logo
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৫:৩৭
আরও ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠবেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ
অনলাইন ডেস্ক

আরও ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠবেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ

সৌদি আরবের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এমবিএস নামেই বেশি পরিচিত। কারও কারও কাছে তিনি একজন বিপ্লবী। যিনি সৌদি আরবের জীবনধারা বদলে দিয়েছেন। বিশেষ করে নারী উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করেছেন তিনি।

তবে অনেকের কাছেই তিনি একজন ‘ভয়ংকর কসাই’। যিনি প্রতিবেশি দেশ ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা করেছেন। যা দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

শুধু তাই নয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মনে করে, বিদেশে বসবাসরত সৌদি বংশোদ্ভূত খ্যাতনামা সাংবাদিক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জামাল খাসোগি নৃশংসভাবে হত্যার নির্দেশ তিনিই দিয়েছেন।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে সৌদি দূতাবাসে খাসোগিকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয়। রাজপরিবারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে ওয়াশিংটন পোস্টে কলাম লিখতেন তিনি।

ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কারণে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন তিনি। সৌদির তেল পেতে রীতিমতো তার পেছনে লাইন ধরেছেন বিশ্বনেতারা।

এর মধ্যেই সৌদি সরকারের ক্ষমতা কাঠামোয় তাকে আরও একধাপ ওপরে তোলা হলো; বা বলা ভালো, বাবার হাত ধরে তিনি নিজেই উঠে এলেন। মঙ্গলবারই (২৭ সেপ্টেম্বর)এক রাজকীয় আদেশে যুবরাজ মোহাম্মদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ।

বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক সৌদির প্রতিষ্ঠাতা ও দেশটির প্রথম বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সৌদের পর দেশটিতে একজনের হাতে এত বেশি ক্ষমতা আগে কখনও দেখা যায়নি। বাবা ৮৬ বছর বয়সী সালমান বিন আবদুল আজিজ রাজা হলেও পুরো বাদশাহী কার্যত ৩৭ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদের হাতেই। এখন বাবার পরিবর্তে তিনিই দেশ পরিচালনা করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে থেকেই বিপজ্জনক ছিলেন যুবরাজ মোহাম্মদ। নতুন করে যে ক্ষমতা তিনি পেয়েছেন, তার ফলে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবেন তিনি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এর প্রতিবেদন মতে, যুবরাজ মোহাম্মদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের বিচার। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তুরস্কে যে বিচার চলছিল, তা এখন কার্যত বন্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এ বিষয়ক একটি মামলা তদন্তাধীন। এ মামলায় যুবরাজকে অব্যাহতি দেয়া হবে কি না সে ব্যাপারে খুব শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে জো বাইডেন প্রশাসন।

এমন পরিস্থিতিতে যুবরাজ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। অধিকারকর্মীরা বলছেন, সাংবাদিক খাগোসিকে হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে হওয়া মামলা থেকে বাঁচতে এই কাজ করেছেন যুবরাজ।

জামালখাগোসির প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ডেমোক্রেসি ফর আরব ওয়ার্ল্ড (ডন) যুবরাজ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে এ হত্যা মামলা দায়ের করে। ডনের প্রধান নির্বাহী সারাহ লিহ হুইটসন এক টুইটার বার্তায় বলেছেন, ‘তড়িঘড়ি প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণের একটিই কারণ। আর তা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ সেগুলো থেকে রেহাই পাওয়া’।

সমর্থকরা বলছেন, যুবরাজ মোহাম্মদের সাহসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শক্ত মনোভাব সৌদির অর্থনীতি বাঁচাতে খুবই প্রয়োজন। অপরদিকে তার সমালোচকরা বলছেন, তিনি স্বৈরাচারী, ক্ষমতার জন্য ক্ষুধার্ত ও বেপরোয়া।

২০২১ সালে জো বাইডেন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি যুবরাজ মোহাম্মদের সঙ্গে লেনদেন বা যে কোনো সম্পর্ক স্থাপন এড়িয়ে যান। জামাল খাসোগিকে হত্যার পর প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারণায় সৌদি আরবকে এর মূল্য চুকাতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। শুধু তাই নয়, এজন্য দেশটিকে ‘একঘরে’ করে ছাড়বেন বলে প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযোগ, যুবরাজ মোহাম্মদই ওই হত্যাকাণ্ডের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে যুবরাজ সবসময় এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। সেই বিষয় উপেক্ষা করে এখন বাইডেন প্রশাসন সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ‘সখ্যতা’ গড়তে চাইছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম কমিয়ে আনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজ দেশে চাপের মধ্যে পড়েছিলেন। ফলে তিনি সৌ আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে বাধ্য হন।

চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি মধ্যপ্রাচ্য সফরকালে বাইডেন যুবরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন। রিয়াদে দুই নেতার বৈঠকের আগে যুবরাজের সঙ্গে বাইডেনকে মুষ্টিবদ্ধ হাতে করমর্দন করতে দেখা যায়। এটাকে দুই দেশের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক হিসেবেই দেখা হতে থাকে।

যুবরাজ মোহাম্মদ ১৯৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। নিজেকে তিনি ডিজিটাল তথা তথ্য-প্রযুক্তির যুগে বড় হওয়া সৌদির প্রথম প্রজন্মের সদস্য হিসেবে দেখেন। তিনি কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক সম্পন্ন করেন। 

এরপরই কর্মজীবন শুরু হয় তার এবং বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। ২০০৯ সালে পিতার বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। রিয়াদ প্রদেশের গভর্নরও ছিলেন। এরপর প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। ২০১৫ সাল থেকেই তিনি সৌদি আরবের কার্যত নেতা হিসেবে পরিচিত হন।

এরপর গত কয়েক বছরে যুবরাজ অনেক সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল করেছেন দেশটিতে। নারী চালকদের ওপর নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটিয়েছেন। ধর্মীয় পুলিশের ক্ষমতা রোধ করেছেন ও সামাজিক মেলামেশা ও পাবলিক কনসার্টের অনুমতি দিয়েছেন।

দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছেন। তবে যুবরাজের নেতৃত্বে সৌদি কর্তৃপক্ষ দেশটিতে ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে কর্তৃপক্ষ সাবেক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে আটক করে এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে অবমূল্যায়ন করার অভিযোগ তোলে।

যুবরাজ অন্যান্য সৌদি নেতাদের তুলনায় আরও দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছেন। প্রতিবেশী দেশ কাতারের সঙ্গে বিরোধের সমাধান করেছেন। তবে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে বোমা হামলার কারণে যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে সেখানেও তার বড় দায় রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, যুবরাজ খুব অনভিজ্ঞ ও স্বেচ্ছাচারী। কিন্তু তার কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করার বা তার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কেউ অবশিষ্ট নেই। তার ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ও দমনমূলক প্রবণতার কিছু সমালোচনা এরই মধ্যে হয়েছে।

মোহাম্মদ বিন সালমানের বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে সামাজিক পরিবর্তন ঘটছে যা নিয়ে দেশটির অনেকেই উদ্বিগ্ন ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সংগ্রাম করতে হচ্ছে অনেককেই। তবুও অনেকে বিশেষ করে তার পরিকল্পনার উৎসাহী সমর্থকরা বলছেন, তিনি তাদের দেশকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।