প্রভাবশালীদের ‘জোড়া’ প্লট বাতিলে পদক্ষেপ নেই|365612|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ জুন, ২০২২ ০০:০০
প্রভাবশালীদের ‘জোড়া’ প্লট বাতিলে পদক্ষেপ নেই
তোফাজ্জল হোসেন রুবেল

প্রভাবশালীদের ‘জোড়া’ প্লট বাতিলে পদক্ষেপ নেই

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দ নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করা প্রভাবশালী যেসব ব্যক্তি নিজের ও স্ত্রীর নামে বা পোষ্যের নামে প্লট বরাদ্দ নিয়েছে তাদের নিয়ে বিপাকে রাজউক। তারা যেমন প্লট ছাড়তে নারাজ তেমনি রাজউকের পক্ষ থেকেও তেমন জোরালো পদক্ষেপ নেই।

হলফনামায় তথ্য গোপন করে ‘জোড়া’ প্লট নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, আমলা ও পেশাজীবী নেতাই বেশি।

রাজউকের আইন অনুযায়ী প্লট বাতিলের কাজ চলমান থাকলেও কয়েক প্রভাবশালীর প্লট এখনো বাতিল করা হয়নি। এরমধ্যে কারও কারও প্লট বাতিলের বিষয়টি নিয়ে রাজউকের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বোর্ড সভার কার্যসূচিতে থাকলেও তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয় বলে রাজউক সূত্রে জানা গেছে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারায় একটি বড় আকারের প্লট বরাদ্দ নেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এ প্লটটি বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীকালে ভবন করেন, যার নাম ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’। এরশাদের এ প্লটটি রেখেই তার স্ত্রী রওশন এরশাদ ২০১৭ সালের দিকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আবেদন করে সাড়ে ৭ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন। পূর্বাচলে এ প্লটটির রাজউকের মূল্য ২০ লাখ টাকা হলেও এর বাজার মূল্য আছে কমবেশি ৪-৫ কোটি টাকা। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ রাজউক থেকে এ প্লটটি বরাদ্দ পাওয়ার আগেই একটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নিয়মমাফিক তিনি তার স্বামী, সন্তান বা পোষ্য কারও নামে প্লট পাননি বলে হলফনামা জমা দেন।

সাবেক মুক্তিযোদ্ধা প্রতিমন্ত্রী এবিএম তাজুল ইসলামের গুলশানে একটি প্লট রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য ২০১৯ সালের দিকে ১০ কাঠার আরেকটি প্লট বরাদ্দ নেন। রাজউকের বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী এ প্লটটির দাম ২৫ লাখ টাকা। এটির বাজার মূল্য রয়েছে কমবেশি ৬-৭ কোটি টাকা। বিধি অনুযায়ী, তিনিও হলফনামায় বলেছেন তার রাজউকে আর কোনো প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়নি। আরেক সাবেক আমলা ও বর্তমান সংসদ সদস্যের পূর্বাচলে একটি প্লট রয়েছে। আবার তার স্ত্রী যিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক, তার নামেও রাজউকের উত্তরা প্রকল্পে প্লট রয়েছে।

রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, সংস্থার সাবেক রাজউক চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ উত্তরা প্রকল্প থেকে একটি ফ্ল্যাট নেওয়ার পর পরবর্তীকালে পূর্বাচল থেকে আরও ১০ কাঠা আয়তনের প্লটও বরাদ্দ নিয়েছেন। ডা. কাজী নূর আফফীনা সাড়ে ৭ কাঠা আয়তনের একটি প্লট নেন। আর তার স্বামী মো. শামসুল আলমও ৫ কাঠা আয়তনের আরেকটি প্লট নেন। ডা. মো. জহিরুল ইসলাম ৩ কাঠা আয়তনের একটি প্লট নেন। তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগমও আরেকটি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। শওকত আলী মোল্লা নামে এক ব্যক্তি ৩ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন। আর তার স্ত্রী রেহেনা আক্তারও পূর্বাচলে আরেকটি প্লট বরাদ্দ পান।

রাজউকের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজউক থেকে এমন প্লট গ্রহীতাদের একটি রেখে অন্যটি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হলে বেশ সাড়া পড়ে। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আমলা ও বিভিন্ন প্রভাবশালী পেশাজীবী সংগঠনের লোকজন প্লট ছাড়তে নারাজ। একজন সংসদ সদস্য তিনি নিজে ও তার স্ত্রীর নামে দুটি প্লট নিয়েছেন। তার একটি প্লট ছাড়তে বলা হলেও তিনি রাজউককে সহযোগিতা করছেন না। রাজউকের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করেও শেষ পর্যন্ত বাতিল করা যায়নি। যদিও ইতিমধ্যে এমন অভিযোগ বিপুলসংখ্যক বরাদ্দ বাতিল করেছে রাজউক। এখন প্রভাবশালীদের কিছু বিষয় নিয়ে রাজউক বিপাকে রয়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান এবিএম আমীন উল্লাহ নূরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের অনেকগুলো আবাসিক প্লট প্রকল্প আছে। সেখানে অনেকেই তথ্য গোপন করে অথবা অসত্য অঙ্গীকারনামা দিয়ে একাধিক প্লট নিয়েছেন। সেই সময়ে রাজউকের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ ছিল না। এখন আমরা তা আধুনিক করেছি। এখন ধীরে ধীরে অনেকেই ‘ধরা খাচ্ছে’। যাদের এমন বিষয় সামনে আসছে তাই বাতিল করা হচ্ছে। কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’

রাজউকের কর্মকর্তারা বলেন, রাজউক থেকে একটি প্লট বরাদ্দ পেতে মানুষের আগ্রহ থাকে অনেক। প্লটের স্বল্পতার কারণে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তি এ সুবিধা পেয়ে থাকলেও প্লট বরাদ্দ পান না এমন সংখ্যাই বেশি। বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা কিছু শর্ত মেনে নিয়ে হলফনামা দেন। এরমধ্যে স্বামী/স্ত্রী বা পোষ্যদের কারও নামে রাজউকের প্লট পায়নি এমন অঙ্গীকারও থাকে।

তারা বলছেন, হলফনামা মিথ্যা তথ্য দিয়ে একাধিক প্লট নেওয়ার ঘটনা যাচাই-বাছাইয়ে ঘাটতি রয়েছে। রাজউক এমআইএস (যেখানে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়) শাখার দুর্বলতার কারণে ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক প্লট এভাবে হাতছাড়া হয়েছে। এখন সংস্থাটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জোড়া প্লট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এর আগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্লট বাতিল, জমা দেওয়া সব অর্থ বাজেয়াপ্ত ও প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব বাস্তবায়ন হয়নি।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, একজন বরাদ্দগ্রহীতা দুবার হলফনামা জমা দেন। প্রথমে আবেদন করার সময়, অন্যটি বরাদ্দ পাওয়ার পর কিস্তির টাকা দিয়ে লিজ দলিল গ্রহণ করার সময়। স্ট্যাম্পে দেওয়া আবেদনকারী এ হলফনামায় উল্লেখ করেন, রাজউকের কোথাও নিজ নামে বা পোষ্যদের নামে আবাসিক জমি বা বাড়ি আগের ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) অথবা কোনো সরকারি আধাসরকারি সংস্থা থেকে এই হলফনামা দেওয়ার তারিখ পর্যন্ত বরাদ্দ বা লিজ দেওয়া হয়নি। আরও উল্লেখ করতে হয়, বরাদ্দ করা এই জমির লিজ দলিল নিবন্ধন হওয়ার পর, এমনকি প্লটে ভবন করার পরেও যদি হলফনামায় দেওয়া তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয় বা কোনো তথ্য গোপন বা বিকৃত করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে রাজউক ওই প্লটের বরাদ্দ বা লিজ বাতিল করবে। এ ছাড়া জমা দেওয়া টাকা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে এবং প্লটে ভবন হয়ে গেলে সেটা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই রাজউক নিয়ে নিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ বিষয়ে কোনো আদালতের আশ্রয় নেবে না।

রাজউকের সংশ্লিষ্ট আরও বলেন, তথ্য গোপন করে যারা স্বামী/স্ত্রী বা পোষ্যদের নামে একাধিক প্লট বরাদ্দ নিয়েছে তাদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে ডিআইটি (এলটমেন্ট ল্যান্ড) রুলস ১৯৬৯-এর ৯ ধারায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বলা আছে। সেই আইনের বলেই রাজউক বোর্ড সভায় বেআইনিভাবে নেওয়া একাধিক প্লটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

রাজউক পরিচালক মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘একাধিক প্লট বাতিলের বিষয়ে রাজউক কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে স্বামী-স্ত্রী বা তাদের পোষ্যদের নামে থাকা ১৫০-২০০ মতো প্লট বাতিল করে কর্তৃপক্ষের বরাবরে আনা হয়েছে। সব বাতিল করতে পারলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছিল। এরপরও যারা সাড়া দেয়নি তা আমরা খুঁজে বের করছি।’