logo
আপডেট : ৭ জুলাই, ২০২২ ০০:০০
ত্যাগ-ভোগ-ভাগ-যোগ
মোস্তফা মামুন

ত্যাগ-ভোগ-ভাগ-যোগ

ছোটবেলায় কোরবানির মাংস বিতরণ করাটা দারুণ উপভোগ্য একটা ব্যাপার। আর সবার মতো সেই আগ্রহটা আমারও ছিল। একবার কোরবানির মাংস বিতরণ করতে গিয়ে দেখি নিচে অনেক ভিড়। আমার এক বড় ভাই সেই ভিড়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। কাজটা সহজ হচ্ছে না, সবাই সামনে আসতে চায়, অভিজ্ঞতা থেকে ওরা জানে পেছনে পড়লে শেষ পর্যন্ত মাংস না-ও মিলতে পারে। অনেক চেষ্টায় একসময় তাদের একটা লাইনে আনাও গেল। নিয়ম করা হলো, লাইনের সামনে থেকে একেকজন করে মাংস নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবে। সবাই শর্ত মেনে নিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছে, পেছনে দাঁড়ানো একজনকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার ক্লাসমেট রফিক। চোখে চোখ পড়তেই মাথা নিচু করে ফেলল। ওর এই মাথা নিচু করাটা চোখে পড়ল সঙ্গে থাকা বড় ভাইয়ের। তিনি ইঙ্গিতে ঘটনাটা জানতে চাইলেন সম্ভবত। রফিক কী যেন বলল আর শুনে বড় ভাইয়ের চেহারায় হাসি।

একটু কান পেতে শুনলাম তিনি বলছেন, ‘ভালোই তো হলো। তোকে বেশি করে দেবে।’

রফিক শুনে আরও মিইয়ে যায়। মাথা আরও নিচু।

আমার বিস্ময় তখনো কাটছে না। রফিক স্কুলে মাঝেমধ্যে খালি পায়ে আসে। ওরা দরিদ্র জানতাম, তাই বলে কোরবানির দিনে মাংস জোগাড়ের লাইনে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা যে জানতাম না।

আস্তে আস্তে লাইন এগোল। রফিক সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাই হাসিমুখে বলল, ‘একটু বেশি করে দিও। তোমার বন্ধু!’

রফিক অবাক হয়ে তাকায়। মাংস-ভিক্ষুক জেনেও আমি বন্ধুত্বটা স্বীকার করি কি না বুঝতে চায় যেন।

আমি মাংস দিলাম। বাড়িয়েই দিলাম। বড় ভাইয়ের মুখের হাসি আরও বিস্তৃত। আর রফিক কেঁদে দিল। আমার উচিত ছিল ওকে সান্ত¡না দেওয়া কিন্তু ওই বয়সে অন্যের কষ্ট ঠিক আন্দাজ করা যায় না। তা ছাড়া রফিকের এই অবস্থান জেনে আমার মধ্যেও একটা দ্বিধা তৈরি হয়েছিল বোধহয়।

রফিক কান্নাভেজা গলায় বলল, ‘একটা অনুরোধ। ক্লাসের কাউকে এটা বলো না। তোমার বাসা জানলে আমি ঢুকতাম না।’

কথাটা রাখিনি। তখন অল্প বয়স। বন্ধুদের কাছে কোনো গল্প চেপে যেতে গেলে পেটে ব্যথা হয়।

বহু বছর পেরিয়ে গেছে। রফিক কোথায় কে জানে। কিন্তু কোরবানির দিনে মাংস বিতরণের সময় এলেই রফিক উঠে আসে স্মৃতির দেয়াল ভেঙে। ওর করুণ অনুরোধটা কানে বাজে, ‘ক্লাসের কাউকে বলো না। ওরা শুনলে আর আমার সঙ্গে মিশবে না।’ একটা অপরাধবোধ মনকে বিষণ্ন মনে করে দেয়।

গল্পটা আগেও বলে থাকতে পারি। তবু কোরবানি-সংক্রান্ত যেকোনো লেখায় সুযোগ পেলেই বলি। অপরাধবোধ কমানোর জন্য! হতে পারে। তবে এর চেয়েও বেশি করে এজন্য যেন আমাদের অসতর্কতায় কারও মনে কষ্ট না লাগে। যেন ধুলো না লাগে কোরবানির ত্যাগের মহিমায়।

মন কি একটু খারাপ হয়ে গেল! তাহলে এবার কোরবানি নিয়ে একটা আনন্দের গল্প বলি। এক প্রবীণ মানুষ কোরবানির বাজারে যেতেন খুব আগ্রহ করে। নিজের শুধু নয়, অন্যের গরু কেনাতেও তার তুমুল উৎসাহ। এই দক্ষতার কারণে তার বেশ চাহিদা ছিল, লোকজন সঠিক গরু কেনার জন্য চা-পান খাইয়ে সঙ্গে নিয়ে যেত তাকে।

বাজারে গিয়ে গরু দেখে তিনি বলতেন, ‘না, এটা হবে না। দেখতে ভালো না।’

গরুকে ঠিক কী রকম হলে দেখতে ভালো বলা যায়, এটা বেশির ভাগই বুঝতে পারত না। তাকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘চোখ থাকতে হয়। চোখ।’ তিনি আরও চলেন। আরও ঘোরেন।

একজন বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সেই তো দুদিন পর জবাই করে ফেলবেন, তার জন্য সুন্দর হওয়ার দরকার কী?’

তিনি জিভ কেটে বললেন, ‘ওরে অর্বাচীন, যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বলো না। সুন্দর গরু দেখো।’

শেষ পর্যন্ত তার বিবেচনায় সুন্দর একটা গরু কিনে আনা হলো। এবার শুরু হলো অন্য কা-। তিনি গরুর গায়ে হাত বোলান। আদর করে দেন। খাবারের প্রতি বিশেষ যতœ নেন।

প্রশ্ন করলে উত্তর হলো, ‘আরে কোরবানি মানে ত্যাগ। ত্যাগের আগে সৃষ্টি করতে হয় মায়া। গরুর সঙ্গে পেয়ার হতে হবে।’

তিনি পেয়ার তৈরির জন্য চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখলেন না। গরুর চেহারার মধ্যেও কেমন যেন পেয়ারের ভঙ্গি। সব ঠিক ছিল। গোলমাল হলো ঈদের আগের রাতে। গরুটা হাওয়া। এত পেয়ারের বিনিময়ে এই ধোঁকায় ভদ্রলোক বাকরুদ্ধ।

শুরু হলো খোঁজাখুঁজি। গরু খোঁজা বলতে একটা কথা আছে। সবাই বইটই পড়ে জানে। আমরা সেদিন নিজের চোখে ব্যাপারটা দেখেছিলাম।

লোকজন খুঁজছে। আমরা বসলাম তাকে সান্ত¡না দিতে। বললাম, ‘আপনার সঙ্গে পেয়ার হয়েছে। গরু আপনার ফিরে আসবেই।’

তিনি বললেন, ‘ফিরে যদি আসে, তাহলে বুঝতে হবে সেটা আমার সততার জোরে। সৎ পয়সায় কেনা জিনিস।’

সততার শক্তি না পেয়ার কোনটার জোরে জানি না, তবে গরুটা পাওয়া গিয়েছিল। তুমুল উৎসাহে কোরবানি হলো। চাচা উপস্থিত থেকে কাটাকাটিতে শরিক হলেন। মাথাটা থেকে মগজ বের করার কৌশল কসাইকে দেখিয়ে দিলেন। সেই মগজ ভাজা দিয়ে দুপুরের খাবার খেলেন মহানন্দে।

আমার এক চাচা ছিলেন, যিনি কোরবানির পুরো প্রক্রিয়া খুব উপভোগ করতেন। সারা বছর বাজারে যাওয়ার নাম নেই কিন্তু কোরবানির মাস দেড় মাস আগে থেকেই উত্তেজনা শুরু। কী সাইজের গরু হলে ভালো হয়? রং কেমন হওয়া উচিত? গবেষণায় আমরাও গরুর প্রকারভেদ-গুণাগুণ জেনে যেতাম। যাই হোক, অক্লান্তে গরু কাটাকাটি শেষ করে বিতরণের নেতৃত্বেও তিনি। সবাই জানে, এই ক্ষেত্রে একা সামাল দেওয়া মুশকিল। কিন্তু অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস বেশি ছিল বলে নিজেই সব করতেন। একবার মাংস বিতরণের সময় খেয়াল করলেন লাইনটা কোনোভাবেই শেষ হচ্ছে না। একটু দেখেই বুঝলেন যারা নিচ্ছে তারা আবার পেছন থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি এই অনিয়মে গর্জে উঠে বললেন, ‘তোমাদের আর মাংস দেওয়া হবে না। তোমরা আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছো।’

বলেই মাংসের বালতি নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলেন। অনেকে অনিয়ম করেছে বটে কিন্তু সবাই তো আর করেনি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মাংস পাবে না জেনে অনুনয়-বিনয় শুরু করল। চাচা খুব কঠোর। ‘নো। তোমাদের আর দেওয়া হবে না’ ঘোষণা করে তিনি বেরিয়ে যাচ্ছেন এ সময় পেছন থেকে কেউ একজন একটা মাংসের দলা ছুড়ে মারল তার দিকে। বঞ্চিতদের পক্ষে দারুণ প্রতিবাদ। আর সাহস করে ওদের কেউ প্রতিবাদ শুরু করলে সবাই তাতে অংশ নিতে চায়। কম-বেশি প্রত্যেকের ব্যাগেই কিছু মাংস আছে, এর থেকে দু-এক টুকরো ঢিল হিসেবে ব্যয় করলে এমন কিছু ক্ষতি হয় না, অতএব শুরু হয় ঢিলের ঝড়। চাচা শুরুতে প্রতিবাদ করেছিলেন। ‘এত বড় সাহস’ ‘কে মারলি’ ‘সামনে আয়’ এসব আওয়াজ করছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আর আওয়াজ থাকল না। মিলিত আক্রমণে নেতিয়ে গেলেন। আমরা দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় কোনো সন্ত্রাসী ছুরি-টুরি মেরে গেছে। আসল ঘটনা জেনে খুব কষ্ট পেলাম কিন্তু হাসলামও। যাক, এবার থেকে চাচার কোরবানি নিয়ে বাড়াবাড়ি শেষ হবে। হয়েছিল। এরপর এই জীবনে কোরবানি নিয়ে আর কথা বলেননি।

এর মানে কোরবানি নিয়ে দুটো জিনিস করা যাবে না। প্রথমটা অহংকার। দ্বিতীয়টা হলো বাড়াবাড়ি। শিক্ষাটা ত্যাগের। সেটা কোনোভাবে যেন ভোগের না হয়।

কিন্তু হয়ে যায়। ফ্রিজের বিক্রি বাড়ে। ফ্রিজ কোম্পানি বড় বড় বিজ্ঞাপন দেয়। এটা যে কী বিশ্রী ধরনের লজ্জার বিষয় সেই বোধটা হারিয়ে গেছে জেনে বিপন্ন বোধ করি। আর বিষণœ বোধ করি তাদের কথা ভেবে, এই দিনটাতে যারা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দু-এক টুকরা মাংসের জন্য ছোটাছুটি করে। দিনটা হওয়ার কথা তাদের। আমরা অনেকেই বানিয়ে নিয়েছি ফ্রিজের। হওয়ার কথা ত্যাগ। হয়ে যায় ভোগ। হওয়া উচিত ভাগ। হয় যোগ।

লেখক সাংবাদিক ও লেখক

[email protected]