সম্মেলন পেছাতেই ছাত্রলীগ বেপরোয়া!|362685|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২ ০০:০০
সম্মেলন পেছাতেই ছাত্রলীগ বেপরোয়া!
পাভেল হায়দার চৌধুরী

সম্মেলন পেছাতেই ছাত্রলীগ বেপরোয়া!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) সারা দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বেপরোয়া হয়ে ওঠাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন সংগঠনের বড় অংশের নেতারা। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সম্মেলন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সংগঠনের শীর্ষ নেতারা নিজেরাই অস্থিরতা তৈরি করছেন।

ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ অস্থির অবস্থা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে মঙ্গলবার সকালে ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। মিছিল নিয়ে সেখানে যাওয়ার পথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এরপর দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বুধবার ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। তারা ছাত্রদলকে প্রতিরোধের ঘোষণা দেয়। গতকাল বৃহস্পতিবার ছাত্রদল হাইকোর্ট মোড় থেকে মিছিল নিয়ে দোয়েল চত্বরের দিকে অগ্রসর হলে ছাত্রলীগের বাধার মুখে পড়ে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে গত সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। একইদিন সিলেট নগরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়।

বিরোধী দলের মিছিল-সমাবেশে বাধা দেওয়া হবে না বলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সপ্তাহ তিনেক আগে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। সে কারণে হঠাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে এমন অস্থির অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছাত্রলীগ কেন এমন মারমুখী হয়ে উঠল সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মধ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল হয়ে উঠল কেন এই নিয়ে চলছে আলোচনা।

ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত দিনগুলোতে দেখা গেছে, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আওয়াজ উঠলে কমিটির শীর্ষ নেতারা এমন অস্থিরতা তৈরি করেন। যাতে সম্মেলন পিছিয়ে গেলে তারা আরও কিছুদিন নেতৃত্বে থাকতে পারেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকেও তারা এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন, টিএসসিসহ ক্যাম্পাস জুড়েই এমন আলোচনা চলছে।

ছাত্রলীগের ওই নেতারা বলছেন, সংগঠনের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য এখন সম্মেলন চাইছেন না। তাই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে অস্থির পরিস্থিতির অজুহাত তুলে সম্মেলন ঠেকিয়ে রাখতে চান। এতে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতারও যোগসাজশ রয়েছে বলে দাবি করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ওই নেতারা।

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ দুই বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোকে সেপ্টেম্বরের আগেই সম্মেলন করার জন্য বলা হয়েছে।

সংগঠনটির দুই সহসভাপতি ও সম্পাদকম-লীর তিন সদস্য দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ছাত্রদলের ওপর বেপরোয়া হামলার পেছনে কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ছাত্রদল নেতা সাইফ মাহমুদ জুয়েলের কটূক্তির বিষয়টিকে সামনে আনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘টুস’ করে ফেলে দেওয়া নিয়ে যে বক্তব্য দেন তার প্রতিবাদে গত ২২ মে ছাত্রদল বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সেখানে জুয়েল প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করে সে্লাগান দেন, ‘মুখের ভাষা শালীন করো নইলে তুমি গদি ছাড়ো’। তার এমন সে্লাগানের প্রতিবাদ জানিয়ে ছাত্রলীগ জুয়েলকে হুঁশিয়ার করে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তা না হলে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করে দেয়। ছাত্রদল বক্তব্য প্রত্যাহার না করায় মঙ্গলবার ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ।

তবে ছাত্রলীগের ওই নেতারা প্রশ্ন তুলে বলেন, জয়-লেখকের মধ্যে অন্য ভাবনা-চিন্তা না থাকলে কটূক্তির ইস্যুটি নিয়ে সভা করে ছাত্রদলকে প্রতিহত করার ঘোষণা কেন তারা দিচ্ছেন না। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজস্ব ফোরামের সভা না ডাকায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বের বড় অংশই সংগঠনের নেতাকর্মীদের এমন বেপরোয়া কর্মকা-কে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের এক যুগ্ম সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগ সভাপতি জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখকের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে ছাত্রদল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সম্পর্ক রয়েছে। ওই সম্পর্কের কারণেই ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছাত্রদলের নেতারা ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেছেন। তিনি বলেন, জয়-লেখক তো ক্যাম্পাসে নিয়মিত থাকেনই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও অনিয়মিত। সে কারণে ক্যাম্পাসে অবস্থান মজবুত করার সুযোগ পাচ্ছে ছাত্রদল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তি করার সাহস পেয়েছে।

ছাত্রলীগের এই যুগ্ম সম্পাদক মনে করছেন, সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব আগে থেকে সাবধান হলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তিনি বলেন, এখন সম্মেলন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ওঠায় পরিকল্পিতভাবেই অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তবে ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম এ সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বিন সাত্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সহাবস্থানের রাজনীতি করে আসছিলাম। কিন্তু আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তি করা দেশের ছাত্রসমাজ মেনে নিতে পারে না। তাই নির্দেশনা ছাড়াই ছাত্রদল প্রতিরোধে ক্যাম্পাসসহ সারা দেশে ছাত্রলীগ মাঠে নেমেছে।’

ছাত্রলীগের সহসভাপতি মাযহার শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জুয়েলের কটূক্তি আমরা মেনে নিতে পারিনি বলেই প্রতিরোধ করতে নেমেছি।’ তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা ছাড়াই ছাত্রদলকে প্রতিরোধ চলছে সারা দেশে। মাযহার বলেন, ‘সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে কখনোই আমাদের সাধারণ সভা, নিয়মিত সভা ও জরুরি সভা কিছুই হয় না। ফলে এ ইস্যুটি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কিছু করা হয়ে ওঠেনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদলের রাজনীতিই সন্ত্রাসের রাজনীতি। দেশে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন অর্জনগুলো আসতে শুরু করেছে যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল তখন ছাত্রদল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করে তারা তাদের চরিত্র উন্মোচন করছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার সব ছাত্র সংগঠন ও ছাত্রসমাজ ছাত্রদলকে মোকাবিলা করবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদল শান্ত ক্যাম্পাসকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। ছাত্রলীগ ছাত্রসমাজকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করছে। আমরা সহাবস্থান চাই। কিন্তু ছাত্রদল সেটিকে দুর্বলতা মনে করে অস্থিরতার সৃষ্টি করতে চায়।