logo
আপডেট : ৩ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০
সরকারি হয়েও উজ্জ্বল
আশরাফুল হক ও শাহেদ আলী ইরশাদ

সরকারি হয়েও উজ্জ্বল

আস্থার সংকট কাটিয়ে সাধারণ মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটি সরকারি হয়েও জনসেবার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। যতটা ফোকাস হচ্ছে সরকারের সাপোর্ট কিন্তু ততটা পাচ্ছে না তারা।

ভোক্তার অভিযোগ নিষ্পত্তি করা সংস্থাটির প্রধান কাজ হলেও বাস্তবে সরকার নির্দেশিত নানা অভিযানকেই  গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে সংস্থাটির লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু সমস্যা আছে। সেগুলো সমাধানের পথেই আছি আমরা। জনবল সবচেয়ে ভাবনার বিষয়। তবে যেটুকু জনবল আছে তা নিয়েই আমরা লড়ে যাচ্ছি। সংস্থাটির লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ এর সঙ্গে সবার স্বার্থ জড়িত।’

নগরজীবনে চারপাশে হরদম প্রতারণা হচ্ছে। প্রায় সবাই প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। সব প্রতারণার সমাধান সরকার দিতে পারছে না। আর সবকিছু নিয়ে সাধারণ মানুষ সরকারের কাছে যায়ও না। গেলেও নানা নিয়মের বেড়াজালে আটকে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। শঙ্কা এড়িয়ে ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর এগিয়ে চলেছে।

কাঁঠালবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ইয়াসির আরাফাত গত বছর ধানমন্ডির একটি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। খাবারের দাম অনেক বেশি রাখা হয়েছিল তার কাছ থেকে। কিন্তু যখন দেখলেন ১৫ টাকার পানির বোতল ২০ টাকা রাখা হয়েছে তখনই প্রতিবাদ করেন তিনি। ক্যাশ মেমো নিয়ে অভিযোগ করেন ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তরে।

ইয়াসির আরাফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগ করার পর শুনানির জন্য ডাকা হয়। মাত্র এক মাসের মধ্যে শুনানি শেষ করে রেস্টুরেন্টটিকে জরিমানা করা হয়। সেই জরিমানার ২৫ ভাগ আমি নিজেও পেয়েছি। এক সময় মানুষের যাওয়ার জায়গা ছিল না, এখন সেই জায়গা হয়েছে।’

ইয়াসির আরাফাতের মতো আরও অনেকেই তাদের অভিযোগের প্রতিকার পেয়েছেন। তাদের কেউ মাছ কিনে ওজনে কম পেয়েছেন, ঈদের সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্রমণ করতে গিয়ে ভাড়ায় প্রতারিত হয়েছেন বা মেয়াদহীন পণ্য কিনে ঠকেছেন। ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘সমাধান পেতে হলে পণ্য কেনার ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করতে হবে। পণ্যের মানি-রিসিট, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি কার্ড বা অন্য যেকোনো ডকুমেন্ট থাকতে হবে।’

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান বলেন, ‘শুরুতে মানুষের আগ্রহ কম ছিল। কিন্তু এখন ব্যাপক আগ্রহ। গত অর্থবছরে অভিযানের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬২৫টি। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এ তিন মাসেই সমসংখ্যক অভিযান হয়েছে। সামনে পুরো বছর তো পড়েই আছে।’

২০০৯-১০ সালে দ-িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫৪টি। গত বছর ২৫ হাজার ৬২৩টিতে দাঁড়িয়েছে। অধিদপ্তরের শুরুর বছর অর্থাৎ ২০০৯-১০ সালে অভিযানের সংখ্যা ছিল সাতটি। গত বছর অভিযান হয়েছে ১০ হাজার ৬২৫টি। শুরুর দুই বছর কেউ ২৫ শতাংশ প্রণোদনা পায়নি। ২০১১-১২ সালে প্রণোদনা পেয়েছেন আটজন। এ প্রণোদনা সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০ জন পেয়েছিলেন ২০১৭-১৮ অর্থবছরে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর করাই হয়েছে, ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এ পদক্ষেপে আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে, আমরা সাধুবাদ জানাই। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এ পদক্ষেপে ভোক্তারা উপকৃত হবে।’

নরসিংদী জেলার ভোক্তা প্রায় ২৬ লাখ। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলা কার্যালয়ে কর্মরত আছেন দুজন। একজন সহকারী পরিচালক অন্যজন অফিস সহকারী। এ দুজনের পক্ষে ২৬ লাখ মানুষের অভিযোগ নেওয়া অসম্ভব বিষয়। এ পরিস্থিতি শুধু নরসিংদী নয়, সব জেলাতেই।

এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য অধিদপ্তর আড়াই হাজার জনবলের এক সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তুত করে জনপ্রশাসনে জমা দেয়। দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখে কাঠামো পরিমার্জন করে আবার জমা দিতে বলা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ শাখা এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির হাত ঘুরে কাঠামো ৪৬৫ জনে নেমে আসে। এ জনবলও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। পেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করবে ভোক্তা অধিদপ্তর।

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নতুন করে আলোচনায় এসেছে কিছু বহুজাতিক ও জাতীয় কোম্পানিকে জরিমানা করে। ৫৫ টাকার লাক্স সাবান ৭৫ টাকায়, ৯০ টাকার হুইল পাউডার ১৪২, ২১০ টাকার সার্ফ এক্সএল ২৮০, ১০ টাকার মিনি সাবান ১৫ টাকায় বিক্রি করছে বহুজাতিক ইউনিলিভার। একইভাবে সমজাতীয় পণ্যে অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর কারণে দেশীয় স্কয়ার, এসিআই, কল্লোল গ্রুপ, কোহিনূর কেমিক্যালকে গত ৭ সেপ্টেম্বর তলব করে অধিদপ্তর। নিজেদের কার্যালয়ে ডেকে এসব কোম্পানি কর্তাকে বলা হয়, ‘নিত্যব্যবহার্য পণ্য বিক্রি করে আপনারা লাভ করবেন এটা স্বাভাবিক। তবে তা ৩০ শতাংশের জায়গায় ৫০ শতাংশ কেন?’

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা কমার ফলে দেশের বাজারে দাম বাড়ছে বা কমছে। তবে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম একবার বাড়লে আর কমছে না। সেই বাড়তি দরের মধ্যেই আবারও দাম বাড়ানো হচ্ছে।

এসব বিষয়ের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে কোম্পানিগুলোর কাছে তথ্য চেয়েছে। কমিটির সদস্যরা সংশ্লিষ্ট কারখানা পরিদর্শন করবে। যেসব পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে, সেগুলোর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণসহ কাঁচামাল আমদানির খরচ যাচাই করে দেখবে কমিটি। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মূলত কোম্পানিগুলোর বাড়ানো দাম কতটা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক সেটা দেখছে। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হবে। কোনো ব্যক্তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, বিষয়টা তা নয়। দাম বেড়েছে, তাই সব ভোক্তার পক্ষ থেকে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।’

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ‘কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাসকে। কমিটিতে আইসিএমএবি, ট্যারিফ কমিশন, এফবিসিসিআই ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের একজন করে প্রতিনিধি রয়েছে।’ এ বিষয়ে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা কাজ শুরু করেছি।’

ভোক্তা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অধিদপ্তরে অল্প কিছু কর্মকর্তা আছেন। সেখানেও কিছু বঞ্চনার গল্প আছে। সংস্থাটিতে নিজস্ব উপপরিচালক আছেন ১২ জন আর সহকারী পরিচালক ৮০ জন। এ ৮০ জন সহকারী পরিচালক কীভাবে উপপরিচালক হবেন তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। একদফা পদোন্নতিতেও বঞ্চনার ঘটনা আছে। ফেইসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে বিপাকে পড়েছেন এক কর্মকর্তা। এসব কিছু নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সহকারী পরিচালকদের কাজ হচ্ছে তদারকিমূলক। তারা জরিমানা করতে পারেন। কাজের ধরন অনেকটা প্রশাসন ক্যাডারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মতো হলেও অভিযানে পুলিশ প্রটেকশন পাওয়া অনেক সময়ই দুরূহ হয়ে পড়ে। সরকারের অন্যান্য দপ্তরের মতো এ দপ্তরেও কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিষয়গুলো এখনই সমাধান করা না হলে সামনে প্রশাসনিক জটিলতা আরও বাড়বে এবং জনআস্থা অর্জনে সমস্যা দেখা দেবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে অনেক সংস্থা গড়ে তুলেছে। তাদের মধ্যে কিছু বেশ কার্যকর। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রচলিত স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। নতুন অধিদপ্তরের মধ্যে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কার্যকর হলেও সফলতা দেখাতে পারেনি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। দেরিতে হলেও প্রতিযোগিতা কমিশন ভালো করছে। প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর এ দুটি সংস্থার আইনের খসড়া করেছিল গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে আইনগুলো করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।’