logo
আপডেট : ৩ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০
সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার লড়াই
নাদিয়া সারওয়াত

সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার লড়াই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের যুগে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলো এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী, নামকরা সংবাদমাধ্যমগুলোও এখন টিকে থাকার জন্য নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। টিকে থাকতে না পেরে, ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার উদাহরণও কম নেই। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষের আস্থাভাজন বিবিসি রেডিওর বাংলা সম্প্রচার বন্ধ তারই সবশেষ সংযোজন। সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। মানুষ এখন সংবাদমাধ্যমে যা পড়ে বা দেখে, তার সবটাই বিশ্বাস করে না। সংবাদমাধ্যমের মান উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা, এমআরডি আইয়ের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় আস্থার এ সংকটের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। দেশের সব কটি বিভাগে পরিচালিত ওই জরিপে দেখা গেছে, পুরোপুরি আস্থা রাখতে না পারলেও, যেহেতু গুজব এবং ভুয়া তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি ছড়ায়, ফলে এখনো সঠিক তথ্য জানা ও যাচাইয়ের জন্য প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ওপরেই ভরসা করে মানুষ। প্রয়োজনে একাধিক পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশনের প্রতিবেদনের মধ্যে তুলনা করে তারা একটি ঘটনার সঠিক চিত্র বোঝার চেষ্টা করে।

সংবাদমাধ্যমের এই ভোক্তা অংশটির সঙ্গে কিন্তু সংবাদকর্মীদের তেমন কোনো যোগাযোগই নেই। ফলে পাঠক-দর্শকের সঙ্গে নিউজ রুমের একটি বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর এই পরিস্থিতির পেছনে মালিকানার স্বার্থরক্ষা ও রাজনীতিকরণ, নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবই দায়ী। এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমগুলো যদি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে সেটা কী হতে পারে সম্প্রতি তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন সংবাদকর্মী, সংবাদমাধ্যমের উন্নয়নে কাজ করছেন এমন উন্নয়নকর্মী এবং সাংবাদিকতা বিষয়ে অধ্যাপনা করেন এমন কয়েকজনের একটি দল। সুইডেনভিত্তিক ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউট এবং নিরাসের একটি ফেলোশিপের অংশ হিসেবে, ৬ সদস্যের এই দলটি এক বছর ধরে বিশ্বের চারটি দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে, নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সিদ্ধান্ত গ্রহীতা এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। তারই ভিত্তিতে তারা বর্তমান বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের সংকট মোকাবিলায় টেকসই সাংবাদিকতার কথা বলেছে।

টেকসই সাংবাদিকতার ধারণা পশ্চিমা দেশগুলোতে এক দশক ধরেই আলোচনা হচ্ছে। ফোয়ো ইনস্টিটিউটের লার টালার্ট সম্প্রতি এই ধারণাটিকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি মূলত টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে সাংবাদিকতা টেকসই উন্নয়নে সহযোগী ভূমিকা পালন করবে, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, পরিবেশবান্ধব জীবনাচারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রেখে, সাংবাদিকতার মূলনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে একে আর্থিকভাবে টেকসই করে গড়ে তোলা। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই দ্বিতীয় অংশটিই হতে পারে চলমান সংকটের সমাধান। কেননা সংবাদমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার একটা বড় কারণ, তারা সাংবাদিকতার মূলনীতি, অর্থাৎ জনগণের স্বার্থরক্ষার কাজটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। আস্থার সংকটের কারণে, সংবাদমাধ্যমগুলো ব্যবসায়িকভাবেও লাভবান হতে পারছে না, তাদের নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপন, মালিক পক্ষের অনুদান ইত্যাদির ওপর। এ যেন এক দুষ্টচক্র। এই চক্র ভাঙার একটি অন্যতম উপায় হতে পারে গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ, বা সেলফ-রেগুলেশন। আমাদের দেশে যার প্রচলন নেই বললেই চলে। সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা আছে, আবার সংবাদমাধ্যমের জন্য বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় আইন রয়েছে, যার অনেকগুলো নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। দেশে স্বাধীনতার এত বছরেও সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য কোনো কার্যকর সংস্থা গড়ে উঠতে পারেনি। প্রেস কাউন্সিলকে নখদন্তহীন বলে মনে করেন অনেকেই। সাংবাদিকদের নিয়ে, সম্পাদকদের নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের মধ্যেও রয়েছে বিভাজন। ফলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে, সাংবাদিকরা তাদের নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের কোনো কাঠামোগত নির্দেশনা তৈরি করতে পারেনি, নিজেদের মূল্যায়নের তেমন কোনো ব্যবস্থারও রয়েছে অভাব। স্ব-নিয়ন্ত্রণের নামে যেটুকু যা আছে, তা হলো সেলফ সেন্সরশিপ, যা একেবারেই কাম্য নয়। টেকসই সাংবাদিকতা গালভরা কোনো তত্ত্ব নয়, এটি মূলত ভালো সাংবাদিকতা, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখা। একমাত্র বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চাই পারে সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। আর এই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা করতে হলে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নীতি, অর্থাৎ স্ব-নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক উদ্যোগেও হতে পারে।

আবারও সংবাদমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নিয়ে এমআরডিআইয়ের সেই জরিপের প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া যাক। জরিপে অংশগ্রহণকারী একটি ক্লাস্টার ছিল ঢাকার বাইরের একটি জেলা শহরের বিভিন্ন পেশাজীবী নারী। একটি প্রশ্নের জবাবে তাদের বেশির ভাগই বলেন, যেসব পত্রিকায় নারীদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বেশি থাকে, নারীদের ইস্যু নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেসব পত্রিকার প্রতিই তাদের আস্থা বেশি। এখন, গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপন নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে মোটের ওপর সবাই মানবেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও, সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেদের পাঠক-দর্শক হিসেবে মূলত বিবেচনা করে পুরুষকেই। এখনো অধিকাংশ সংবাদে নারীর উপস্থিতি ভিকটিম হিসেবে। নয়তো কাটতি বাড়ানোর জন্য ‘মুখরোচক’ প্রতিবেদনের উৎস হিসেবে। অথচ টেকসই সাংবাদিকতার চর্চায় সাংবাদিকরা সচেতনভাবেই এর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। আর এর ফলে, নারীদের আস্থা অর্জন সহজ হয়। শেষ বিচারে ব্যবসায়িকভাবেও লাভবান হবে সংবাদমাধ্যম। কেননা যেহেতু দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাই নারী, পাঠক-দর্শক হিসেবেও সংবাদমাধ্যমের অর্ধেক ভোক্তা হয়ে উঠতে পারে নারী। টেকসই সাংবাদিকতার ধারণা সেই কথাই বলে। অবশ্য, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ব্যবসার কথা চিন্তা করলেই তো হবে না, জনরুচি তৈরিতে গণমাধ্যমের দায়িত্বের কথাও ভাবতে হবে। এটি এমন একটি শিল্প, যা একই সঙ্গে একটি সেবাও। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতেও সংবাদমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

টেকসই সাংবাদিকতার আরেকটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন। মানুষের হাতে হাতে যখন স্মার্টফোন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ছাপা পত্রিকা আর টেলিভিশনে কোনো নির্দিষ্ট চ্যানেলে সংবাদ দেখার প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। দেশের তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই এখন আর ছাপা পত্রিকা তেমন পড়ে না, টেলিভিশনের সংবাদ দেখে না। এই তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছাতে হলে স্মার্টফোন, ইউটিউব কিংবা প্রয়োজনে টিকটকের সাহায্যই নিতে হবে মূলধারার গণমাধ্যমকে। এ বিষয়ে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর ততই মঙ্গল। এর জন্য প্রয়োজন নতুন ধরনের নিউজ রুম, ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ সাংবাদিক। কনটেন্টে বৈচিত্র্য আনতে সৃষ্টিশীলতাও লাগবে। সব মিলিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে হবে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোকে।

লেখক : মিডিয়াবিষয়ক উন্নয়নকর্মী

[email protected]