logo
আপডেট : ২৪ আগস্ট, ২০২২ ২২:৫৫
চা বাগানের মানুষের জীবনটা কোনো জীবন না

চা বাগানের মানুষের জীবনটা কোনো জীবন না

চা শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনের জমায়েতে খায়রুন আক্তার এখন নাগরিক সমাজে পরিচিত মুখ। তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে তাকে চা শ্রমিকদের মুখপাত্র হিসেবে জেনে আসছেন। বুধবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কথোপকথনে তিনি জানান চা বাগানে শ্রমিকদের আন্দোলন ও জীবনের অদ্যোপান্ত। তার সঙ্গে কথা বলেছেন সহসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া

দেশ রূপান্তর: কেমন আছেন?

খায়রুন আক্তার: জ্বি, ভালো আছি।

আপনি কোন বাগানে কাজ করেন?

খায়রুন আক্তার: চুনারুঘাট থানার চান্দপুর চা বাগান।

থাকেন কোথায়?

খায়রুন আক্তার: চা বাগানেই।

আপনি কি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত?

খায়রুন আক্তার: না, না আমি চা শ্রমিক। আমার একটা সংগঠন আছে 'বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সমিতি'। চা বাগানের পরিবেশ ইস্যু নিয়ে কাজ করে। তেমন রাজনৈতিক কিছু না।

চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি আন্দোলনের সর্বশেষ অবস্থাটা কী?

খায়রুন: এখন চা বাগানের মানুষ চাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী যদি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বলেন, তিনিই আমাদের মজুরি নির্ধারণ করে দেবেন, তাহলে মানুষ কাজে বের হবে।

তার মানে সবাই চাচ্ছেন মজুরি নির্ধারণের দায়িত্বটা যেন প্রধানমন্ত্রী নেন, তাইতো?

খায়রুন: হ্যাঁ, তাই।

আপনার কি মনে হয়, আপনাদের দাবি সফল হবে?

খায়রুন: দেখেন, আমরা যারা চা বাগানে থাকি তারা সবাই কিন্তু নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আসছি। এটার প্রতি সবার অটল বিশ্বাস আছে। তাকে (প্রধানমন্ত্রীকে) সবাই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। যেই বিশ্বাস থেকে তাকে ভোট দিয়েছি সেই বিশ্বাস থেকেই বলছি, উনি যদি একবার মুখ দিয়ে বলেন যে তিনিই আমাদের মজুরি নির্ধারণ করবেন, তাহলে আমাদের ভালোই হবে। খারাপ কিছু তিনি চাইবেন না। চা শ্রমিকরা তাই বলছে, প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন তারা মেনে নেবে।

আন্দোলন চলাকালে তো আপনারা কাজে যাচ্ছেন না, বেতনবিহীন অবস্থায় কীভাবে চলছেন?

খায়রুন: কী বলবো? না খেয়ে, পানি খেয়ে চলতে হচ্ছে। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। তারপরও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। কেউ কাজে যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। মরলে মরে যাব, কিন্তু কাজে যাব না।

তার মানে সবাই খুব শক্ত অবস্থান নিয়েছেন?

খায়রুন: হ্যাঁ, বাংলাদেশে এই প্রথম চা শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছেন। এর আগে আমরা কখনো কোনো আন্দোলনে যাইনি, রাজপথে নামিনি। এই প্রথম আমরা মজুরির জন্য আন্দোলনে নেমেছি। তারপরও নামতাম না। কিন্তু, জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে ১২০ টাকায় আমাদের কিছুই হয় না। বাধ্য হয়ে আমাদের রাজপথে নামতে হয়েছে।

আপনারা যে ৩০০ টাকা মজুরির কথা বলেছেন, এই টাকায় কী আপনাদের চলবে?

খায়রুন: ৩০০ টাকা দিয়ে আসলে কিছুই হবে না। এই ৩০০ টাকা মজুরিটা কিন্তু বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাও এখন নয়, দাবিটা করা হয়েছিল ২০১৯ সালে। আমরা কিন্তু বলেছিলাম জিনিসপত্রের এতো দাম এই টাকা দিয়ে আমাদের কিছুই হবে না, আমরা ৫০০ টাকা মজুরি চাই। কিন্তু, চা শ্রমিক ইউনিয়ন বলেছে, আমরা যেহেতু কাগজপত্র দিয়ে দিয়েছি ২০১৯ সালে, এখন আবার কীভাবে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দাবি করব? এটা এখন আমারা করতে পারছি না। পরবর্তী বৈঠকে অবশ্যই ৫০০ টাকা মজুরির ব্যাপারে আলোচনা করব। সে কারণে, ৩০০ টাকা মজুরির দাবিই ঠিক করা হয়েছে। আমাদের মজুরি যদি ৩০০ টাকা হয় তাহলে আমরা একবেলা রুটির সাথে দুইবেলা হয়তো ডাল-ভাত খেতে পারবো।

এখন চা শ্রমিকদের সাংগঠনিক অবস্থাটা কেমন?

খায়রুন: ২৬৫টা বাগানে তিন ধরনের কমিটি আছে। কেন্দ্রীয় কমিটি, ভ্যালি কমিটি আর বাগান কমিটি।

চা শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা মালিকপক্ষের সঙ্গে আপসের চেষ্টায় আছেন কি না, আপনার কী মনে হয়?

খায়রুন: হ্যাঁ, তারা আপসের চেষ্টায় ছিলেন বলেই কিন্তু আন্দোলন চলাকালীন প্রথমে ১৪৫ টাকা মজুরিতে রাজি হয়েছিলেন। চা শ্রমিকরা তা না মেনে আন্দোলন অব্যাহত রাখলে ইউনিয়নের নেতারা আমাদের কাছে এসে ক্ষমা চান এবং বলেন তারা আমাদের সঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে নেবেন। তখন প্রশাসনিক চাপে তারা ১৪৫ টাকা মজুরিতে রাজি হয়েছিলেন মনে করে তাদের আমরা ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। পরদিন মাধবপুরের লস্করপুর ভ্যালিতে ২৩টি চা বাগানের শ্রমিকরা রাস্তা আটকে অবস্থান নিলে তারা (ইউনিয়ন নেতারা) বলেন ২৩ আগস্টের (মঙ্গলবার) মধ্যে মজুরির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে, না হলে তারা খেয়ে না খেয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে রাজপথে অবস্থান নেবেন। আমরা (সোমবার) সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে শুনি, তারা রাতের বেলা মৌলভীবাজার ডিসি অফিসে গিয়ে বাগান খোলার সিদ্ধান্তে সই করে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী এমপির মাধ্যমে নাকি বলেছেন চা শ্রমিকদের মজুরি তিনিই নির্ধারণ করে দেবেন, এখন বাগান খুলতে হবে এমন কথার ভিত্তিতে তারা বাগান খোলার সিদ্ধান্তে সই করেন।

নেতারা নিয়মিতই দ্বি-মুখী আচরণ করছেন, তাই কী?

খায়রুন: হ্যাঁ, সে কারণেই আমরা ওনাদের কথা না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি।

আপনার পরিবারে কে কে আছেন?

খায়রুন: আমরা তিন বোন এক ভাই। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা মারা গেছেন ১১ বছর হচ্ছে। তার মৃত্যুর সাথে সাথেই আমি চা বাগানে কাজ নিই। অনেক কম বয়সে আমি বাধ্য হয়ে চা বাগানে কাজ নিয়েছি। অল্প মজুরিতে সংসার চলতো না তাই। ছোটভাই ৮-৯ বছর বয়সে একটা বিস্কুট কোম্পানিতে কাজ নেয়। তার কাজের টাকা দিয়ে সংসার কোনোমতে চলতো। এখন অবশ্য তার আয় রোজগার ভালো। আমার মজুরির টাকা দিয়ে কিছুই হয় না।

চা শ্রমিকের জীবন থেকে বেরিয়ে অন্যকিছু করার কথা ভেবেছেন কখনো?

খায়রুন: হ্যাঁ অবশ্যই। আমি কিন্তু পড়াশুনা করতাম। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। তখন আমি পরীক্ষা দিতে পারিনি। পরে যে আমি ভর্তি হবো, আমার পরিবার থেকে যে আমাকে টাকা দেবে সে অবস্থাও ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে চা বাগানে কাজ নিতে হয়েছে। আমার ছোটভাই ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। তাকেও কিন্তু আমরা টাকার অভাবে পড়াতে পারিনি। দুই ভাইবোন কাজ করে আর ঋণ নিয়ে ছোটবোনের বিয়ে দিয়েছি। আমি মনে করি না, চা বাগানে কাজ করে মানুষ জীবনে কিছু করতে পারবে। এটা জীবন না ভাই। চা বাগানের মানুষের জীবনটা জীবন না। কোনো একটা মার্কেটে গিয়ে ভালো একটা কাপড় যখন দেখি, দোকানদার প্রথমেই বলে দেয় এটা আপনি নিতে পারবেন না। সরাসরি নাকচ করে দেয়। চা বাগানের মানুষের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। দেখলেই তারা বলে, মজুরি ১২০ টাকা, এত দামের কাপড় তারা কীভাবে কিনবে? আমার নিজের কাছেই অনেক কষ্ট লেগেছে, আমার বাবার মৃত্যুর পর কতদিন না খেয়ে থেকেছি হিসাব নেই। যখন সংসার চলতো না, বাগানের কাজ বাদ দিয়ে ঢালাইয়ের কাজ করেছি। অনেক কষ্ট, এগুলো বলে লাভ নেই।

মাঝখানে আপনি যে ঋণ করার কথা বললেন, ঋণটা আপনি কোথায় থেকে করলেন, চা বাগানে কি কোনো এনজিও কাজ করে?

খায়রুন: হ্যাঁ এনজিও আছে বলেই চা বাগানের মানুষ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানো এবং অন্যান্য কাজে জড়িত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে।

এরা কি ঋণের জন্য বাড়ি বাড়ি আসে, না আপনারা যান তাদের কাছে?

খায়রুন: না আমরা ঋণের জন্য তাদের অফিসে যাই।

রেশনের ব্যাপারটা কী?

খায়রুন: এক সপ্তাহ কাজ করলে একবার আড়াই কেজি রেশন পাওয়া যায়। প্রতি কেজি দুই টাকা দরে ছয় টাকায় কিনে নিতে হয়। কখনো আটা কখনো চাল দেওয়া হয়। সপ্তাহের কোনো দিন অনুপস্থিত থাকলে পুরো রেশন কেটে রাখা হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা পান কি না?

খায়রুন: ওনারা এমনিতে আমাদের সঙ্গে ভালোই থাকেন। কিন্তু, উন্নয়ন কাজের ব্যাপারে গ্রামকে যে রকম প্রাধান্য দেন বাগানকে সেরকম প্রাধান্য দেন না। বয়স্ক ভাতা-বিধবা ভাতার কথা যদি বলি চা বাগানের পরিবারগুলো কিন্তু সেসব থেকে বঞ্চিত।

আপনারা এসব নিয়ে কথা বলেন না জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে?

খায়রুন: কথা বলতে গেলে উনারা বলেন আমরা তো দিচ্ছি। কিন্তু, কাকে দিচ্ছে কে পাচ্ছে তা কেউ জানে না।

আপনাকে ধন্যবাদ, আমাদেরকে সময় দিলেন। আপনার কী কিছু বলার আছে?

খায়রুন: আমি এইটুকুই বলবো যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে চাই। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে যদি পরাধীনের মতো করেই বাঁচলাম আর এক দেশে যদি দুই ধরনের আইন হলো তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ মানা যায় না। বাঁচার তো সবার অধিকার আছে, স্বপ্ন দেখার তো সবার অধিকার আছে। আমরা চা বাগানের শ্রমিক বলে কী আমাদের স্বপ্ন নেই না কি?