logo
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জাহাজ বন্ধ
আশরাফুল হক

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জাহাজ বন্ধ

মৌসুম শুরু হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নাব্যসংকটের কথা বলা হলেও এ সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমার অংশে উত্তেজনা। মিয়ানমারের সম্ভাব্য মর্টার শেল থেকে পর্যটকদের নিরাপদে রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ সীমান্তে এবং দুই দেশের শূন্যরেখায় সম্প্রতি কয়েক দফা মর্টার শেল নিক্ষেপ করেছে মিয়ানমার। এতে একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। দফায় দফায় প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ। সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে চলমান এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র বদল করা হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র বন্ধ করে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং পরীক্ষা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতার বেড়াসংলগ্ন তমব্রু, ঘুমধুম, হেডম্যানপাড়া, ঝিরি ও রেজু আমতলী এলাকায় বসবাসরত ৩০০ পরিবারের প্রায় দেড় হাজার সদস্যকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

গত মঙ্গলবার কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক যাওয়া-আসা ও প্রাসঙ্গিক সেবা বিষয়ে ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আলী কদর, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফ উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মহাপরিচালক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরফানুল হক চৌধুরী এবং বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেন। গতকাল দেশ রূপান্তরের এক প্রশ্নের জবাবে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরফানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বৈঠকে নাফ নদীতে নাব্যসংকট থাকায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটক চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন এবং চট্টগ্রাম-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটক চলাচল অব্যাহত থাকবে।’

বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি যেকোনো সময় খারাপ হতে পারে। অথবা মিয়ানমারের একটা গোলা বা মর্টার শেল পর্যটকবাহী জাহাজে এসে পড়তে পারে। এ কারণে মূলত টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নাফ নদী দুই দেশের মধ্যে সীমানা হিসেবে কাজ করছে। এই নদীর ৭ কিলোমিটার অভিন্ন নৌপথ পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিনে যেতে হয়।

পর্যটন মৌসুম শুরু হয় ১ অক্টোবর থেকে। মার্চ পর্যন্ত দ্বীপটিতে পর্যটকরা যেতে পারেন। মৌসুম শুরু হলে টেকনাফ থেকে সাতটি প্রমোদতরী এবং ৩০টির বেশি কাঠের ট্রলারে সেন্টমার্টিন যাওয়া-আসা করেন দৈনিক প্রায় ৫ থেকে ১০ হাজার পর্যটক।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের উপস্থিতিতে দ্বীপের প্রবাল, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্য প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। পর্যটকরা গভীর রাত পর্যন্ত সৈকতে উৎসব করেন। তাদের গানবাজনা ও কোলাহল বেড়ে যাওয়ায় গভীর সমুদ্র থেকে তীরে কচ্ছপ ছুটে আসা অনেক কমে গেছে। দ্বীপের ১০৬টি হোটেল-মোটেলের পয়োবর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। হোটেলের বর্জ্য সরাসরি চলে যাচ্ছে সমুদ্রে। এতে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানি ঘোলাটে হচ্ছে। জাহাজ ও ট্রলারের পাখার কারণে সমুদ্রের তলদেশের বালু পানিতে মিশে প্রবালের ওপর জমে আস্তরের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে অনেক এলাকার প্রবাল মরে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সম্প্রতি সেন্টমার্টিন থেকে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, নৌকার মাছ ধরার জাল, প্লাস্টিক বোতল, ক্যান ও সিগারেটের উচ্ছিষ্ট উদ্ধার করেছে।

এ অবস্থায় ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিপন্ন সেন্টমার্টিন রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০ জন পর্যটক সেন্টমার্টিনে যেতে পারবেন। দ্বীপভ্রমণে ইচ্ছুকদের আগে থেকেই অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেখানে রাত্রিযাপন করতে না দেওয়ার। সেন্টমার্টিনের অধিবাসীদের ধাপে ধাপে মূল ভূখ-ে পুনর্বাসন করার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সরকার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি সব ওলটপালট করে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সেই সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

গত মঙ্গলবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃতির জিনিস প্রকৃতিই রক্ষা করে। কখনো কখনো মানুষের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তেও প্রকৃতি রক্ষা পায়।

৭ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিনের লোকসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। দ্বীপটিতে ১৫৪ প্রজাতির শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৯১ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৬ প্রজাতির প্রজাপতি, ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। দ্বীপে ৭৭ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ৩৩ প্রজাতির পরিযায়ী পাখিসহ মোট ১১০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল। এসব প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণীর অনেকগুলোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।