পদ্মায় পদ্ম এবং পদ্য|367259|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ জুন, ২০২২ ০০:০০
পদ্মায় পদ্ম এবং পদ্য
মোস্তফা মামুন

পদ্মায় পদ্ম এবং পদ্য

পদ্মার সঙ্গে প্রথম সম্পর্কটা বিরক্তির। ফরিদপুর যাব, সেখানে খেলা শুরু হয়ে গেছে, অফিস থেকে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে একটু দেরি হওয়াতে রওনা দিয়েছি খেলার দিন সকালে। ১১০-১২ কিলোমিটার দূরত্বের ফরিদপুর পৌঁছতে ঘণ্টা দুয়েকের বেশি লাগার কথা। লাগল ৫ ঘণ্টা। কারণ, পদ্মা। ফেরির দেরিতে যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে খেলা এতখানি গড়িয়ে গেছে যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানদের অনেকেই আউট। রাগে মাথা গরম হয়ে গেল। পদ্মা...। ঐ পদ্মার জন্য...। যদি ফেরিতে না আটকাতাম। এবং তখন এক আধবারের জন্য মনে হলো, যদি একটা সেতু থাকত...যদি একটা সেতু হতো...। তাহলে তো কয়েক ঘণ্টার বদলে কয়েক মিনিট। মনে এলো বটে তবে মনে থাকল না। সেতু সেই ১৯৯৯ সালে এমন দূর আকাশের কল্পনা যে স্বপ্ন দেখতে হলে পাগল হতে হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। বয়সটা পাগলামিরই। তবু এতটা পাগল হওয়া যায় না যে পদ্মায় সেতুর স্বপ্ন দেখব। লোকে হাসবে। কা-জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তুলনায় অনেক সহজ যমুনা সেতু করতেই জান বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। সিনেমা হলে, রেস্তোরাঁর খাবারে, ট্রেনের টিকিটে সারচার্জ দিতে দিতে জেনেছি তেমন সেতু হতে হলে দেশের সবার পকেট থেকে বছরের পর বছর টাকা নিতে হয়। একবার নেওয়া যায়। বারবার নয়। অতএব.. নো পদ্মা সেতু। বরং ফেরার সময় ফেরিভাগ্য যেন প্রসন্ন হয় সেটাই ভাবি।

পদ্মা নিয়ে দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটা বিদেশভিত্তিক। কলকাতার আবেগে নদীর অনেক গুরুত্ব। গঙ্গার ধারে বিষণœ নায়কের বসে থাকার কাহিনী গল্প-উপন্যাসে এত এত পড়েছি যে গঙ্গা না দেখেই চেনা হয়ে গিয়েছিল। প্রথমবার গঙ্গা দেখে এমন হতাশা। যাই হোক, সে অন্য গল্প। আরেক সময় করা যাবে। আসল গল্পটা আমাদের এক বন্ধুর। সে কলকাতা যাতায়াত করে সেখানকার গণ্যমান্যদের সঙ্গে বিশাল খাতির করে ফেলল। যায়, ফিরে আসে আর বলে, অমুক দাদার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তমুক দাদা তো ছাড়তেই চাইছিলেন না। অমুক বৌঠান তো বললেন, এবার তোমাকে ছাড়ছিই না। এসব দাদারা তখন আমাদের কাছে নায়ক। একবার দেখতে পেলেই বর্তে যাই আর তারা কি না আমাদের সাদামাটা বন্ধুকে বাড়িতে গেলে ছাড়তেই চান না। বৌদি নিজের হাতে কফি বানিয়ে খাওয়ান। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, মনে করলাম, গুল মারছে।

বন্ধুটি বলল, ‘গুল নয়, একশভাগ সত্য।’

‘প্রমাণ?’

প্রমাণ হাজির করল। তাদের নিজের হাতে লেখা, প্রিয় অমুককে....ভালোবাসার অমুককে।

দমে গিয়ে সবার মন খারাপ। বন্ধুদের কেউ খুব বেশিদূর এগিয়ে গেলে মন খারাপ স্বাভাবিক!

সে দয়াপরবশ হয়ে বলল, ‘তোদের পক্ষেও এই খাতির তৈরি সম্ভব’

‘সম্ভব! কীভাবে?’

‘ম্যাজিকটা জানতে হবে।’

‘কী ম্যাজিক?’

‘পদ্মার ম্যাজিক।’

‘মানে কী?’

‘ইলিশ নিয়ে যেতে হবে। আর বলতে হবে, পদ্মার ইলিশ। ব্যস, গলায় গলায় খাতির হয়ে যাবে। একেবারে বৌদির নিজ হাতে বানানো চা...’

বৌদির নিজ হাতে বানানো চা পর্যন্ত যাওয়ার পরীক্ষায় নামিনি। তবে ব্যাপারটা মনে হয় সত্যি। পদ্মার ইলিশ তো দেখি, আজকাল কূটনৈতিক সম্পর্কের সূত্রও।

তাছাড়া কলকাতায় পত্রিকা বা টেলিভিশনে দেখবেন, বাংলাদেশের প্রতিশব্দ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, পদ্মাপাড়। প্রথমবার কলকাতায় এক সাংবাদিক বন্ধু আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এ হচ্ছে অমুক। বাংলাদেশ থেকে এসেছে।’

‘বাংলাদেশ! পদ্মাপাড়!’

এবং তারপর দেখা হলেই নাম আড়াল হয়ে আমি হয়ে উঠলাম পদ্মাপাড়। দেখা হলেই চিৎকার, ‘কী হে পদ্মাপাড়। কেমন আছ?’

পদ্মা আমাদের পরিচয়ের এমন সূচক জেনে বিস্মিত হয়েছিলাম। কই দেশে তো আমরা নিজেদের পদ্মাপাড়ের মনে করি না। বিদেশে গিয়ে সব ছাপিয়ে আমরা পদ্মাপাড়ের মানুষ। জানলাম, পদ্মার সম্মান দেশের চেয়ে বিদেশে বেশি। এবং এখন, এই এত বছর পর দেখছি পদ্মা আসলে জাতীয়-আন্তর্জাতিক সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে নিয়ে চলছে অনন্য উচ্চতায়। সেতুগত অর্জনে আমরা শিহরিত। সেই শিহরণে দুনিয়া কম্পিত। একটা সেতু ঘিরে একটা দেশ আর কবে কোথায় এমন একীভূত হয়েছে। জানতাম, নদীর স্রোতে সব ভেসে যায়। এখন দেখছি নদীর বুকে ভালোবাসার স্তম্ভ তৈরি হয়ে যায়। অবাধ্য পানিও পোষ মেনে যায় স্বপ্নের শক্তিতে।

পানির প্রাণ নেই। কিন্তু ওটা তো নিরেট বিজ্ঞানের কথা, পরশু সেতুর শুরুর ক্ষণে সে-ও সম্ভবত জীবন উৎসবে মিলতে চাইবে। বুকের ওপর দাঁড়ানো সেতুটাকে উপদ্রব মনে হওয়ার কথা। কিন্তু মনে হবে ঐশ্বর্য। পদ্মাকে ভালোবাসার অলংকারে ভরিয়ে আর একদিন পর নদী, সেতু আর মানুষে মিলে আমাদের আকাশযাত্রা।

আবেগ থাক। রাজনীতি আসুক। সেখানে তিক্ততা আর আত্মবিধ্বংসী সব ছবি থিকথিক করছে। দেশের কেউ কেউ বিরুদ্ধে লেগে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। তাদের প্রভাবে হোক এবং আমাদের অগ্রযাত্রার ঈর্ষায় বেঁকে বসল বিদেশিরা, বিশেষত বিশ্বব্যাংক। ওরা বেঁকে বসে। আমরা আরও শক্ত হই। তখন খুব বিপন্ন লেগেছিল কিন্তু আজ মনে হয়, হাঁটা শেখার জন্য যেমন হোঁচট লাগে তেমনি এই রাজনীতি আর কূটনীতির চোটটা আসলে আত্মশক্তি জাগানোর জোর এনে দিল। ওরা সরে গেল বলেই নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করার প্রয়োজন পড়ল। প্রয়োজন জাগাল ঘুমন্ত শক্তিকে। আর দেখাল নেত্রী শেখ হাসিনার অবিচলতাকে। ও, হ্যাঁ, পদ্মা সেতু হওয়ার আগেই সেই সেতুতে চড়েছেন তিনি। আমরা সেতু দিয়ে এপার-ওপার করব, মাওয়া থেকে যাব জাজিরা কিন্তু তিনি সেতু তৈরির আগেই তাতে চড়ে গেলেন অসীম উচ্চতায়। নেত্রী থেকে হয়ে উঠলেন রাষ্ট্রনায়ক।

নেতারা যুগে যুগে এভাবেই রাষ্ট্রনায়ক হন, যখন হতবুদ্ধি জাতিকে দেন দিকের দেখা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিপন্ন ইংলিশদের পথ দেখিয়ে চার্চিল হয়ে আছেন মহানায়ক, কিউবাকে ন্যায্যতার পথ দেখিয়ে নায়ক ক্যাস্ত্রো কিংবা কামাল আতাতুর্ক তুরস্ককে সংস্কারের নতুন রূপরেখায় এনে। তাদের লড়তে হয়েছে। যুদ্ধ করতে হয়েছে। আমাদের নেত্রী একটা গুলি খরচ করলেন না। দিব্যি ‘মহাযুদ্ধ’ জিতে গেলেন। আত্মমর্যাদার শক্তি বুলেট-বোমার চেয়েও শক্তিধর, জানলাম। 

রাজনীতি যাক। আসুক কূটনীতি। সেখানেও কি পরশু থেকে আমরা আরেকটু বুক চিতিয়ে দাঁড়াব না! ধরা যাক, কোনো জটিল দরকষাকষি চলছে। ঐ পক্ষ বাংলাদেশকে ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না। ওদের উপদেষ্টা কানে কানে নেতাকে বলবেন, ‘বেশি বাড়াবাড়ির দরকার নেই। আমরা ওদের দাবি না মানলে যা করার নিজেরাই করে ফেলবে।’ ‘কীভাবে করবে?’ ‘ঐ যে পদ্মা সেতুর মতো।’

পদ্মার একটা সেতুই অত উচ্চতার সোপান। একটা ঢিলে কত দিকে যে কত কিছু হয়ে গেল তার কিছুটা বুঝতে পারছি। বাকিটা বুঝব আগামীতে। সময় যাবে। সেতুর বয়স বাড়বে। কিন্তু রং হারাবে না। চিরনবীনার মতোই বয়ে যাবে। রয়ে যাবে। এ যে একটা জাতির চিরকালীন শক্তির প্রকাশ। 

২১ জেলার মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব। ফেরিতে অনিশ্চিত অপেক্ষা নেই। নিমিষেই ঢাকায়। অর্থনীতির চাকাও ঘুরবে নতুন শক্তি নিয়ে। জিডিপিতে অগ্রগতি অবশ্যম্ভাবী। এসবে মানুষের লাভ। দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়ে জীবনমান বাড়াবে। এসব লাভালাভের অঙ্ক থাকবে। যেমন থাকবে কিছু প্রশ্নও। যতটা ব্যয় হয়েছে এটা বেশি কি না বাজারের হিসাবে, বিপক্ষকে বারবার বিদ্ধ না করে ঐক্যবদ্ধ করাটাই ভালো হতো হয়তো। আবার সেসব তর্কে এ-ও জানা যাচ্ছে যে এই সেতুর স্বপ্ন ছিল সবারই। প্রথমবারের আওয়ামী লীগ সরকার যে অনেক ধাপ এগিয়ে ছিল সেই ইতিহাস যেমন হারানো স্মৃতি থেকে উঠে আসছে তেমনি আসছে অন্য দুটো সরকারেরও ধারা ধরে রাখার চেষ্টাও। আর তখন বিভেদ-ভেদাভেদ এটা আরেকবার হয়ে ওঠে জাতীয় প্রচেষ্টার ছবি। রাজনীতির পঙ্কিলতায় বিভক্ত বাংলাদেশ যে স্বপ্নের পথে কোথাও কোথাও একীভূত সেটা দেখাও স্বস্তির। তিক্ততম বিরোধের ভেতরও আবছা একটা ঐক্য। আর তখন ইট-কংক্রিটের আবরণ পেরিয়ে জড় সেতুটায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় যেন। হয়ে ওঠে আজকের এবং আগামীর বাংলাদেশ। বলছিলাম না, পদ্মায় ভালোবাসার অলংকার পরিয়ে কয়েক কিলোমিটারের সেতুতে করে আমাদের আকাশযাত্রা।

আমাদের এক বন্ধুর নাম ছিল পদ্মা। বাংলা স্যার বলতেন, পদ্ম। প্রথমে ভাবতাম ভুল করে। পরে দেখলাম, ইচ্ছা করে। জিজ্ঞেস করা হলো একদিন। স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘পদ্মা তো নদী। বয়ে চলে। পদ্ম ফুটে থাকে।’

‘তাই বলে পদ্মা পদ্ম হয়ে যাবে?’

‘পদ্যও হতে পারে। ছন্দ-আনন্দ সব আছে।’

স্যার নেই। বন্ধুরাও সব হারিয়ে গেছি নানা দিকে। আজ মনে হচ্ছে, সবাই-সব একাকার হচ্ছে। পদ্মায় ফুটছে পদ্ম। পদ্মায় তৈরি হচ্ছে পদ্য।

লেখক সাংবাদিক

[email protected]