logo
আপডেট : ৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০
স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক ছিল বঙ্গমাতার সিদ্ধান্ত : প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক ছিল বঙ্গমাতার সিদ্ধান্ত : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গমাতার নেপথ্য ভূমিকা তুলে ধরে বলেছেন, ‘প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে বঙ্গমাতার সিদ্ধান্ত দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করেছে। রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রেও আমার মা যখন যে সিদ্ধান্তগুলো দিয়েছেন, সেটাই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে সবচেয়ে সহায়ক হয়েছে। যেহেতু আমার আব্বা মনেপ্রাণে দেশের কাজ করতে পেরেছিলেন।’ ঐতিহাসিক ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকালীন প্যারোলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি প্রত্যাখ্যান এবং সাতই মার্চের ভাষণ প্রদানের প্রাক্কালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও পরামর্শের উল্লেখ করেন তিনি।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯২তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন এবং ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক-২০২২’ প্রদান উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন।

সরকারপ্রধান বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন, তখন বঙ্গমাতা ছয় দফা দাবির সঙ্গে আরও দুটি দফার প্রস্তাবিত অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সাহসী পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের অভ্যুদয় অসম্ভব ছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার চলাকালে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি মেনে নিতে ইচ্ছুক ছিলেনÑএমন একটি ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন বঙ্গমাতা, যিনি তার নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আব্বা যদি প্যারোলে চলে যান, তখন আর আন্দোলন-সংগ্রামের কিছুই থাকত না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাও প্রত্যাহার হতো না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়েছিল, বাকি যে আসামি সবাইকে তারা মৃত্যুদ-ই দিত। কেউ আর বেঁচে থাকতে পারত না এবং বাংলাদেশও আর স্বাধীনতার মুখ দেখত না।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতার ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণের বিষয়ে তার মায়ের পরামর্শ দেওয়ার উল্লেখ করে বলেন, ‘সেখানে আমাদের বহু নেতার নানা মতামত উপেক্ষা করে আমার মায়ের মতামতটাই গুরুত্ব পেয়েছে।’

তিনি বলেন, সাতই মার্চের যে বক্তব্য, সেখানে আব্বার হাতে কাগজ বা কোনো কিছু ছিল না। ওনার মনে যে কথাগুলো এসেছে, সেখান থেকে সেটাই তিনি নির্দ্বিধায় বলে গেছেন। কিন্তু ভাষণ দিতে যাওয়ার আগে অনেক বড় বড় নেতা আব্বার হাতে চিরকুট লিখে দিতেনÑএটা বলতে হবে, সেটা বলতে হবে, তখন আমার মা বলে দিতেন তুমি কারও কথা শুনবে না। নিজের মনে যা আসে তা-ই বলবে।’ 

বঙ্গমাতার অবদানকে চিরস্মরণীয় করার লক্ষ্যে ২০২১ সাল থেকে আটটি ক্ষেত্রে নারীদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত সর্বোচ্চ জাতীয় পদক ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব’ প্রদান করা হয়ে থাকে।

এ বছর রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যে পাঁচ বিশিষ্ট নারী ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক-২০২২’ পেয়েছেন তারা হলেন ‘রাজনীতি’র ক্ষেত্রে সিলেট জেলার সৈয়দা জেবুন্নেছা হক, অর্থনীতিতে কুমিল্লা জেলার সেলিমা আহমাদ এমপি, শিক্ষা ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপচার্য অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, সমাজসেবা ক্ষেত্রে কিশোরগঞ্জ জেলার মোছা. আছিয়া আলম এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আশালতা বৈদ্য (মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার)।

পুরস্কার হিসেবে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ৪০ গ্রাম ওজনের পদক, সম্মাননাপত্র এবং ৪ লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেন এবং সভাপতিত্ব করেন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক বঙ্গমাতার জীবনীর ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান চেমন আরা তৈয়ব। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল স্বাগত বক্তব্য দেন। পদক বিজয়ীদের পক্ষে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য দেন সৈয়দা জেবুন্নেছা হক।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লেখা ‘শেখ ফজিলাতুন নেছা আমার মা’ শীর্ষক একটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন।

ঢাকায় কর্মজীবী নারীদের জন্য ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব’ অত্যাধুনিক ১০তলা হোস্টেলও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গমাতার ৯২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ অসচ্ছল নারীর মাঝে ৫০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জেলা প্রশাসন গোপালগঞ্জ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলেও যুগপৎ সারা দেশেই এই কর্মসূচি পালিত হয়। প্রত্যেক নারী পাচ্ছেন ২ হাজার টাকা। মোট অর্থের মধ্যে ১৩ লাখ টাকা বন্যাকবলিত জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নারীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সারা দেশে দুস্থ নারীদের মধ্যে সাড়ে চার হাজার সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতার জীবনীভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শিত হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্মিত অত্যাধুনিক কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের বিষয়ের একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

পরে জাতির পিতা, বঙ্গমাতা এবং পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমার বাবা রাজনীতি করতেন, অর্থাৎ রাজনীতির কাজ যেহেতু তিনি এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য করতেন। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, সেটা উপলব্ধি করেই মা সব সময় পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। একজন স্ত্রী হিসেবে কোনো কিছুর দাবি তো করতেনই না; বরং আমার বাবার যা কিছু প্রয়োজন ছিল সেট তিনিই দেখতেন।’

বঙ্গমাতার আদর্শ নিয়ে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে বাংলাদেশের নারী সমাজ যেন মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, সেই আহ্বানও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের নারী সমাজ তারাও যেন এই আদর্শটা ধারণ করে। শুধু চাওয়া, পাওয়া, বিলাসিতা এটাই জীবন নয়। একটা মানুষের জীবনে মানুষের কল্যাণে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে এবং একটা আদর্শ নিয়ে চললে মানুষের জন্য অনেক অবদান রাখা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী  চুয়াত্তর সালে দুর্ভিক্ষকে মনুষ্যসৃষ্ট অ্যাখায়িত করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের উল্লেখ করে সে সময়কার একটি ঘটনার উদাহরণ টানেন।

তিনি বলেন, ‘তখন চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে। মার সঙ্গে সবার একটা যোগাযোগ ছিল। ঢাকা শহরের বা বাংলাদেশের কোথায় কী হচ্ছে, সে খবরটা তিনি জানতেন। যখন চালের দাম বেড়ে গেল মা নিজেই বাবাকে বললেন চালের দাম কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। সে সময় অফিসে গিয়ে জাতির পিতা যে খবর নিলেন তাতে চালের যে দাম আসে তা শুনে বঙ্গমাতা বললেন জাতির পিতাকে সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি। তার বক্তব্য প্রমাণ করার জন্য তখন বঙ্গমাতা ওই দামে এক মণ চাল কিনে দিতে বললে বাস্তাবিক অর্থে সে দামে বাজারে আর চাল পাওয়া গেল না।’

‘এরা সব সময় তোমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তুমি এদের বিষয়ে সতর্ক থাকবে।’ এই পরামর্শ বঙ্গমাতা তখন জাতির পিতাকে দিয়েছিলেন বলেও প্রধানমন্ত্রী জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র চালাচ্ছেন আমার বাবা কিন্তু তার পাশে থেকে ছোটখাটো বিষয়গুলোও যে আমার মা খেয়াল করছেন, তখন সেটা দেখা গেল। আর জাতির পিতার পদক্ষেপের ফলেই তখন ১০ টাকা সেরের চাল ৩ টাকায় নেমে এসেছিল।

শুধু স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার মায়ের দৃষ্টি ছিল বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।