logo
আপডেট : ১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০
কান্নাভেজা বিদায় বেনজীরের
সরোয়ার আলম

কান্নাভেজা বিদায় বেনজীরের

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছুটির দিনে বঙ্গবাজারসংলগ্ন পুলিশ সদর দপ্তরে থাকে না কোনো কোলাহল। থাকে না কোনো কর্মকর্তার পদচারণা। কিন্তু গতকালের ছুটির দিনটি ছিল ভিন্ন। দুই বছরের অধিক সময় ধরে দায়িত্বে থাকা পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজপি) ড. বেনজীর আহমেদ বিদায় নিয়েছেন কাল। পাশাপাশি নয়া আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। আর এর মধ্যদিয়ে পুলিশে বেনজীর আহমেদের বিস্তৃত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

ডিএমপির সঙ্গে পেশাগত ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল বেনজীর আহমেদের। ১৯৯০ সালে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে ডিএমপিতে যোগদান করেন তিনি। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এখানে কর্মরত ছিলাম। পরে ২০০০ সালে ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার হন। সর্বশেষ ২০১০ সালের অক্টোবরে ডিএমপি কমিশনার হন। এ ছাড়া ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজারবাগে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বেনজীর আহমেদ বলেন, প্রতিটি মুহূর্তই চ্যালেঞ্জিং ছিল। সেই সময়ে যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করেছেন তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

গতকাল হৃদয়গ্রাহী ছিল বেনজীর আহমেদের বিদায়লগ্নটি। এই সময় বেশিরভাগ কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের চোখে ছিল পানি। সহকর্মীদের চোখে পানি দেখে বেনজীর আহমেদও আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। সমাপ্ত করেন ৩৪ বছর ৫ মাস ১৬ দিনের কর্মজীবনের।

গতকাল বিকেল ৩টা ৩২ মিনিটে অতিরিক্ত পুলিশ প্রহরায় পুলিশ সদর দপ্তরে আসেন নতুন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এই সময় সদর দপ্তরের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় নির্মিত একটি প্যান্ডেলে অভ্যর্থনা জানান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) কামরুল আহসানসহ অন্য কর্মকর্তারা। গার্ড অব অনার শেষে তাকে নেওয়া হয় পুরনো ভবনের দ্বিতীয় তলায় আইজিপির দপ্তরে। তিনি অপেক্ষা করেন বিদায়ী আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদকে অভ্যর্থনা জানাতে। বিকেল ৩টা ৩৮ মিনিটে পোশাক পরে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রবেশ করেন বেনজীর আহমেদ। তবে অন্য সময়ের মতো ছিল না কঠোর নিরাপত্তা। ভবনের পূর্ব দিকের ফটকে বেনজীর আহমেদের গাড়িটি আসার পর তাকে স্যালুট দেন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন)। দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। এই সময় অন্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বেনজীর আহমেদ গাড়ি থেকে নামার পর প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করেন। পরে সোজা চলে যান দায়িত্ব পালন করার সেই কক্ষটিতে। নয়া আইজিপির সঙ্গে করমর্দন করে আইজিপির বসার স্থানে আগে থেকে থাকা দুটি চেয়ারে গিয়ে বসেন। তাদের ঘিরে ছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। তবে দুজনের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডিআইজি প্রশাসন, ডিআইজি হেডকোয়ার্টার ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি হেডকোয়ার্টার। এই সময় কোনো কোনো কর্মকর্তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। বিদায়ী ও নয়া আইজিপি অনেকটা হাস্যোজ্জ্বল থেকে যার যার ফাইলে স্বাক্ষর করেন। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন তারা। এরই মধ্যে ভবনের নিচতলায় সাজসজ্জা করা সাদা রংয়ের প্রাডো গাড়িটি প্রস্তুত রাখা হয়। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুলিশের কয়েক কর্মকর্তা।

বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে বেনজীর আহমেদ তার চিরাচেনা কক্ষ থেকে বের হন। আইজিপি কার্যালয়ে কর্মরত স্টাফদের সঙ্গে করমর্দন করে দোয়া চান। পুলিশ কর্মকর্তাদের বেষ্টনীর মধ্যে বেনজীর আহমেদ নেমে আসেন নিচতলায়। গাড়ির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই সময় তার দুই চোখের কোণ লাল হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য দেখে অন্য কর্মকর্তারাও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে দুই পাশে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রায় সবার হাতেই ছিল গাঁদা ফুলের পাপড়ি। বেনজীর আহমেদ গাড়িতে না উঠে চলে যান লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মকর্তা ও সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে। প্রায় সবার সঙ্গে তিনি করমর্দন করতে থাকলে অনেকটা আবেগময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিজেকে কোনো রকম সামলে বেনজীর আহমেদ চলে যান নির্দিষ্ট স্থানে থাকা গাড়ির সামনে। শেষবারের মতো উঠে পড়েন গাড়িতে। ৪টা ১৮ মিনিটে চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্র বাজানো শুরু হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রশি টেনে সামনের দিকে নিতে থাকেন গাড়িবহর। এ সময় সবার মধ্যে নীরবতা নেমে আসে। জানালার গ্লাস খুলে হাত নেড়ে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নেন বেনজীর আহমেদ। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি অনেকটা আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। পৌনে ৫টার দিকে ভবনের পশ্চিম পাশের গেইট অতিক্রম করেন বেনজীর আহমেদ। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বের হয়ে সোজা চলে যান মিন্টো রোডের পুলিশ ভবনে।

জানা গেছে, অবসরে যাওয়ার আগে গত তিন দিন ধরে বেনজীর আহমেদকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর রাজারবাগে সংবর্ধনা দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অনুষ্ঠানে বক্তারা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের তান্ডবলীলা দমনে আপনার সাহসী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করে আপনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সারা দেশে ৬৯১২টি বিট স্থাপন করে বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে গুলশান এবং বনানী এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। আধুনিক ও ডিজিটাইলাইজেশন আপনার হাত ধরেই পুলিশে সূচনা হয়েছে। নারীদের জন্য নিরাপদ সাইবার স্পেস নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ নারী পুলিশ দ্বারা পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন নামে ফেইসবুক পেইজ, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে কুইক রেসপন্স টিম এবং নারী-শিশু ও বয়স্কদের জন্য প্রতিটি থানায় আলাদা ডেস্ক স্থাপনে নারীরা সহজে সেবা পাচ্ছেন।’

এ সময় বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘ডিএমপির সঙ্গে আমার একধরনের পেশাগত ও আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯০ সালে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে ডিএমপিতে যোগদান করে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এখানে কর্মরত ছিলাম। আবার ২০০০ সালে উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে ডিএমপিতে যোগ দিই। সর্বশেষ ২০১০ সালের অক্টোবরে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগদান করি। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। সেই সময়ে যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করেছেন তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’

আইজিপির দায়িত্ব নিলেন চৌধুরী মামুন: গতকাল শুক্রবার বিকেলে দায়িত্ব বুঝে নেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। পরে তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর রাজারবাগ পুলিশ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। আইজিপি ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ৮ম বিসিএস ব্যাচে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, পুলিশ সদর দপ্তর, সিআইডি, ঢাকা ও ময়মনসিংহ রেঞ্জ ও র‌্যাব মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১২ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের শাল্লা থানার শ্রীহাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত। তার সহধর্মিণী হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট  মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ২ পুত্র ও ১ কন্যাসন্তানের জনক আইজিপি।

র‌্যাব মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিলেন এম খুরশীদ: গতকাল অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এম খুরশীদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১২তম বিএসএস ব্যাচের কর্মকর্তা।