logo
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২১:২৪
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের জরিপ
চলতি বছরের আট মাসে ৫৭৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার
নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের আট মাসে ৫৭৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার

চলতি বছরের গত আট মাসে সারা দেশে ৫৭৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৪ জন। পাশপাশি এক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৬৪ জন। যাদের মধ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) কন্যাশিশু রয়েছে ৪৩ জন। এ ছাড়া একই সময়ের মধ্যে ২৩০১ কন্যাশিশুর বাল্যবিয়ে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে ২৮৮ জনের বাল্যবিয়ে হয়েছে৷ এরই মধ্যে ৫৮৯টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।

শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জানুয়ারি-আগস্ট ২০২২: কন্যাশিশু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন’ উপস্থাপন অনুষ্ঠানে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এ সব তথ্য জানায়।

অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি।

তিনি বলেন, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২৪টি জাতীয় জাতীয়, স্থানীয় ও অনলাইন দৈনিক পত্রিকার ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত কন্যাশিশুদের প্রতি নির্যাতনের তথ্য ১৩টি ক্যাটাগরির আওতায় ৫৬টি সাব-ক্যাটাগরিতে এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ৪৯ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের পর ২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ৮৭ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া যৌন হয়রানির স্বীকার হয়েছে ৭৬ জন। ধর্ষণ ও দলব্ধ র্ষণের মত জঘন্যতম অপরাধের শিকার হতে হচ্ছে এক বছর বয়সের শিশুদেরও। এর মধ্যে কয়েকজন তাদের নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে ধর্ষিত হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত আট মাসে ১৮৬ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ১৩৬ কন্যাশিশু আট মাসে পাচার হয়েছে। যাদের মধ্যে ৭৪ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ১৮১ জন কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে। প্রেমে প্রতারণার শিকার হয়ে ৪৬ জন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে মনোমালিন্যের কারণে ৩৫ জন কন্যাশিশু আত্মত্মহত্যা করেছে। এর আগে ২০২১ সালের প্রথম আট মাসে আত্মহত্যা করেছিল ১৫৩ জন। অর্থাৎ ২০২২ সালে বেড়েছে আত্মহত্যার পরিমাণ। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আগস্ট ১৮৬ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৩ জন। যৌতুক প্রদান করতে না পারায় পাঁচ কন্যাশিশু আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া গৃহশ্রমিক নির্যাতনের ১৫টি ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে দুজনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে এবং একজন আত্মহত্যা করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কন্যাশিশু ও নারীরা পথ-ঘাট, যানবাহন, বাজারসহ সব ধরনের পাবলিক প্লেসে, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এমনকি নিজ বাড়িতেও হরহামেশা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। চলতি বছেরের প্রথম আট মাসে মোট ৭৬ কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ১ জন বিশেষ শিশুও রয়েছে। এ নির্যাতনগুলোর অধিকাংশই হয়েছে রাস্তায়, নিজের বাসায়, নিকটতম আত্মীয়-পরিজন ও গৃহকর্তার দ্বারা। এ ছাড়া প্রতিদিন প্রায় ৩০-৩৫ জন, মাসে ৯০০-১০০০ জন কন্যা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। যাদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর। এমনকি পর্নোগ্রাফির শিকার হয়েছে ১৫ কন্যাশিশু। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া অধিকাংশ কন্যাশিশু জানে না কীভাবে, কোথায়, কার সহায়তায় এ বিষয়ে অভিযোগ করা যায় বা এর ফল কী হবে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ৩ জন কন্যাশিশু। পারিবারিক বিবাদ, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, সম্পত্তি সংক্রান্ত আক্রোশ, ইত্যাদি কারণে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ১৩৬ জন কন্যাশিশু। এর মধ্যে অপহরণের শিকার হয়েছে ৭৪ জন। এই অপহরণকৃত শিশুদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জোরপূর্বক যৌনপেশায় নিয়োজিত করা হয়।

অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, দেশে নতুন বা পুরনো যে কোনো ধরনের অস্থিরতাতেই কন্যাশিশু ও নারীর ওপর নির্যাতন কখনো থামে না। বরং, তা সব সময় বৃদ্ধিই পায়। এ নির্যাতন শুধু ঘরের বাইরেই নয়, নিজ ঘরেও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়তই ঘটে যাওয়া ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাসমূহ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। 

তারা বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষের অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভয়ঙ্কর বর্বরতা ও হিংস্রতা। লঙ্ঘিত হচ্ছে কন্যাশিশু ও নারীর মানবাধিকার। আমরা মনে করি, একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কন্যাশিশুদের অধিকার, তাদের শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিতকরণসহ নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্য বিশ্লেষণ করে আলোচকরা বলেন, কন্যাশিশু ও নারীর প্রতি নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নানা ধরনের ভুল ধারণা, শঙ্কা ও কুসংস্কার এখনও বিদ্যমান। নির্যাতিত কন্যাশিশু বা তার পরিবার নানা বাধা পেরিয়ে বিচার চাইতে গেলেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। 

অনুষ্ঠানে বক্তারা সুপারিশ করেন, কন্যাশিশু নির্যাতন বন্ধে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে; সর্বস্তরের জন্য 'যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন' নামে একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে; সাইবার নিরাপত্তায় নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করাসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

অনুষ্ঠানে কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার, চাইল্ড রাইটস এন্ড প্রোটেকশন এডুকো বাংলাদেশ স্পেশালিস্ট মো. শহীদুল ইসলাম, গুডনেইবারস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাঈনুদ্দীন মাইনুল, বাংলাদেশ ওয়াইডাব্লিউসিএ’র জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হেলেন মনিষা সরকার বক্তব্য রাখেন।