logo
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০
এক মামলাই ৭০ বছর
উৎপল রায়

এক মামলাই ৭০ বছর

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের মেছের আলীর জমি নিলাম হয়ে গিয়েছিল খাজনা দিতে না পারায়। নিলামের আগে ১৯৫২ সালে অর্থ জারি (মানি এক্সিকিউশন) মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। সেই যে মামলার শুরু, তা আজো শেষ হয়নি। এক আদালত থেকে আরেক আদালতে ঘুরতে ঘুরতে মেছের আলী, নিলামে জমি কিনে মামলার বিবাদী হওয়া আবদুর রশিদ তালুকদার ও তাদের সন্তানসহ মামলার কার্যক্রমে যুক্ত থাকা অন্তত ৯ জন মারা গেছেন।

নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত এসে ঝুলে থাকা এ দেওয়ানি মামলার বয়স এখন ৭০ বছর।

এ রকম অনেক দেওয়ানি মামলায় বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ যায় কিন্তু বাদী, বিবাদীদের অনেকেই বিচারের শেষ দেখে যেতে পারেন না। উত্তরসূরিদের রেখে যাওয়া মামলায় পক্ষভুক্ত হন পরবর্তী প্রজন্ম। এক মামলা থেকে আরেক মামলার উৎপত্তি। অধস্তন আদালত থেকে উচ্চ আদালত। ফের অধস্তন আদালত। মামলা চালাতে গিয়ে অনিঃশেষ দুর্ভোগের পাশাপাশি নিঃস্ব হয়ে যান বিচারপ্রার্থী।

আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আদালত ও বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায়ই বলেন, দেওয়ানি মামলার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা বলছেন, খুন, মারামারিসহ ফৌজদারি অপরাধের বড় একটি কারণ ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ও মামলা। দ্রুত এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ হতাশ কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই যে দিনের পর দিন শুনানির তারিখ পড়ে। বিচারপ্রার্থী ফিরে যান। এটা তো ঠিক না। আমরা যদি এটা বুঝি যে মামলা এভাবে ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয় তাহলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব। আর যদি এ যুক্তি না মানি, মামলা দীর্ঘায়িত হয় তাহলে তো তা চলতেই থাকবে।’

প্রবীণ এ আইনবিদ আরও বলেন, ‘আইনটা হয়তো পুরনো। কিন্তু আছে তো। প্রশ্ন হলো এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না? এখন বিচারসংশ্লিষ্ট সবার মানসিকতার আরও পরিবর্তন হলেই শুধু সমাধান হতে পারে।’ সমাধান হিসেবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) ওপর জোর দেন তিনি।

মেছের আলীর মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, মোরেলগঞ্জের চালিতাবুনিয়া মৌজায় চারটি দাগে ২ দশমিক ৯৯ একর জমির খাজনা না দেওয়ায় ১৯৫২ সালে অর্থ জারির মামলা হয়। তারপরও খাজনা না দেওয়া পরের বছরের ২২ জানুয়ারি ওই সম্পত্তি নিলাম হয়। নিলামে ওই জমি কিনে নেন আবদুর রশিদ তালুকদার। এ নিলাম আদেশ বাতিল চেয়ে ১৯৭৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বাগেরহাটের মুন্সেফ আদালতে দেওয়ানি বিবিধ (মিস কেস) মামলা করেন মেছের আলী। এতে রশিদ তালুকদারকে বিবাদী করা হয়। ১৯৮০ সালের ২৮ জানুয়ারি মুন্সেফ আদালত এক রায়ে নিলাম বিক্রির আদেশ বাতিল করে দেয়। পরে ১৯৮৪ সালে এ রায়ের বিরুদ্ধে খুলনা জেলা জজ আদালতে আপিল করেন রশিদ। ২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর খুলনা জেলা অতিরিক্ত জজ আদালত আপিল মঞ্জুর করে রায় দিলে ওই নিলাম বিক্রি বহাল থাকে। ইতিমধ্যে মেছের আলী মৃত্যুবরণ করায় তার উত্তরাধিকারী আবদুল হামিদ শেখসহ কয়েকজন আপিলের রায় চ্যালেঞ্জ করে ওই বছর নভেম্বরে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন (দেওয়ানি নিরীক্ষণ) মামলা করেন। ওই বছরের ৬ নভেম্বর হাইকোর্ট এক রুলে রশিদের উত্তরাধিকারী ও অন্যদের কারণ দর্শানোর রুল দেয়। এতে আপিলের রায় কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চায় হাইকোর্ট। ২০০৫ সালে রুলের জবাব দেয় বিবাদীপক্ষ। তবে হাইকোর্টে মামলাটি আসার আগেই মারা যান প্রথম বিবাদী রশিদ তালুকদার।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর তথ্যমতে, এ মামলায় ১৯৫৩, ১৯৭৬ ও ১৯৮০ সালে অধস্তন আদালতের এলসিআর (লোয়ার কোর্ট রেকর্ড) নথির হদিস মিলছে না। ফলে ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে মামলাটি হাইকোর্টে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। উত্তরাধিকারী, ক্রয়সূত্রে মামলায় পক্ষভুক্ত হয়েছিলেন ২৫ জন।

হাইকোর্টে এক বিবাদীপক্ষের (মজিবুর রহমান ইতিমধ্যে মারা গেছেন) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতায় দুপক্ষই ত্যক্ত-বিরক্ত। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কোনোপক্ষই এখন মামলার খোঁজ নেয় না। তারা আপস কিংবা সমঝোতায় যাবেন। কিন্তু এতেও তো আদালতের সম্মতি, সময় ও নথি লাগবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশে দেওয়ানি মামলার যে বিচার কার্যক্রম সেটি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। একেক ধাপের পর একেক ধাপ, একটি মামলা থেকে আরও মামলা চলে বছরের পর বছর। এ নিয়ে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে।’

প্রয়াত বিবাদী মজিবুর রহমানের ছেলে এনামুল হক মোবাইল ফোনে হতাশ কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। আমরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করছি।’

আড়াই বছরে মামলা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার : ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উচ্চ ও অধস্তন আদালতে অনিষ্পন্ন দেওয়ানি, ফৌজদারি ও অন্যান্য মামলা ছিল ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭২৮টি। এর মধ্যে বিচারিক আদালতে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৮, হাইকার্টে ৯৭ হাজার ৬১৬ এবং আপিল বিভাগে ১৫ হাজার ৫৩৩ মামলা। তখনকার হিসাবে সব মিলিয়ে মোট দেওয়ানি মামলা ছিল ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৪২৭ মামলা। সম্প্রতি যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে গত জুন পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮২, হাইকোর্টে ৮৯ হাজার ২০৭টি এবং আপিল বিভাগে ১১ হাজার ৯৭৮টিসহ ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৭টি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ গত জুন পর্যন্ত আড়াই বছরে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে অনিষ্পন্ন মামলা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ১৪০টি।

সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশেই দেওয়ানি মামলায় একটু সময় লাগে। কিন্তু এত বেশি কোথাও লাগে না। ব্রিটিশদের তৈরি এ আইন দিয়েই কিন্তু একসময় স্বল্প সময়ে মামলা নিষ্পত্তি হতো। এখন কেন হচ্ছে না সেটিই প্রশ্ন?’ বিচারক স্বল্পতাকে মূল কারণ চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ‘যেখানে পাঁচ-ছয় হাজার বিচারক দরকার সেখানে প্রেষণ বাদে আদালতে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৬০০ জন। কিছু ক্ষেত্রে বিচারকদের দক্ষতার ঘাটতি ও আইনজীবীদের দায়ের প্রশ্ন তো আসেই। কিন্তু বিচারকদের দোষ দিয়েও তো লাভ নেই। তাদের প্রচুর চাপ নিতে হয়।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বিদেশ সফরে থাকায় এ পদে এখন দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে ভূমির রেকর্ড জটিলতা থেকেই প্রায় সব মামলার উৎপত্তি। এখন যেসব বিষয় বিরোধ তৈরি করে সেসব আইন পরিবর্তন করতে হবে। ব্রিটিশদের তৈরি দেওয়ানি আইন এখনকার পরিস্থিতি ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।’

যেভাবে বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা : উচ্চ ও অধস্তন আদালতে নিয়মিত দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করেন এমন আটজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তারা বলেন, মামলা শুরুর পর অন্তত ১০ বছরের মধ্যে নিষ্পত্তির নজির খুব বেশি নেই। এ ছাড়া প্রচলিত আইনে বিচারিক প্রক্রিয়া একটু সময়সাপেক্ষ। বাদীর আরজির (ফাইলিং) পর বিবাদীকে নোটিস বা সমন পাঠানো এবং জবাব দাখিলে চলে যায় দীর্ঘ সময়। এরপর দুপক্ষের বিরোধীয় বিষয় নিয়ে ইস্যু (মামলার কারণসহ বিবিধ) গঠন থেকে শুরু করে উভয়পক্ষের সাক্ষী হাজির ও নথি দাখিল এবং যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য তারিখের পর তারিখ পড়ে। এরপর রায় পেলেও ডিক্রি জারি মামলা চলে বছরের পর বছর। এ ছাড়া অধস্তন এখতিয়ারসম্পন্ন দেওয়ানি আদালতের রায় ও ডিক্রির পর জেলা জজ আদালতে আপিল হয়। আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল মামলা (সিভিল রিভিশন) করে সংক্ষুব্ধ পক্ষ। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায় সংশ্লিষ্ট পক্ষ। আপিল বিভাগের রায়ের পর সিভিল রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) মামলা হয়। এ ছাড়া বিচারের পর্যায়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা, রিসিভার (তত্ত্বাবধানকারী) নিয়োগ বা কোনো আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে সংশ্লিষ্ট আদালত কিংবা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন পক্ষরা। এভাবে এক মামলা থেকে সৃষ্টি হয় আরেক মামলা। অধস্তন আদালত থেকে উচ্চ আদালত। ফের অধস্তন আদালত। এভাবেই চলে বছরের পর বছর।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির (বিমস) সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএন গোস্বামী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনে কিন্তু বলা আছে সাক্ষ্য গ্রহণের আগে-পরে তিনবার করে সময় নেওয়া যাবে। কিন্তু এ বিধান তো কেউ মানছেন না। যদি দেওয়ানি আইনের বিধান সঠিকভাবে মেনে চলা হয় তাহলে ১৫০ দিনের মধ্যে অধস্তন আদালতে মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব। আর যদি আইনজীবী ও বিচারকরা আরও আন্তরিক ও দায়িত্বশীল না হন তাহলে ৭০ বছর কেন, ১০০ বছরেও মামলা নিষ্পত্তি হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে মেডিয়েশন (মধ্যস্থতা) বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতিকে কাজে লাগানোর এখনই উপযুক্ত সময়। না হলে বিচারপ্রার্থীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ প্রযুক্তির যুগেও সমন জারি ও জবাব দাখিলে বছরের পর বছর চলে যায়। দেখা গেল, একপক্ষের গরহাজিরায় মামলা একতরফা নিষ্পত্তি হয়। অন্যপক্ষ এসে আবার দরখাস্ত করে মামলা পুনরুজ্জীবিত করে। আপিল শুনানি ও শেষ হওয়ার পরও একই অবস্থা হয়। তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি বিচারে কতদিনের মধ্যে অভিযোগপত্র, বিচার করতে হবে সেটি বলা আছে। কিন্তু দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। এ জন্য আইনকে আরও সুস্পষ্ট করা উচিত।’