logo
আপডেট : ৩০ জুন, ২০২২ ০০:০০
সারা দেশে শাস্তির দাবি অব্যাহত
নিজস্ব প্রতিবেদক

সারা দেশে শাস্তির দাবি অব্যাহত

নড়াইলে এক শিক্ষককে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানো এবং ঢাকার সাভারে আরেক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল বুধবার শিক্ষক হত্যা ও নির্যাতনকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ১৪টি জাতীয় সাংস্কৃতিক ফেডারেশন। একই দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশ করেছে বামপন্থি ছাত্রসংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল। এ ছাড়া নড়াইলে প্রতিবাদ সভা করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।

এদিকে নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে দায়িত্বহীন বলে উল্লেখ করেছে।

গতকাল ১৪টি জাতীয় সাংস্কৃতিক ফেডারেশনের দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে সাভারে শিক্ষক হত্যা, নড়াইলে অধ্যক্ষ নির্যাতনসহ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষকদের অপমান অপদস্থের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এসব ঘটনার নেপথ্যে মদদদাতাদেরও শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার অবক্ষয় রোধে সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

বিবৃতিদাতা ১৪ সাংস্কৃতিক ফেডারেশনের মধ্যে রয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, কবিতা পরিষদ, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, পথনাটক পরিষদ, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, নৃত্যশিল্পী সংস্থা, চারুশিল্পী সংসদ, সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র, যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ, গ্রাম থিয়েটার, শিশু সংগঠন ঐক্যজোট, অভিনয় শিল্পী সংঘ।

অন্যদিকে উদীচীর বিবৃতিতে ধর্ম অবমাননার অজুহাতে নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িত এবং এর পেছনে ইন্ধনদাতাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সাথে এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যেরও তীব্র নিন্দা জানায় সংগঠনটি।

উদীচীর সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে নড়াইলের ওই কলেজে শিক্ষক লাঞ্ছনার পেছনে শুধু ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগই কারণ নয়। কলেজটিতে কিছুদিন আগে অবৈধভাবে কয়েকজনকে নিয়োগের বিরোধিতা করেন স্বপন কুমার বিশ্বাস। এরপর থেকেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের রোষানলে পড়েন তিনি। পরবর্তীকালে কলেজের এক ছাত্রের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে একদল মানুষ কলেজে হামলা করলে তিনি কলেজের নিরাপত্তা রক্ষায় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিকভাবেই সহায়তা চেয়ে পুলিশকে ফোন করেন। এ ঘটনাকেই অধ্যক্ষ ওই ছাত্রের পক্ষ নিয়েছেন এবং তিনিও ধর্ম অবমাননা করেছেন বলে গুজব রটিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করে তোলা হয়। পরবর্তীকালে পুলিশের উপস্থিতিতেই অধ্যক্ষসহ তিনজনের গলায় জুতার মালা পরিয়ে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে পুলিশের ভ্যানে তোলা হয়।

উদীচীর বিবৃতিতে বলা হয়, প্রায় ৮ ঘণ্টা ধরে কলেজ ক্যাম্পাসে তাণ্ডব চালানো হলেও তা ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন। শুধু তাই নয়, অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো তাকে অসম্মানিত করার পূর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। কেননা, তাদের উপস্থিতিতেই বিনা বাধায় ওই শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো হয়। এত কিছুর পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, ‘পুলিশ কিছু করার আগেই উত্তেজিত জনতা লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে’, তখন সেটি নিছক দায়িত্বহীন মন্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে ব্যর্থতার দায়ে নড়াইলের পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেখানে ঘটনার ১১ দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দায়িত্বে কারও গাফিলতি ছিল কিনা তিনি তা খতিয়ে দেখবেন। এসব মন্তব্য এবং অহেতুক কালক্ষেপণের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে কিনা সে প্রশ্নও তোলেন উদীচীর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনার সুষ্ঠু বিচার না হলে প্রগতিশীল ও শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে উদীচী দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলবে বলেও বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সমাবেশ: শিক্ষক হত্যা, লাঞ্ছনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছে বামপন্থি ছাত্রসংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের জন্য শিক্ষক হেনস্তা বন্ধ করা, শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা এবং বন্যাদুর্গত এলাকার শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি মওকুফ করার দাবি জানানো হয়।

ছাত্র কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশে শিক্ষক নির্যাতন চলছে। একদিকে নির্যাতন, অন্যদিকে চলছে উন্নয়ন তথা পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের উৎসব। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শিক্ষক লাঞ্ছনা ও হত্যা করা শেখাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের হত্যা বা লাঞ্ছনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মামলার নামে হয়রানি করা হচ্ছে। সত্য কথা বলা শিক্ষকদের গলায় জুতার মালা পরানো হচ্ছে।’

অধ্যক্ষ হেনস্তায় গ্রেপ্তার ৩ জনের রিমান্ড আবেদন: নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষকে হেনস্তার ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। গতকাল অধ্যক্ষ হেনস্তার ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এই আবেদন করেন। তবে আদালত এখনো আবেদনটির ওপর শুনানির তারিখ দেয়নি।

অধ্যক্ষ হেনস্তার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের সুলতান মঞ্চে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা হয়েছে। সভায় নড়াইল পৌরসভার মেয়র আঞ্জুমান আরা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মলয় কুমার কু-, সাংবাদিক মলয় কান্তি নন্দী, পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মেশকাতুল ওয়ায়েজীন লিটুসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান।

এদিকে শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদসহ কেন্দ্রীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট নেতারা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সাক্ষাৎ শেষে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পথসভা করবেন।

সম্প্রতি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাময়িক বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মাকে ‘সমর্থন জানিয়ে’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে নড়াইল সদরের এক কলেজছাত্র পোস্ট দেন। ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা গ্রহণে দেরি করার’ অজুহাতে গত ১৮ জুন কয়েকশ’ পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতেই মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়।

আর গত শনিবার দুপুরে সাভারের আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের ক্রিকেট স্টাম্পের আঘাতে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার গুরুতর আহত হন। পরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত সোমবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।