logo
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২২ ০০:০০
মিঠা চিনির তিতা পরিহাস

মিঠা চিনির তিতা পরিহাস

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে আগুন। প্রথমে ডলার সংকট ও পরে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির চক্করে পড়ে দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া। এর প্রভাবে স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবন যারপরনাই সংকটের মুখোমুখি। এই অবস্থায় সাধারণ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশিরভাগ মানুষের। জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে কমছে মান। মুদ্রাস্ফীতির চাপে অল্প কিছু মানুষ বাদে প্রায় সবার জীবনই ওষ্ঠাগত। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মানুষ দেখছে সবকিছুই দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মহামারী করোনার পর মানুষের সব ধরনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে শুরু হয় ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন; যা আরও উসকে দিয়েছে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে। অবশ্য সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১ শতাংশে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কারসাজির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে মুনাফার সুযোগ নিয়ে থাকে। চলতি বছরের শুরু থেকে নভেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় চাল, ডাল, আটা, তেল ও চিনির দাম বেড়েছে।

বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘মোহাম্মদপুরে ২৬৫০০ কেজি চিনি জব্দ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কৃষি মার্কেটের দুটি দোকান থেকে অবৈধভাবে মজুদ করা ৫৩০ বস্তা চিনি জব্দ করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। কৃষি মার্কেটের ‘বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স’ ও ‘সততা ট্রেডার্স’-এর মালিকরা অবৈধ উদ্দেশ্যে এসব চিনি মজুদ করে রেখেছিল। বাজারে সর্বোচ্চ ১০২ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রির সরকারি নির্দেশ থাকলেও, কৃষি মার্কেটের একাধিক খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রতি কেজি চিনি ১১৫-১২০ টাকায় বিক্রি করেন। পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে তারা এসব চিনি সর্বনিম্ন ১০৭ টাকা কেজি দরে কেনেন। এখানে প্রতিষ্ঠান দুটির নাম আমাদের বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। ইসলাম অধিক মুনাফার লোভে মজুদদারি নিষিদ্ধ করেছে। মা’মার ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ফাজালা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, পাপাচারী ছাড়া অন্য কেউ মজুদদারি করে না।’ (তিরমিজি)। দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগাতে ইসলামি নাম ধারণ করলেও মুদ্রাস্ফীতির সুযোগ নিয়ে চিনির অবৈধ মজুদ থেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক পিছপা হননি। অন্যদিকে, ‘সততা’ নামের প্রতিষ্ঠান খুলে মজুদদারির মতো অসৎ কাজ করছেন আরেক প্রতিষ্ঠানের মালিক। নামকরণের এই পরিহাস আমাদের মুনাফামুখী বাজারব্যবস্থাপনা ও সমাজের পচনকেই নির্দেশ করে।  

মহামারী হোক আর যুদ্ধ, একদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও ডলার সংকটে প্রতিদিন বেড়ে চলেছে বাজার দর। টালমাটাল নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজার। সবকিছুতে ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। এ পরিস্থিতিতে সরকার দাম বেঁধে দেওয়ার পরও চিনির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠল কেন! আমরা মনে করি ভোক্তা অধিকারসহ বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সরকারের সবগুলো সংস্থার আরও তৎপর হওয়া উচিত। চলতি বছর এ বিষয়ক এক রিট শুনানিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছে, ‘‘আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় নিত্যপণ্যের বাজার ‘জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর’ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।” বাজার নিয়ন্ত্রণে ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। সরকারের সংস্থাগুলো (আইন, বিধি, নীতিমালা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তদারক সংস্থা) সক্রিয় থাকলে মজুদকারীরা সাহস পেত না। বাজার তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ একদিনের কাজ না, আমরা চাই সরকার এ বিষয়ে ৩৬৫ দিনই সতর্ক-সোচ্চার থাকুক। একদিকে, সরকার খাদ্যপণ্যের বাজারদর ঠিক করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, একটি মহল জোটবদ্ধ হয়ে সেসব পণ্য মজুদ করে সুযোগ মতো দাম বাড়িয়ে তা বাজারে ছাড়ছে। এক্ষেত্রে যারা দুষ্কৃতকারী তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবশ্যই কঠোর হস্তক্ষেপ দরকার। এটা ভাবা দরকার যে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো থেকে শুরু করে সরকারের সাম্প্রতিক কোনো সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে না। সাধারণ মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে।