানি করা গুঁড়া দুধ ও ফর্মুলার দামের উল্লম্ফন হয়েছে। আটা-ময়দার দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে সুজি ও কেক-বিস্কুটের দামেও। গেল কয়েক দিনের বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গুঁড়া দুধের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অভিভাবকরা।

তারা বলছেন, বড়দের ক্ষুধার জ¦ালা কোনো না কোনোভাবে মেটানো যায়। কিন্তু অবুঝ শিশুদের ক্ষুধার জ্বালা কী করে মেটাব? বর্তমান বাজার অনুযায়ী ব্যয় হিসাবে আমাদের আয় বাড়েনি। তার ওপর সবকিছুর দাম বাড়ছে দিন দিন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, শিশুদের খাদ্য সেরিলাক, ল্যাকটার প্যাকেটপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান বাজারে সেরিলাক বিক্রি হচ্ছে ৩৫০, ল্যাকটোজেন ৬৪৫, হরলিক্স ৫০০ গ্রামের বয়াম ২৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৬৭, ডানো, মার্কস, ডিপ্লোমাসহ প্রায় সবকটি কোম্পানির গুঁড়া দুধ ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭৯০ টাকা।

জানা যায়, গেল রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকে মিছরির মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে শিশু খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীন হতে থাকে। তবে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দফায় দফায় সাগু, সুজি, সেরিলাক, ল্যাকটোজেনের মূল্যবৃদ্ধি পেতে থাকে এবং গেল সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় ধরেই বাকি পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

রাজধানীর মহাখালীতে কোকোকোলা কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে আমদানি করা সব পণ্যের দাম বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি গুঁড়া দুধের দাম বেড়েছে ৪২-৪৫ টাকা যা খুচরা বাজারে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। হরলিক্স ৫০০ গ্রাম পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৩৬৫ টাকা। কিন্তু পণ্যের গায়ের মূল্য অনুযায়ী তা বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ টাকা।

এসব পণ্যের দাম বাড়ার কারণ জনতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আমাদের পণ্যে দাম বাড়া এবং কমার জন্য আমদানির খরচের ওপর নির্ভর করে। যেহেতু এখন টাকার থেকে ডলারের মূল্য বেশি তাই পণ্যের মূল্যটা বেড়েছে।

এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দিন দিন ব্যয় বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে অনেক বাবা সন্তানদের জন্য দুধ কিনতে এসে দাম শুনে হতাশ হয়ে পড়েন। এটা দেখতে আমাদের খারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। তবে এর পেছনে কোম্পানি এবং ডিলারদের কারসাজি রয়েছে।

বনানীর বিউটি ফুডের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, টাকার হিসেবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং কোম্পানির ডিলারদের ওপর নির্ভর করে পণ্যের মূল্য কেমন হবে। তবে ঈদের আগে থেকে সব পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু সব থেকে বেশি বেড়েছে গুঁড়া দুধে এবং দাম বাড়ার দিক থেকে এর পরের অবস্থানে রয়েছে সুজি।

গতকাল মুগদা বাজার থেকে আলামিন নামে এক বাবা তার শিশু সন্তানের জন্য দুধ কিনে বাসায় ফিরছিলেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি বাজারে এসেছি আমার এক বছর বয়সী মেয়ে মাইশার জন্য গুঁড়া দুধ কিনতে। টাকা না থাকায় গত সপ্তাহে আমি মেয়ের জন্য ২০০ গ্রাম দুধ কিনেছিলাম। ভাবলাম বেতনটা পেলেই তার জন্য পুরো এক মাসের খাবার কিনে নিয়ে যাব। কিন্তু বাজারে এসে হতাশা নিয়ে বাসায় ফিরতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আয় না বাড়লেও ঠিকই বিনিয়োগ করতে গিয়ে দেশের ব্যয় বেড়েছে। মানুষ কষ্ট করছে। তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না। আমরা তো অনেকটা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু করোনার কারণে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সও অনেক কমেছে। বিদেশ থেকে মানুষরা দেশে ফিরে আসছে। এসবের মধ্যে আমাদের অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি তো আছেই।

রোকেয়া আক্তার নামে এক নারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদের দুই সপ্তাহ পরও বাচ্চাদের খাবারের দাম ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকেই তাদের খাবারের মূল্যবৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গত তিন দিন আগেও সেরিলাক ৪০০ গ্রামের প্যাকেট কিনেছি ৩৩২ টাকায়। কিন্তু আজকের (বৃহস্পতিবার) বাজারে এসে দেখছি তা বিক্রি হচ্ছে ৩৭০ টাকায়। শুধু তাই নয়, হরলিক্স কিনতে এসে দেখছি তার দামও বেশি। এমন হলে আমাদের চলা মুশকিল হয়ে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, আমার বাচ্চার বাবা একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি মাসে বেতন যা পান তা দিয়ে এক কেজির কৌটা ডানো দুধ কিনেছেন ৭৪০ টাকায়। সেই দুধের দাম বেড়ে ৭৯০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

গত ২৩ মে থেকে সেরিলাক, ল্যাকটোজেন, হরলিক্সসহ অন্তত পাঁচটি শিশুখাদ্যের মূল্য বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা দোকানে সেরিলাক বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ যা আগে বিক্রি হতো ৩২৮ টাকা, ল্যাকটোজেন বিক্রি হচ্ছে ৬৪২ যা আগে বিক্রি হতো ৬১৫ টাকা, ৫০০ গ্রাম তীরের সুজি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা যা আগে বিক্রি হতো ৩৬ টাকা, সাগু কেজি ১৫০, আগে ছিল ১২০ টাকা।

এছাড়া প্রতিটি চকলেট আইটেমে ২ থেকে ৩ টাকা দাম বেড়েছে। কোকাকোলা কোম্পানির মাজোরিকো এ বক্স বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা যা আগে বিক্রি হতো ৪২০ টাকায়। ডানো এক কেজি ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৭৯০ টাকায়। আগে ছিল ৭৪০ টাকা।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ডলারের দাম বাড়াতে বাজারে জিনিসপত্রের কিছুটা দাম বেড়েছে। তবে এর বাইরে যেসব ব্যবসায়ী দাম কারসাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহ থেকে আমাদের অভিযান শুরু হবে।