logo
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২২ ০০:০০
শিকলে বাঁধা শিশু জিহাদের জীবন
সাগর আহম্মেদ, কালিয়াকৈর (গাজীপুর)

শিকলে বাঁধা শিশু জিহাদের জীবন

লেখাপড়া, খেলাধুলা ও দুরন্তপনায় মেতে সময় পার করার কথা থাকলেও চিকিৎসার অভাবে সাত বছর ধরে শিকলে বাঁধা জীবন পার করছে বাকপ্রতিবন্ধী ও মানসিক ভারসাম্যহীন শিশু জিহাদ (১২)। পরিবারের অর্থসংকটের কারণে থেমে আছে তার চিকিৎসাও। শিশু জিহাদ গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চাপাইর ইউনিয়নের বড়কাঞ্চনপুর টেকিবাড়ি এলাকার মুদি দোকানদার ফজলুর রহমানের ছেলে। তার যথাযথ চিকিৎসা ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরির জন্য সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালীদের সহায়তা কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে কালিয়াকৈর-ফুলবাড়িয়া সড়কের পাশে বড়কাঞ্চনপুর টেকিবাড়ি বাজার। ওই বাজার থেকে পূর্বদিকে কয়েকটি বাড়ি পার হলেই মুদিদোকানি ফজলুর রহমানের বাড়ি। বাড়িটির উত্তর দিকের ঘরের বারান্দায় একটি খুঁটির সঙ্গে বাম হাতে শিকলে বাঁধা বাকপ্রতিবন্ধী ও মানসিক ভারসাম্যহীন শিশু জিহাদ। পাশে বসে তাকে খাওয়াচ্ছেন মা জিয়াসমিন বেগম। এরই মধ্যে এলাকায় সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন আশপাশের লোকজন। তারা জানান, খিঁচুনি ওঠা, ভাঙচুর করা, কারও ক্ষতি করা বা কোথাও চলে যাওয়াসহ বিভিন্ন আতঙ্কে শিশু জিহাদকে সাত বছর ধরে শিকলে বেঁধে রেখেছে তার অসহায় মা-বাবা। ১২ বছর আগে একটি ক্লিনিকে জিয়াসমিন বেগমের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জিহাদের জন্ম হয়। যখন বসা ও হাঁটা শেখা শুরু করে, তখন বোঝা যায় শিশু জিহাদ বাকপ্রতিবন্ধী ও মানসিক ভারসাম্যহীন। তখন স্থানীয় ক্লিনিক, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং বিভিন্ন কবিরাজকে দিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। বাড়ির গরু-ছাগল ও গাছপালা বিক্রি করে চিকিৎসা করানো হলেও সুস্থ হয়নি জিহাদ। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা হলে জিহাদ সুস্থ হবে। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে তার চিকিৎসাও থেমে গেছে। বছরখানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় জিহাদের দাদা মারফত আলী প্রাণ হারান। বর্তমানে স্ত্রী জিয়াসমিন, দুই ছেলে জিসান মাহমুদ ও জিহাদ এবং মা ফিরোজা বেগমকে (৭১) নিয়ে সংসার ফজলুর রহমানের। বাবা মারফত আলীর কোনো সম্পত্তি ছিল না। মায়ের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অল্প একটু জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে তারা পাঁচজন কোনোরকমে খেয়েপরে দিন পার করছেন। একদিকে অর্থসংকটে থেমে গেছে জিহাদের চিকিৎসা, অন্যদিকে খুঁড়িয়ে চলছে তাদের পাঁচজনের সংসার। এমন পরিস্থিতিতে নিজের শিশুসন্তানের চিকিৎসা ও সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালীদের সহায়তা কামনা করেছেন ফজলুর-জিয়াসমিন দম্পতি।

জিহাদের মা জিয়াসমিন বেগম বলেন, ‘ছেলেটা আমারে মা আর বাবারে বাবা বলে ডাকতে পারে না। এ জন্য আমাদের খুব কষ্ট হয়। একটা ছেলে যখন পাগল হয়, তখন আর মায়ের জীবনে কিছু থাকে না। ওর মুখে মা-বাপ ডাক শুনতে পাই না, তখন আমাদের খুব কষ্ট হয়। ছেলেটা যখন একদিকে চলে যায়, তখন মনে হয় পোলারে পাগল ভেবে মানুষে মাইরা ফালাইবো। তাই পাগলের মতো ওরে খোঁজাখুঁজি করি। অনেক কিছু বিক্রি করে ওর চিকিৎসা করেছি। ওরে ভালো করতে চাই।’

জিহাদের বাবা ফজলুর রহমান বলেন, ‘রাতে জেগে উঠে ভাঙচুরসহ সব ল-ভ- করে জিহাদ। ঠিকমতো ও-সহ কেউ ঘুমাতেও পারে না। ডাক্তাররা বলেছেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসা করালে সে ভালো হবে। কিন্তু টাকার অভাবে আর চিকিৎসা করাতে পারছি না। সরকার ও ধনী মানুষের সহযোগিতা পেলে আমার ছেলের চিকিৎসা করাতে পারতাম।’

শিশু জিহাদের পরিবারের আকুতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, ‘ওই শিশুটির শিকলে বাঁধা জীবনের বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। এ ধরনের বিষয়ে সমাজসেবা বিভাগের মাধ্যমে সহযোগিতা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তারপরও ওই শিশুর বাড়িতে পরিদর্শন করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’