logo
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২০:১৫
নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা নিম্ন আয়ের মানুষ
‘কয়েক পদের তরকারি আমাদের জন্য স্বপ্ন’
তাওসিফ মাইমুন

‘কয়েক পদের তরকারি আমাদের জন্য স্বপ্ন’

রাজধানীর বাড্ডা কাঁচাবাজার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ছোট্ট একটি ব্যাগ হাতে কেনাকাটা করে বের হচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মো. মিজান। কী কী কিনেছেন জানতে চাইলেই বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে তো কয়েক মাস ধইরাই আগুন লাইগা আছে। এ আগুনের বাজারে আমগো মতো গরিবের পক্ষে রঙ-বেরঙের খাবার কিইনা খাওন কি সম্ভব? বাঁইচা থাকার জন্য ডাল-ভাত কিনতেই তো পকেটের সব টাকা শ্যাষ হইয়া যায়। সেখানে কয়েক পদের তরিতরকারি তো আমগো জন্য স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই না।’

একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন মিজান।

তিনি জানান, স্ত্রী ও এক সন্তানসহ তার তিনজনের ছোট্ট সংসার। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে গিয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন।

শুধু নির্মাণশ্রমিক মিজান একাই নন, বৈশ্বিক মহামারী করোনার ধাক্কায় দেশের প্রায় সব মানুষের আয় না বাড়লেও খরচ বেড়েছে। এরই মধ্যে আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে তাদের নাকাল অবস্থা। আর কোনো পণ্যের দাম একবার বাড়লে তা আর কমাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। নানা অজুহাতে বাজারে চাল, ডাল থেকে শুরু করে সবজি, মাছ, মাংস, মুরগি ও ডিমসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

তেমনই একজন রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম। সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখে কপালে ঘাম জমে যায় তার। গতকাল দুপুরে রাজধানীর মালিবাগ বাজারে তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাঁচজনের সংসার চালাতে অনেক কিছুই প্রয়োজন হয়। কিন্তু সামান্য বেতনের টাকায় বাজারের খরচের হিসাব মেলাতে পারছি না। অনিচ্ছা সত্তে¡ও বাজারে এসে দরকারি অনেক পণ্য কেনার তালিকা থেকে বাদ দিতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১১০ টাকা কেজির নিচে মসুর ডাল পাওয়া যাচ্ছে না। চিনির কেজি ১০০ টাকা। গরু-মুরগির যে দাম, তাতে মাংস খাওয়া ছেড়েই দিয়েছি বলতে গেলে। সবজির দামেও আগুন। শসার কেজি ৭০ টাকা, গোলাকার বেগুন ৯০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।’

কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য খাদ্যপণ্যের তুলনায় সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির বাজার কিছুটা তেতে আছে। এর মধ্যে কয়েকটি সবজির দাম অনেক বেশি। বিশেষ করে শীতকালীন সবজি মুলা বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকায়, বাঁধাকপি প্রতি পিস ৩০-৪০, ফুলকপি ৪৫-৫০, শিম ১২০ টাকা কেজি এবং কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। অন্যান্য সবজির মধ্যে পটোল কেজিপ্রতি ৪৫, বরবটি ৮০, ঢেঁড়স ৫৫-৬০, করলা ১০ টাকা বেড়ে ৭০ ও মরিচ ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি করছেন সবজি ব্যবসায়ীরা। বাজারে হাঁসের ডিমের দাম ডজনে বেড়েছে ২০ ও তেলাপিয়া মাছ কেজিতে বেড়েছে ২০-৩০ টাকা করে। এ ছাড়া মুরগি, চাল-ডাল ও অন্যান্য মুদি পণ্য অপরিবর্তিত দামে বিক্রি করছেন ক্রেতারা।

খাদ্যপণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকার বিষয় রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, চাহিদার তুলনায় বাজারে খাদ্যপণ্য, শাকসবজি ও ডিমের সরবরাহে সংকট থাকায় দিন দিন দাম বাড়ছে।

কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাঁচামালের দামের সঙ্গে হিসাব করে লাভ নেই। অস্বাভাবিকভাবে সবজির মূল্য বাড়তি সবার জন্য একটা উটকো ঝামেলা। বাজারে সবজির সরবরাহ কম থাকায় কিছু কিছু সবজির মূল্য বেশি এবং অধিকাংশ সবজি আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।’

এদিকে চালের খুচরা বাজারের মুদি দোকানগুলোতে দেখা যায়, আটাশ চালের কেজি ৬০, মিনিকেট ৭০-৭৫, গুটি স্বর্ণা ৫৫, স্বর্ণ ৫০ এবং নাজিরশাইল ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মোটা ডাল কেজি ১১০ এবং চিকন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

মোহাম্মদপুর বাজারের নোয়াখালী স্টোরের বিক্রয়কর্মী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চালের দাম একই অবস্থায় রয়েছে। ডালের দাম বেড়েছে আরও এক মাস আগে। প্রতি কেজি মোটা মসুর ডাল বিক্রি করি ১০৫-১১০ টাকায়। আর চিকন মসুর ডাল বিক্রি করি ১৩০ টাকা করে। বাজার পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও কোনো ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে না।’

মুরগি ও ডিমের বাজার ঘুরে দেখা যায়, দাম অপরিবর্তিত থেকে বয়লার মুরগি কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৭৫-১৮০, লেয়ার মুরগির কেজি ৩০০ এবং সোনালি মুরগি কেজিপ্রতি ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মুরগির দামের মতো অপরিবর্তিত দামে ফার্মের মুরগির লাল ও সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে। তবে এর মধ্যে গত দুদিনে হাঁসের ডিমের দাম সব থেকে বেশি বেড়েছে। প্রতি ডজন হাঁসের ডিমে ২০ টাকা বেড়েছে। বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকা করে। যা গত ১০ দিন আগেও ১৯০ টাকায় কিনতেন ক্রেতারা। হাঁসের ডিম ছাড়াও একই সময়ে প্রতি ডজন মুরগির ডিমে ১৪ টাকা বেড়ে ১৩২ থেকে ১৪৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের সাদা ডিম ডজনপ্রতি ১৫ টাকা বেড়েছে। ১২০ টাকার জায়গায় বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা করে।

ডিমের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে মহাখালী কাঁচাবাজারের ডিম ব্যবসায়ী কৃষ্ণ দে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১০ দিন ধরে দাম বেশি। এর মধ্যে হাঁসের ডিমের দাম বেড়েছে দুদিন হবে। ডিমের দাম বাড়ার মূল কারণ খাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি। তাই ডিম উৎপাদনে খামারিদের খরচ বেড়েছে।’

মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকা তেলাপিয়ার কেজিতে দাম বেড়েছে অন্তত ২০-৩০ টাকা। ১৭০ টাকা কেজির তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২১০, ১৭০ টাকা কেজির পাঙ্গাশ ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৮০, প্রতি কেজি নলা মাছ ২৬০, বড় রুই ৩৬০, বিগ-হেড মাছের কেজি ২২০ ও কালবাউশ বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা কেজি দরে।